আমার শান্তিনিকেতন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

বেলা পড়ে এলো। পশ্চিমের রোদ গুলঞ্চ গাছের ফাঁক দিয়ে শেষ পরশটুকু বুলিয়ে দিচ্ছে। সাদা শার্ট, নীল স্কার্ট মেয়ের দল লাল ধুলো উড়িয়ে কাবাডি খেলবে, খোখো খেলবে এখন। লোহার গ্রিল টপকে জল খেতে যাবে, বল কুড়োতে যাবে। উত্তরদিকে বৃদ্ধ পিতামহীর মতো দাঁড়িয়ে শ্রীসদন। সেদিকটা নিষিদ্ধ আমাদের জন্য। বাবলু‘দা আর ইউসুফ‘দার ঠেলাগাড়ি আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। আহা! ওই ডিমের চপ যে না খেয়েছে তার জীবন বৃথা। সঙ্গে একটা প্যারাকি। ব্যাস!
যেদিন বিকেলে বানপাউরুটি আর কলা দেয়, সেদিন মনটা আকুপাকু করে। মাঝখানটা কেটে একটা চপ ভরে নিলে আর দেখে কে! ইউসুফ‘দা রোগা মানুষ। পায়জামা আর ফুলশার্ট পরে পাঁউরুটি-বিস্কুট বিক্রী করতো শ্রীসদনের বারান্দার কোণে। আমরা তখন শিশু বিভাগ। ধীরে ধীরে তারও ঠেলাগাড়ি হলো।চপ হলো।চাউমিনও। বিকেলের আলোয়, নিষিদ্ধ চপের হাতছানিতে আমাদের আশ্রমমাঠ তখন স্বর্গোদ্যান। কিন্তু মাধুরী‘দি, কেতকী‘দির চোখে পড়লেই ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’। দুঃসাহসী কেউ কেউ যে ছিলো না, তা নয়। আর ছিলেন ভালো মন্দে’র আঙ্কেল। প্রবীণ আশ্রমিক তিনি। সেই গুরুদেবের আমলের। চমৎকার পাঞ্জাবি রান্না। মুলোর পরোটা থেকে ডাল, কাস্টার্ড… কত নিষ্ঠায় বানাতেন। আমাদের জন্য আবার বিশেষ ছাড়। খড়ের ছাউনির নীচে সিমেন্টের বেদী। বাবুয়া খাবার এনে হাঁক পাড়তো, “দুটো এসটরং, একটা মিডিয়াম।” কফির গন্ধে, কম পাওয়ারের বালব্‌ নেশাতুর তখন। এই ছিলো আমাদের ফাস্টফুড। নিষিদ্ধ ফল! অবদমিত! আকাঙ্ক্ষিত!
কোনো কোনো বুধবার মাথায় ঝুড়ি নিয়ে করবী হস্টেলের বারান্দায় এসে হাজির হতো মোয়ামাসি। মুড়ির, চিড়ের,খইয়ের মোয়া আর আমাদের বিশেষ পছন্দের তিলকূট। এক টাকায় দশটা। আমাদের সামান্য পুঁজির অসামান্য তৃপ্তি। মোয়ামাসিরা কি হারিয়ে গেলো? ছাতিমতলার পথ দিয়ে সাইকেলে যেতে যেতে কোনোদিন সুপ্রিয়‘দা আসতেন হোস্টেল পরিদর্শনে। আমাদের সেদিন টানটান বেডকভারের নীচে সুনীলের নিষিদ্ধ নগরী। রাকা থেকে সোনালী দুঃখ। আমরা তখন ক্লাস ফোর। বাবলু‘দার ডিমের চপ থেকে তসলিমা ইচ্ছের উড়ান যত। আমাদের বয়ঃসন্ধি তখন রেলিঙে বুক চেপে ধরে ছাইপাস কত কী ভাবতো! শরতের ভোরে আমরা শিউলি কুড়তাম। বসন্তের সকালে পলাশের বাঁশী বাজাতে বাজাতে কিচেনে যেতাম। ইংরেজি ক্লাসের শেষে সুমনা‘দি বলতেন, হস্টেলের ছেলেমেয়েরা একটু দাঁড়াবে। ঝোলা থেকে বের করে দিতেন, গাছের পেয়ারা। বড় যত্নের সে দান। আমাদের মাধুকরী। গৌরী‘দি পাঠিয়ে দিতেন আমলকি, ঝুড়ি ভরে।
আমরা হোস্টেলের মেয়ে। বিকেলের আশ্রম মাঠ, ঝরে পড়া শালফুলে আমরা কিশোরবেলাকে ভালোবেসেছি। ঝরে পড়া মহুয়া খেয়েছি। পাতাবাদাম থেকে তেঁতুল পাতাও। বাবলু‘দার গাড়ি আর আসে না। সুখরঞ্জনও না। ভালো মন্দ বলে আর কিছু নেই। যেখানে বসে প্রাচীন আশ্রমিক, যাঁকে আমরা বলি আঙ্কেল, – মুলোর পরোটা আর কফি সাজিয়ে বসবেন খোড়ো চালের ঘর-খানিক তলায়, নিপাট নির্জনতায়। আমাদের কিশোরীবেলা অগত্যা বিনিদ্র রাত জাগে। যেথা চৈত্রের

শালবন…

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]