আমার শৈশব ও সোভিয়েত নারী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাবরিনা শারমিন চৌধুরী

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

উঠানে খেজুর পাটি বিছিয়ে পড়তে বসার এক সকাল। পড়ার বইগুলো একপাশে রাখা। সামনে ছড়ানো ‘সোভিয়েত নারী’। অবাক চোখেদেখছি সোভিয়েত নারীদের হুলস্থূল কর্মকাণ্ডের সব ছবি। গোলগাল স্বাস্থ্যবান বাচ্চাদের ছবি। তাদের স্কুল, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য পরিচর্যাএবং আরো কতো রকমের ছবি। লেখা কম, ছবি বেশি।
খেজুর পাতার পাটি বিছানো যে সকালের কথা বলছিলাম, তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। জেলা শহরগুলোকে তখন বলা হতো মফস্বলশহর। রাজধানী থেকে দূরে সেসব মফস্বল শহরে ঢাকার দৈনিক কাগজ রাত ন’টার আগে বাসাবাড়িতে পৌঁছাতো না। সেরকম সময়ে,সেরকম এক শহরে আমার বাবা কোথা থেকে কিভাবে যে রাশিয়ান পত্রিকা ‘সোভিয়েত নারী’ যোগাড় করে আনতেন, তা জানার উপায় আজ আর নেই।

সকালে খেজুর পাটি বিছিয়ে বসে সোভিয়েত নারী দেখছিলাম। আব্বা আগের রাতেই ম্যাগাজিনটির নতুন পুরানো সংখ্যা মিলিয়ে কয়েকটি কপি এনে দিয়েছিলেন। বললেন ‘ছবি দেখ’। আমি ছবি দেখলাম পাতার পর পাতা উল্টিয়ে। কি যে মায়া সেসব ছবিতে!নিজের জগৎ থেকে ভিন্ন আরেক জগতের নারী-শিশু, শিশুদের জন্য কত রকমারি কাজ কারবার যে সেই ছবিগুলোতে থাকতো! আমি দেখলাম, তারপর পড়লাম। দেশটার নাম জানলাম। ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিকস। সোভিয়েত রাশিয়া। আমারখুব সাধারণ বাবা এভাবেই একটি অসাধারণ দেশ সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এমন সহজ করে এমন গভীরভাবেপরিচয় করিয়ে দিলেন যে রাশিয়া আমার পছন্দের দেয়ালে ছবি হয়ে আজও ঝুলছে। ক্লাস থ্রিতে শুরু, তারপর সোভিয়েত নারী’র সঙ্গেসম্পর্কটা থাকে বলতে গেলে পুরো স্কুল সময়টা জুড়েই। রাশিয়া নিয়ে আমার মুগ্ধতা চলতেই থাকে । এমনই মুগ্ধতা যে হাইস্কুলে উঠে রুশ ভাষা শিখতে শুরু করলাম। এমনতর সে মুগ্ধতা যে, যেদিন
টেলিভিশনের স্ক্রিনে লেনিন এর স্ট্যাচুটা পড়ে যেতে দেখছিলাম, মনে হলো আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে।

আমার বাবা একজন লেনিনপ্রেমী মানুষ ছিলেন তা পরে বুঝেছি। তিনি আরো অনেক কিছুই ছিলেন যা অনেক দেরিতে জেনেছি।মানুষটাকেই জেনেছি অনেক পরে, অনেক বেশি দেরিতে। আব্বা চাইতেন আলো ছুঁয়ে থাকুক আমাকে। গণ্ডি পেরিয়ে, খোলস ছাড়িয়ে আমার যাত্রা হোক বড় পৃথিবীতে। বড় পৃথিবীতে যাত্রা পথে ‘সোভিয়েত নারী’ ছিলো শুরুর দিকের এক অনুষঙ্গ।

আমাকে অন্ধকার স্পর্শ করতে না দেয়া মানুষটি আমার বাবা। শান্ত, স্বল্পভাষী, অথচ কি গভীর একজন মানুষ। ৩ মে, আমার বাবা,আমার প্রিয় ব্যক্তিটির মৃত্যুবাষির্কী ছিলো। কিভাবে এতোগুলো বছর, ঠিক ১৫টি বছর আব্বাকে ছাড়াই পার হয়ে গেল জানি না। ভীষণমিস করি।

মনে মনে ভাবি যদি ফিরে পেতাম সেই শৈশব, সোভিয়েত নারী’র শৈশব। যে শৈশবে ‘সোভিয়েত নারী’ আছে, সে শৈশব আমার। সে শৈশবে আমার বাবা আছে, আমার স্বপ্ন আছে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]