আমার শান্তিনিকেতন

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

পৌষ সংক্রান্তির বিকেলে আমাদের রান্নাঘর, যাকে আমরা পোশাকি নামে বলি কিচেন, সেই ঘরখানি সেজে ওঠে। দুপুর থেকেই দিদিরা আলপনা দেয়। মাস্টার মশাইরা গোল হয়ে বসে পিঠে তৈরি করেন। এইসব দিনে কার্তিকদার ব্যস্ততার অন্ত নেই। আমাদের আজ খেলার মাঠে যাওয়ার তাড়া নেই। সারি দিয়ে আমরা দাঁড়াচ্ছি, হাত পেতে নিচ্ছি সাজানো থালা। এক বাটি পায়েস, দুটো করে রাঙা আলুর পুলি পিঠে আর একটা করে এই এত্ত বড় কমলালেবু। আমাদের খুশি তখন চোখে মুখে ঝরছে। প্রবাস জীবনে এই নিতান্ত ঘরোয়া পরশটুকু আমাদের কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। সে পিঠে যেমনই হোক সে পায়েস যেমনই হোক তা আমাদের কাছে ধরা দেয় উৎসবের রোদ্দুরটির মতো। খেলার মাঠে যেতে আর ইচ্ছে করে না সেদিন, ইচ্ছে করে পোস্টকার্ড মেলে বসে চিঠি লিখতে। বেলা ফুরোয়, আমাদের উপাসনা শেষ হয়। পৌষ পেরোতেই ঠাণ্ডা কিছুটা কমে। মাঘের হাওয়ায় হাওয়ায় আমের বোলের গন্ধ বয়ঃসন্ধির চঞ্চলতাকে জাগিয়ে তোলে অবচেতনেই। ক্রমে ফুল সোয়েটার ট্রাঙ্কে ওঠে। আমাদের নিত্য দিনের পড়াশোনার মধ্যেই এসে পড়ে বসন্ত পঞ্চমী, বসন্ত কবিতা পাঠের আসর। মহড়া চলে শ্রীমতি কুটিরে, ছাত্রাবাসের স্টাডিরুমে। আমরা হলুদ শাড়িতে, পায়ের ছন্দে বসন্তকে বরণ করে নিতাম। ওই ছিলো আমাদের সরস্বতী পুজো। ছাত্রদের সঙ্গে বিজয়দাও গলা মেলাতেন। আকাশ বাতাস মুখরিত হতো গানে গানে। উদাত্ত গলায় আমরা গাইতুম, – …ওরে বকুল পারুল ওরে শাল পিয়ালের বন/ আকাশ নিবিড় করে তোরা দাঁড়াস নে ভিড় করে / আমি চাই নে, চাই নে/ চাই নে এমন গন্ধ রঙের বিপুল আয়োজন!’…। তবে, বললেই বা শুনছে কে! অশোকে,কাঞ্চনে, শালে শিমুলে সত্যি সত্যি যেন এক বিপুল আয়োজনের সাড়া পড়ে যেত। বর্ষার সেই মেঘমেদুর বিকেলের মতো এই আমিকে সে কিছুতেই একা হতে দিতো না। সেই উদ্‌যাপনের সাক্ষি থাকতো আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি…। আমরা মঞ্জরিত আমের শাখায় উত্তরীয় বেঁধে দিতুম, জ্বেলে দিতুম লন্ঠন। সেই নিরাভরণ সন্ধ্যায় সভা আমোদিত হতো দেশি-বিদেশি কবিতা গুচ্ছে। আমের বোল তখন গন্ধ ছড়াতো অকাতরে। সেও যেন এই উৎসবে সামিল হতে চায়। বড় নির্জন, নিতান্ত সেই সব বাসন্তী উদযাপন। নিতান্ত সাদাসিধে। প্রকৃতি নিজেই যেন সয়ম্বরা সেদিন। আবরণ, আভরণ বাহুল্য মাত্র। সভা শেষ হলেও গানের রেশ তাই গুঞ্জরিত হয় মনে মনে। কিশোরীবেলার বসন্ত সন্ধ্যায় নিজেকে নতুন করে ফিরে পাই যেন। সেই চির নতুন আমি মনে মনে ঠিক জানি, – ‘সব কুঁড়ি মোর ফুটে ওঠে তোমার সুরের ইশারাতে… দখিন হাওয়া’। সেই দখিন হাওয়া মাখতে মাখতেই হস্টেলে ফিরি। ইতিহাস, ভূগোল পড়তে আর ভালোলাগেনা তখন। আমরা তো আর সন্তোষালয় নই! এখন আমরা ‘করবী’। দোতলা হোস্টেলের ব্যালকনি দিয়ে তখন ফাগুন রাতের চাঁদ জোছনা বিলাতো। ঘুম আসতো চোখ জুড়িয়ে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতাম, ওই শিমুল গাছের উঁচু ডালে, যেখানে চাঁদ আর আশমানি হাওয়া গল্প করে, সেখানে পৌঁছে গেছি যেন! বসন্ত এই সব স্বপ্নের ফেরী নিয়ে বেসাতি করে আজও। বসন্ত উৎসবের উত্তেজনা, আবীর, উন্মাদনা পেরিয়ে আমার মনে পড়ে বার বার সেই নিরাভরণ আম্রকুঞ্জের কথা, বসন্তের কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা। বর্ষার বিষাদ পেরিয়ে, শরতের বেতসী পেরিয়ে এই সব নিরাভরণ বাসন্তী রাতে আমাদের কিশোরীবেলা মহাজন পদাবলীর আস্বাদ পায়। মুগ্ধা কিশোরীর বড় সাধারণ বিপ্রলম্ভ সে’সব। শালের মঞ্জরীর মতো সে’সব হয়তো ঝরে যাবে অচিরেই… তবু কিছু মায়া তো রয়ে যায়… তাই না?

ছবি: লেখকের আঁকা