আমার শান্তিনিকেতন…

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

বুধবার…

প্রতি বুধবার আমাদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন।নয় নয় করেও আধঘণ্টা দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা। সেকী কম হলো! বুধবারের রোদ্দুরটাই যেন অন্যরকম। সাদা ফ্রক, সাদা স্কার্ট মেয়েরদল যখন মাধবী বিতান পেরিয়ে মন্দিরে যাই তখন ঘণ্টা বাজে দূরে। এই ঘণ্টার ধ্বনি ভারী। শমীন্দ্র শিশু পাঠাগার তখন রোদ্দুরে গা সেঁকে নেয়। বসন্তে আলো হয়ে থাকে অশোক ফুল। মাধবীবিতান গন্ধ বিলোয় অকাতরে। আমরা গন্ধ মাখতে মাখতে মন্দিরে গিয়ে বসি।সাদা পাথরের মেঝে, সুনিপুণ আলপনা আর হলুদ, সাদা ফুল যেন দিব্য আলোকটির মতো আমাদের ভিতর থেকে বলিয়ে নিতে চাইতো – অসতোমাসদ্‌গময়, তমসোমা জ্যোতির্গময় … রঙিণ শার্সির ফাঁক দিয়ে তখন আলো এসে পড়তো আমাদের মুখে। আচার্যদেব যা বলতেন তার সবটাই যে বুঝতুম তা নয়! এই না বোঝার মধ্যেও তো এক ধরণের রোম্যান্টিসিজম্‌ আছে, তাই না?

 দেবেন্দ্রনাথের পরিকল্পিত এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১২৯৭’এর ২২ অঘ্রাণ।সেদিন এই উপাসনাগৃহের আদর্শ সম্পর্কে ভাষণ দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। গান গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তারপর কত কত দিন এই আশ্রমগুরু আচার্যের পদে আসীন হয়েছেন। সেদিনও হয়তো ঠিক এমনই রোদ্দুর কলকে ফুলের তলাটিতে লালমাটি আর ছায়ার সঙ্গে মিতালি করেছে! এইসব ভাবতে ভাবতে মন্দির শেষ হয়ে যায়। শীতের দিনে আমরা তারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে আমলকি কুড়োই, পপিফুলের পাপড়ি কুড়োই। সোয়েটারের হাতাগুলো তখন শিশিরে ভিজে যায়। হোস্টেল ক্যাপ্টেন তাড়া দেয়।শান্তিনিকেতন বাড়ির গা ঘেঁষে আমরা এগোই।আড় চোখে ঘাড় উঁচিয়ে একবার করে দেখে নিই এগারো নম্বর ঘরখানি। ওই ঘরটিতে যে বিদেহী আত্মার বাস সে বিষয়ে আমরা নিঃসংশয় ছিলাম। অবাধ কল্পনায় গা ভাসাতে ভাসাতে আমরা প্রাতরাশ সেরে হোস্টেলে ফিরতাম। কোলের উপর বাক্স টেনে বসতাম চিঠি লিখতে। ডেস্ক থেকে ঠিকানা লেখা পোস্টকার্ড বের করে , পেনসিল চিবোতে চিবোতে কী যে লিখতাম তার হিসেব মেলা ভার। তবে প্রতিটি চিঠিতেই আশ্চর্য সব বানানে ‘শ্রীচরনেষু’ শব্দটি লক্ষ করা যেতো। লেখা শেষ হলে চিঠি জমা পড়তো রানীদি, বনানীদির হাতে। তাঁরা পরখ করে নিতেন, কোন চিঠিতে কার কতটা মানসিক দুর্বলতা প্রকাশ পেলো!

 স্নানের আগে, বাগানে লুটোপুটি খেতাম আমরা। মৌটুসি’র ছানা কুড়িয়ে পেলে সযতনে তাকে কল্কে ফুলের মধু খাওয়াতাম। বানিয়ে দিতাম পাতার বিছানা। বাগানের পূর্বদিকে গোল্ডেন শাওয়ার ফুটতো অফুরন্ত। বড় বড় সেগুন পাতা শুকনো হয়ে ঝরে পড়তো।কী যে চমৎকার রোদ্দুর হতো সে’সব দিনে! আমরা তেঁতুল কুড়োতাম, টিয়ার পালক কুড়োতাম আর পাখিদের জন্য, জলদানিতে সযত্নে ভরে দিতাম জল। আমাদের স্নানঘরের দেওয়াল জুড়ে রিলিফের কাজ ছিলো কত! সেসব দেখার ফুরসৎ ছিলো না কারোরই। আমরা বয়রাতলায় ঘুরে ঘুরে বয়রা কুড়োতাম, থেঁতলে খেতাম ভিতরের বাদাম। কোনোদিন জলের ট্যাঙ্ক উপচে গেলে অনর্গল জলধারা বইতো। বাগানের কোনে ছিলো এক কংক্রিটের ম্যাপ। কী অদ্ভুত! ওই জলধারা ভারতের নদী হয়ে নেমে আসতো তখন। এমন জীবন্ত ম্যাপ কে বানিয়েছিলেন কে জানে! আনন্দের এত সব অফুরান আয়োজনে ঝিকিমিকি রোদ্দুর ছিলো, খিলখিল হাসি ছিলো আর ছিলো শোক। সেই  মৌটুসি’র ছানাটা বাঁচলই না। কে যেন আবিষ্কার করলো, কল্কে ফুলের বীজে বিষ থাকে। পাখিটা ভুল করে বীজই খেয়ে ফেলেছে নিশ্চয়!

মৃত পাখি কোলে নিয়ে আমরা সারি বেঁধে গাইলাম, …’তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই …’। বালির স্তুপে পাখিকে শুইয়ে দিলাম। কবরে ছড়িয়ে দিলাম ফুল। সন্তোষালয়ের বারান্দা জুড়ে সেদিন নিস্তব্ধতা। কারো কারো বা চোখে জল। আমরা তো তখন সবে শিশু বিভাগ। আমরা কী আর জানি… সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী, ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন …।

ছবি: কনকলতা সাহা