আমার শান্তিনিকেতন

অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন। 

 ভরাবর্ষা। জাম পড়ে রাস্তাটা বেগুনি হয়েআছে। গন্ধরাজের ডালগুলি ভেজা ফুলের ভারে আনত। তেঁতুল পাতায় ছিট্‌ কোকিল আর শালিকেরা আসর বসিয়েছে। রিক্সায় ট্রাঙ্ক আর হোল্ডল চাপিয়ে ঘন সবুজের মাঝখান দিয়ে ভেসে চলেছি যেন। ওই দূরে আমার গন্তব্য,সন্তোষালয়। যার এক কোণে মুকুট ঘর আর দক্ষিণে চীনা ভবন। যার দেওয়াল জুড়ে পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বর। ছবিখানি মুগ্ধতার সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায় অনায়াসেই। ঠিক তার কোল ঘেঁষেই কালো রাস্তার এপাড়ে সবুজ গেট। তার বুক চিরে গেছে লাল মোরাম। 

এই মোরাম বিছানো পথ পেরিয়েই আমাদের হোস্টেল। বারান্দা পেরোলেই লম্বা টানা ডর্মেটরির দেওয়াল জুড়ে টানা ফ্রেস্কো। একেকটা ছবির নীচে,আমাদের একেক জনের সংসার। কে নন্দলাল, কে বিনোদবিহারী সে কি আমরা জানি? আমরা জানলায় মগ পেতে সংসার সাজাই। হলুদ চাদরখানি টান টান করে পেতে দেওয়ার চেষ্টা করি। ছোট্ট আলনায় ভাজ করে রাখি বেনিয়ান, গামছা। অনেক চেষ্টার পরেও কিন্তু মশারিরি দড়ি তার লক্ষ্য ভেদ করতে পারে না। আমরা যে শিশু বিভাগ! আমরা সবে দ্বিতীয় শ্রেণী।

হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ আর লাল টুকটুকে জহর বেদী। আরও খানিক এগোলে বাঁ দিকে বকুলবীথি। আম্রকুঞ্জ আর বকুলবীথির মাঝ বরাবর এক ফালি পথ। যার দু’ধারে বাসন্তিকা ফাগুন দিনে ফুল ছড়ায়। শীতের ভোরে মাটি ভরে যায় ন্যাস্টাসিয়ামের আগুন রঙে। এই পথটুকু পেরোলেই কাঁচ মন্দির। আমাদের উপাসনা ঘর। নতুন চোখে অবাক হয়ে দেখি। তখন কী আর জানি রাঙা ধুলোর মেঘ উড়িয়ে এখানেই আমাদের কিশোরীবেলা বর্ষায়,শরতে,নিদাঘের উদাসী হাওয়ায় পাখা মেলতে চাইবে!

 আমরা লাইন করে খেতে যাই, খেলতে যাই। আমাদের গলায় গান, পায়ে নির্ঝরের গতি। ছুটির দিনে আমাদের আসর বসে তেঁতুলতলায়, কালবোশেখীর পর আম্রকুঞ্জে আমরা পাল্লা দিয়ে আম কুড়োই। কিছু না পেলে বকুল, পাতা বাদাম। আমাদের উত্তেজনার অভাব নেই। আমাদের সহচর এই গাছ,পাখি,অনন্তলতা আর কার্তিকের গন্ধবিলাসী ছাতিম।  সেই কবে যেন মহর্ষি চলেছেন ধূ ধূ প্রান্তর পেরিয়ে। সামান্য একখানি ছাতিমগাছের ছায়া।তিনি খানিক বসলেন,জিরোলেন। কাঁকুড়ে মাটির সামান্য আতিথ্যটুকু তাঁকে মুগ্ধ করল। ফিরে এলেন আবার। বাড়িখানির নাম দিলেন শান্তিনিকেতন।

উপনয়নের পর রবিও এল বাবার সঙ্গে। খোয়াইয়ের নুড়ি পাথর আর স্বচ্ছতোয়ায় তাঁর খেলা চললো  দিনে রাতে। শহর কলকাতার খড়খড়ির জানলা গেলো ঘুচে। পাতায় পাতায় আলোছায়ায় হলো মিতালি। সেই প্রাণের খেলা আর থামলো কই? আমাদের ধূলি মলিন পা’দুখানিও সেই মহর্ষির প্রথম দিনের ভালোলাগার মতো করেই আশ্রমের আতিথ্য গ্রহণ করলো। ওই ঘন পাতার শালবীথিকা জুড়ে আষাঢ়ের মেঘ যখন টালি ছাওয়া সন্তোষালয়ের বারান্দায় তার ছায়াখানি এলিয়ে দিলো তখন কি আর অতিথি হতে ইচ্ছে করে? তখন তো আমার ফেলে আসা গৃহের বল্কলখানি ছেড়ে ফেলে,আমি আশ্রমকন্যা! পথ চলা নয়, পথ চাওয়াতেই যে গভীর আনন্দ সেই বাদল দিনের সন্তোষালয় কত সহজে তা আমাদের শিখিয়েছিল। তাই তো নিশিদিন নিরন্তর দেখি, কেবলই দেখি ,শালের মঞ্জরী কেমন চন্দ্রালোকের স্পর্শ মাখে। শিশুবিভাগ আর কতটুকুইবা বোঝে তার! তবু, যেন মনে পড়ে যায় লুম্বিনী উদ্যানের কথা।

একে একে আলো নেভে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলতে থাকে শুধু। নুয়ে পড়া গন্ধরাজ জাগে, আম্রকুঞ্জ জাগে আর জাগে দ্বিতীয় শ্রেণির এক বালিকা। না,সে ঘুমাবে না,গল্প শোনাবে। শালবীথির গল্প,তিন পাহাড়ের গল্প আর তার নিজের গল্প। যার শুরু হয়েছিল বটে, শেষ হয়নি আজও। (চলবে) 

ছবিঃ কনক লতা সাহা ও গুগল