আমার শীতকাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৃত্তিকা মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জী

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

শৈশবের শীতকালগুলোতে মহা সমারোহ ছিলো, মা বাবার ঠিক মাঝখানে শুয়ে নিরাপত্তার ওম ছিলো…গায়ের চামড়ায় যেন টান না ধরে,পা যেন না ফাটে,লেপ তোষক যেন ন্যাড়া ছাদে রোদ খেয়ে খেয়ে ফুলে আরামদায়ক হয়ে ওঠে … এসব ভাবতেই হতোনা নিজেকে…

মরশুমি রং বেরং এর ফল শাক সবজি নিয়মিত যেন পাতে ওঠে….খেজুরগুড়ের হাঁড়ি,পাটালির তাল এসব আনতে পরিশ্রম হয়, পয়সা কড়ি লাগে, সেসব বোধ ছিলোনা তখন….শীতকালে এসব খেতেই হবে,চাইলেই পাওয়া যাবে ইচ্ছামতোন, যতো খুশি…যেন এমনটাই দস্তুর…

তারপর অনেক শীত গত হয়েছে… ঝুপসি সাঁঝের,নরম রোদের,পাতাঝরার সেসব শীত,নিভিয়া,তুহিনা,
বোরোলীন, ক্র্যাক ক্রিম,নারকোল তেলের সুবাসে সুবাসিত সেসব শীত যেনো বিগত কোনো জন্মের স্মৃতি…

পাখির ছানা উড়তে শিখেছে,বাসাবদল হয়েছে শুধু এমন নয়,নিজস্ব সংসারও হয়েছে একখানা…ফল, সবজি, খেজুর গুড়, পাটালিময় সে সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক কাজকম্মে তবু ছেড়ে চলে আসা বড় প্রিয় একখানা সংসারের ছায়া লেগে থাকে!!…..

এখন এই শীত আসবে আসবে এমন সময় ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যায়, ধূপধুনোর গন্ধে বড়ই মন কেমনের মরশুম চলে….রূপোর কাঠি সোনার কাঠির ছোঁয়াতেও চিরকালের জন্যে শীতঘুমে চলে যাওয়া শৈশব বেঁচে উঠবেনা,খেলে বেড়াবেনা ছাব্বিশ কাঠা জমি,পুকুর,বাগানসহ বিশাল বাড়ির সেই উঠানে!!!…

এখন আমার নিজের পশমিনা চাদর আছে, নরম রেশমী কম্বল আছে,আছে গদির আরামদায়ক বিছানা….তবু বাবার রং চটে যাওয়া সিগারেটের গন্ধমাখা খদ্দরের চাদরের নীচে যে সুখের ওম তা সেখানে নেই…

এখনো আমার নারকোল তেল রোদে দেওয়ার অভ্যেস রয়ে গেছে ,চুলে যত্ন করে তেল লাগিয়ে দেওয়ার হাতদুটো শুধু অবসর নিয়েছে কাজটুকু থেকে …এখন আমি চুলে তেল দেওয়ার বিলাসিতাটুকুও ত্যাগ করেছি…

এখন আমার খাবারের থালায় নিজের,নিজেদের অর্জিত অর্থ আর পরিশ্রমের ইতিবৃত্ত বড় প্রকট…”চাইলেই মিলবে” ভরসা দেওয়া সান্তাক্লজটিও অদৃশ্য,অদৃশ্য সেই পিতলের কলসি আর কাঁচের বয়ামে সাজানো ছিমছাম মধ্যবিত্ত রান্নাঘরটুকুন…সেখানে সীমিত আয়ের ঘেরাটোপেও কোনোদিন কিছু অমিল হতোনা,পিঠে পায়েস থেকে শুরু করে হঠাৎ করে চলে আসা অতিথিদের আপ্যায়ন সবটুকুই যেন চলতো অক্লেশে,অনায়াসে….এখন আমার জিভের স্বাদ ,খাওয়ার ইচ্ছা পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে….আমার রান্নাঘর খেয়াল খুশি মতোন ইচ্ছাপূরণের ম্যাজিক জানেনা…

সকালে স্কুল যাওয়ার আগে ছোটবেলার কোনো শীতে উনুন ধরাতো মা…হাতপাখার হাওয়া করে আঁচ বাড়াতো…হাতে বেলা গরম গরম নরম তুলতুলে রুটি , টাটকা গরুর দুধে ভিজিয়ে খেতাম স্কুলে যাওয়ার আগে…..সুখ দুঃখ, কিছুটা মনে পড়া,অনেকটা ভুলে যাওয়া নিয়ে সেসব শীত বিদায় নিয়েছে কবেই….আমিই কেবল বোকার মতন নিভিয়া,ক্র্যাক ক্রিম,নারকোল তেলের গন্ধে ফিরে পেতে চাই সেসব দিন…স্মৃতির অতল থেকে তুলে এনে স্পর্শ করতে চাই, ফিরে যেতে চাই সেইসব শীতকালগুলোতে!!!

অনির্বেদ শৈশবকে ফিরে ফিরে পেতে চাওয়া, বিরতিহীন,অক্লান্তভাবে ফিরে পেতে চাওয়ার শীতকাল সত্যিই অভিমানী!!!….অধরা…

নিজস্ব আকাশে অবাধে উড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা বড়ই স্বাদু….তবু মানুষ কেন যে স্বেচ্ছায় পিছুটান চায়!!!….

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]