আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

হেমন্তের বিকেল বড় সুন্দর। নরম আলো তখন পাকা ধানের ক্ষেতে পিছলে যেতে চায়। কুয়াশার স্তর থমকে থাকে মাঠের উপর। বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত তখন রূপকথার ইজেল হয়ে উঠতে চায় অনবরত। আমাদের আশ্রম মাঠেও এমন বিকেলে ধুলো ওড়ে। ছেলে মেয়েরা খেলে। আলো মাখে, আঁধার মাখে। সন্ধ্যে হয়ে এলেই তাদের মনখারাপ হয়ে যায়। তখন তারা ধীর পায়ে হোস্টেলে ফেরে। কোনো রকমে হাত পা ধুয়ে, জামা পালটে উপাসনার লাইনে দাঁড়ায়।

মাধবী হস্টেলের চৌকো চাতালে তখন হিমেল হাওয়া বয়, শুকনো পাতারা উড়ে এসে পড়ে।কেমন যেন এক মনখারাপ এই বিকেল হতেই চেপে বসে। হেমন্তের মাঠ তখন সেই কোন সুদূর থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ছাতিমের গন্ধ তাকে বিলীন করে দিতে চায় ক্রমাগত। এই পাওয়া না পাওয়ার মাঝে মন ছুটে যেতে চায় নন্দন মেলার মাঠে। সেই যেখানে কলা ভবনের দাদাদিদিরা তাদের চাতালখানি কত আশ্চর্য নৈপুণ্যে সাজিয়ে তুলছে। এই মেলাখানি কিন্তু এক্কেবারে অন্যরকম। আনন্দমেলার সঙ্গে এর মিল আছে, আবার নেইও। ছাত্ররাই এই মেলার প্রাণ। নিতান্ত ব্যক্তিগত মেলার গন্ধটি এখানেও ভরপুর। তবে, নন্দন মেলা শুধুই কলা ভবনের মেলা। যেন এক অবাক করা শিল্প মেলা। যা-ই দেখি শুধুই বিস্ময় আর বিস্ময়। হাতের কাজই বলো আর খাবারই বলো, অমন নতুন নতুন বিষয় আমাদের চমকে দেবার জন্য যথেষ্ট।

আমরা ঘুরি, দেখি, কিছু বুঝি, কিছু বুঝি না। যা বুঝি না তাকে বুঝতে চাই গভীর অনুধ্যানে। কিশোরী মন হার মানতে চায় না সহজে। আমাদের আশ্রম জীবনে মেলার সংখ্যা চার। মানে, যে গুলোয় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। আনন্দ মেলা আর নন্দন মেলা ছাড়াও আর আছে পৌষমেলা আর মাঘমেলা। শীতের বিকেলে থমকে থাকা কুয়াশার মতো আমরাও যেন মেলার অপেক্ষায় দিন গুনতাম। উৎসবের উত্তেজনা তুষের আগুনের মতো আমাদের ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকতো দিবানিশি।

বুধবারের উপাসনা শেষে আমরা হোস্টেলে ফিরে কত সব পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতাম! কোন জামা পরবো, কে কার চুল বেঁধে দেবে – এইসব নিতান্ত সাধারণ বিষয়ে আমাদের উত্তেজনার অভাব ছিলো না। মাধবী হোস্টেলের চাতালে তখন নরম রোদ্দুর এসে পড়তো। আমাদের আড্ডা জমে উঠতে না উঠতেই স্নানের তোরজোড় শুরু হয়ে যেতো। হিমেল হাওয়ায় উবু হয়ে বসে আমরা শ্যাম্পু করতাম, রোদ মাখতাম। রোদের শিশিরে ভিজতে ভিজতে সেইসব দিন কোথায় যে হারিয়ে গেলো! এমন সোনালী রোদের দুপুরে হলুদ পোস্টকার্ডে আমাদের ফেলে আসা বাড়ির খবর এসে পৌঁছতো । সেইসব চিঠি যেন এক বাক্স পশমের মতো উষ্ণতায় বোনা। কারো বা নবান্নের খবর এসে পড়তো এর মধ্যেই। আমরা একে অন্যের চিঠি ভাগ করে নিতাম কখনও কখনও।

দুঃখ, ভালোবাসা, অভাব সমস্তই ভাগ করে নিতে নিতে দেখতাম শীতের রোদ চাতাল ছেড়ে জানলায় এসে পড়েছে কখন। গরাদের ফাঁক দিয়ে দূরে তাকালে দেখা যায় বেড়ার ওপারে শ্রীসদন হোস্টেল। সেই যেখানে বড় দিদিরা থাকে। সেই যেখানে রোদেলা দুপুর ভালোবাসার গল্প হয়ে উঠতে পারে সাইকেলের অবাধ স্বাধীনতায়। আমরা ওই দূরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি অনন্তলতায় ঢেকে গেছে চরাচর। হেমন্তের অপরাহ্নে গোলাপি গোলাপি ফুলে রোদ পড়েছে কেমন। এই জলা জঙ্গলের ওপারে শ্রীসদন যেন অনন্ত স্বাধীনতার আখর হয়ে উঠছে এমন সোনালী রোদের দুপুরে। আর ক‘দিন পরেই তো নন্দন মেলা। সেদিন আমরা পাঠভবনের চৌহদ্দি পেরিয়ে কলা ভবনে যাব। মেলায় কতো যে সব হাতের কাজ! তার দাম কি কম? আমরা তাই দেখবো বেশি । কিনবো কম। তবু, দাদা-দিদিরা যেন কেমন করে টের পেয়ে যাবে। মেলায় ঢুকলেই দেখা যাবে, পাঠভবনের হোস্টেলের ছেলে মেয়েদের জন্য সস্তার সব জিনিস এক পাশে রাখা। কার্ড আর ব্যাচ। সেই না আমাদের কাছে কত! ঝালমুড়ি খেতে খেতে আমাদের খুশি তখন রোদেলা দুপুরের অনন্তলতা হয়ে উঠতে চাইবে বারবার। ইস্‌ কোথায় যে সব গেল! মেলাখানি আছে, শুধু সেই সস্তার দোকানদারি আর নেই। হেমন্তের সন্ধ্যের মতো কোথায় যে সব মিলিয়ে গেল কে জানে!

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]