আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

শান্তিনিকেতনের শীত বড় সুন্দর। সারাদিন তখন হাওয়া বয় নিজের খেয়ালে। রোদ্দুরে লাগে আয়েশি উষ্ণতা। আমলকি গাছের পাতা গুলো সারা সারা দিন কাঁপে আর কাঁপে। আমরা এডি অয়েল আর পণ্ডস্ মেখে বউ টুপি পরি। পঞ্চু পরি। তার পরেও আমাদের গাল ফেটে যায়, পা ফেটে যায়। কারণ, আমরা তো ধুলো মাখি দেদার। লাল ধুলোয় আমাদের সাদা পায়জামা রঙিণ হয়ে যায়। আমরা সোয়েটার বদলা-বদলি করে লুকোচুরি খেলি। মাটির তলা দিয়ে পেট ঘষে ঘষে তারকাঁটার বেড়া পেরিয়ে কুল পারতে যাই। সে বড় চমৎকার সময়।
এমন দিনে আমাদের ইস্কুলের চৌহদ্দি যায় বেড়ে। আমরা আমাদের তল্পিতল্পা নিয়ে এদিক সেদিকে ছড়িয়ে পড়ি। যাযাবর ইস্কুল যাপন আমাদের স্বাধীনতার আখর হয়ে ঝরে তখন। আমরা আসলে রোদ্দুর খুঁজে ফিরি এদিক সেদিক। মিষ্টুনি’দির ক্লাসে বসি, চৈত্যর পিছনে। সেই যেখানে পাখিদের জল খাওয়ার পান পাত্রটি রয়েছে। সেই যেখানে ইউক্যালিপটাসের পাতারা পাক খেয়ে খেয়ে ঝরে পরে অবিরাম! গাছেদের গা বেয়ে বেয়ে রজন গড়িয়ে পড়ে। আমরা সেই রজন দিয়ে পাখি গড়ি, পুতুল গড়ি। বিমূর্ত শিল্প-চেতনা আমাদের স্বভাবে জাগে তখন। কী অপূর্ব গন্ধ সেই রজনের! মিষ্টুনি’দি আমাদের হাত পা ছুড়িয়ে ব্যায়াম করান। কিন্তু তাতেও আমাদের শীত কমে না। কী আর করা যাবে? আমরা তখন আশ্রম মাঠে গিয়ে বসি।
কোনো দিন বা, জয়তি’দিকে বলি আজ আমরা উত্তরায়ণে বসে বাংলা পড়বো। ভিতরের বাগানে আমাদের অবাধ স্বাধীনতা। আমরা সেখানে দৌড়াই ঘুরি ফিরি, পড়ি কম। সুদীপ‘দার জীবন বিজ্ঞান ক্লাসেও আমরা বেড়িয়ে পড়ি। উত্তরায়ণের বাগানে ঘুরে ফিরে প্রজাপতি চিনি। পোকা চিনি। কোন পোকা কোন ফুলে বসে তার ধারণা করে নিয়ে চাই। শিশিরের শব্দের মতো তখন এক নিঃশব্দ আনন্দ আমাদের ঘিরে ফেলে। যার জুড়ি মেলা ভার। বর্ষার ইস্কুলের চেয়ে সে তখন অনেক বেশি অন্যরকম। ঋতুতে ঋতুতে আকাশের রঙই কি কেবল বদলায়? আমাদের মনেও যে তার ছায়া পড়ে, তার হিসেব কে রাখে? সেই অলিখিত সব সমীকরণে আমাদের কৈশোর রঙ মাখে নিত্যদিন। মহেন্দ্র‘দা তখন মাটি মাখা ছেড়ে সবুজ মাফলার পরে রোদ পোহান। মাটির কাজের ক্লাসে তখন অখণ্ড অবসর বিরাজ করে। বিধু‘দা আমাদের নিয়ে গোল হয়ে বসেন। রোদের ছায়ায় বসে আমরা তখন গল্প শুনি। শিল্পীদের জীবনের গল্প। সেই কে এক মাইকেল এঞ্জেলো কেমন করে সব ছবি এঁকেছিলেন! কেমন করে আরেক জন জলে ডুবে ডুবে বুনোহাঁসের উড়ান দেখতেন প্রতিদিন, এইসব গল্প। আসলে সেও তো এক রূপকথা! না দেখা, না চেনা দেশের ছবির গল্প, ভাস্কর্যের গল্প আমরা বড় তন্ময় হয়ে শুনি। সে যেন এক অপার্থিব কবিতার দেশ। সবার অলক্ষ্যে বিধু‘দাও কি সেই দেশেই হারিয়ে গেলেন আমাদের অগোচরে? কে জানে!
শীতের রোদ যাবতীয় জাগতিক বিচ্ছেদের গল্পকে কেমন যেন কাঁথার ওমে জড়িয়ে রাখতে চায়। জনশূন্য জহরবেদীতে যখন রোদ্দুর এসে পড়ে তখন কিশোরীবেলার সেই আতপ্ত স্নেহের গন্ধ পাই । বিধু‘দা, মিষ্টুনি‘দির যত সব ছড়ানো ছেটানো রোদেলা গল্প উঠোন জুড়ে বসে। আম্রকুঞ্জের আলোছায়া তখন সারা বেলা দক্ষিনায়ণের উষ্ণতা পোহায় আর আলোছায়ার মকশো করে। সেই সব দেখতে দেখতে মাইকেল এঞ্জেলোর ফ্রেস্কো মনে পড়ে যায় আমার। শিল্পের মধ্যে যে আধ্যাতিকতা মিশে থাকে তার মধ্যে কি শুধুই জেগে থাকে শ্রদ্ধা আর শ্রম? মনে হয় না। রোদেলা স্নেহের দুপুরে আমার ইস্কুলের উঠোনে আমি তাই প্রণত হই বার বার। প্রজাপতি ওড়া আমাদের জীবন বিজ্ঞানের ক্লাস তখন পৌষালী হাওয়ার পাক খায় এদিক সেদিক। আমি ঠিক জানি উত্তরায়ণের গোলাপ বাগান ছুঁয়ে তারা এবার উড়ে যাবে শ্যামলীত উঠোনে। যেইখানটিতে অনন্ত রোদ্দুরের আনাগোনা অহরহ।

ছবিঃ লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]