আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

পাঠ ভবনের গণ্ডি পেরোলেই শ্রীসদন। কত্ত বড় হোস্টেল! শুরু থেকে শেষ যেন প্রাচীন একখানি কেল্লা। অন্তত তখন অমনটাই মনে হতো। করবী, মাধবী বা সন্তোষালয়ের তুলনায় এ যেন বিরাট! সামনে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না, ভিতরে কত যে অলি গলি চোরা বাঁক! সেই পুরনো মোটা দেওয়ালের এক পাশে আমাদের ঠাঁই হলো পাঠ ভবন ব্লকের এক তলায়। আমরা তখন একাদশ। আমাদের পরনে কমলা পাড়ের সাদা শাড়ি, আমাদের পায়ের তলায় হিরো জেট সাইকেল,… আমরা তখন উড়ছি। সেই সব নিষিদ্ধ যাপন তখন আমাদের নাগালের মুঠোয়। বাবলু‘দার ডিমের চপ,ইউসুফ‘দার ক্রিমরোল আর শ্যামবাটির ক্যানেল তখন আমাদের অবাধ গতিবিধি। সাইকেল চালাতে চালাতে দূর থেকে আমরা করবী, মাধবীকে দেখি। তবে স্মৃতি মেদুর হই না, তখনও। সমস্ত নতুনেরই তো একটা নেশা আছে, আমরা তখন স্বাধীনতা যাপনে ব্যস্ত। আমরা বিকেল হলেই সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে যাই, যাওয়ার পথে প্রহ্লাদ‘দার কাছ থেকে ফুচকা খাই। ওই মৃণালিণী হোস্টেলের সামনেটিতে। বলি, খুব ঝাল দাও, খুব। এই ‘খুব’ বলার মধ্যে যে স্বাধীনতা আছে, তার স্বাদ যে কী অপূর্ব!

আমরা করবী হস্টেলের তিনতলার সিঁড়ির ধাপে বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে রান্না করতাম। সিঁড়ির মোড়ে পাহারায় থাকতো একজন। গায়ে মাখার সর্ষের তেল বাটিতে ঢেলে অনেক কষ্টে জোগাড় করা আলু, পেঁয়াজ ভাজতাম। আধ কাঁচা আলু মুখে দিয়ে গর্বে বুক ফুলে উঠতো। মাধবী হোস্টেলেও এই ব্যবস্থা জারি ছিলো। শ্রীসদনে পৌঁছে আমাদের বরাতে একখানি জনতা স্টোভ জুটেছিলো। তাও শাশ্বতার দিদির পরিত্যক্ত। সেই চমৎকার স্টোভে আমরা কত কী যে করতাম! ব্ল্যাকে কেরোসিন তেল কিনতাম, বহু কষ্টে সলতে পরাতাম এবং বহু চেষ্টায় যখন সেই আশ্চর্য স্টোভ জ্বলতো তখন আমরা ডিম ভাজতাম, চা করতাম। হালকা কেরোসিনের গন্ধওয়ালা চা যখন তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতাম তখন তার নিজেরাই খুশি হয়ে যেতাম অকারণে। আমাদের রেস্তো কম। বেশি কীইবা করতে পারি! পাঠ ভবন ব্লকের পর ওই দিকে দূরে বিদ্যাভবন, কলাভবনের দিদিদের ব্লক। ওরা হিটার জ্বালায়। আমাদের কিন্তু হিটারের প্রতি লোভ গোপন থাকে না, আমরা ভাবি, কবে আরও বড় হবো! ভাবতে ভাবতে সময় গড়ায়। আমরা শ্রীসদনের সঙ্গে পরিচিত হই ক্রমে। হিলেম হাওয়ায় কাঁপন লাগে আমলকীর ডালে। আমরা ধীরে ধীরে লেপ কম্বল বের করি। দুপুর দুপুর সাইকেল চালিয়ে চড়তে বেরোই। কোনোদিন পূর্বপল্লী, কোনোদিন প্রান্তিক, কোনোদিন বা, বোলপুর। কাজ ছাড়া অবশ্য বোলপুরের দিকে বিশেষ যাওয়া হয় না। গেলে দেখি, চিত্রা সিনেমার মোড় পেরোলেই দেখি রাস্তার দুই ধারে শাক-সবজি ঢেলে বিকোচ্ছে। মাটির গন্ধ মাখা সেই সব ফুলকপি, রাঙা আলু আর বিট- গাজরে রোদ্দুর এসে পড়েছে। গাঁ-গঞ্জ থেকে কাজে কম্মে আসা মানুষ বা পথ-চলতি মানুষ দর করে সেই সব কিনে নিচ্ছে অকাতরে। আমরাও উবু হয়ে বসে দর করি। এই পেল্লায় এক একটা ফুলকপি পেয়ে যাই দু’টাকায়। সঙ্গে কুমড়ো কিনি এক ফালি।
পরদিন ক্লাস থেকে ফিরে জনতা স্টোভ জ্বালাই, মোটা চালের ভাত ফোটে অনেকক্ষণ ধরে। তার মধ্যে কমলা কুমড়োর টুকরো ভাসে। স্বর্ণ মাসুরি তখন ১২ টাকা কেজি, তাই মনে হতো কত দামী! ভাত নামলে গামছা দিয়ে হাড়ি ধরে, ফ্যান ঝরিয়ে নিই। এবার বসাই ফুলকপি ভাজা। রান্না হলে সকলে মিলে চালতাতলায় স্নান করতে যাই! ঝোপ ঝাড় পেরিয়ে অন্ধকার বাথরুম, কেউ আসেনা, শুধু আমরা। কী সুন্দর করে জল পড়ে মোটা ধারায়! কলোম্বাসের আবিষ্কারের মতো চালতাতলার বাথরুম আমাদের ধন হয়ে ওঠে নিমেষেই। স্নান সারা হলে ভাত খেতে বসি আমরা, মেঝেতে গোল করে। ভাত, কুমড়ো সেদ্ধ আর কপিভাজা। কী যে আরাম! আমাদের স্বাধীনতার খুশি তখন প্রতি গ্রাসে মিশে যেতে থাকে। হিটার না পাওয়ায় আক্ষেপ আমরা তখন ভুলে যাই। জেনারেল কিচেনের খাবারের পাশে এ তো অমৃত!পাঠ ভবন কিচেনের কথা তখন আমাদের মনে পড়ে যায়। সেই যে, বৃহস্পতিবার ঘি, আলু সেদ্ধ আর পোস্তর ঝোল দিত না? আহা! কেয়ারি করা রাস্তায় রোদ্দুর এসে পড়ে, আমরা সেই ইঁটে বসে চুল শুকাই আর ঝোল ঝোল আলু পোস্তর কথা ভাবি। ছোট ছোট গল্প বিন্যস্ত হতে থাকে সেই সব কার্তিকের রোদে। সেই রোদ আমাদের এলোচুলে এসে পড়ে, আমরা গল্প করতেই থাকি, করতেই থাকি।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]