আমার সোনার মাদারটেক…. আমি তোমায় ভালবাসি

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা আমাদের মাদারটেকের বাসায় যখন গেলাম, আব্বা খুব মন খারাপ করলেন।শান্তিবাগের শহুরে বাসা ছেড়ে এতো দুরের একটা ছোট্ট বাড়ি,নাই গ্যাস, নাই ওয়াসা,নাই বিদ্যুৎ নাই রাস্তাঘাট! আব্বাকে তো অফিস করতে হয়! কিন্তু আম্মার একটাই কথা,দিন দিনই ভাড়া বাড়ে,সেখানে যেমনই হোক,নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাই খুবই প্রয়োজন। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর আব্বাই সবচে খুশী হলেন।দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো।আব্বা মাছ ধরার জাল বোনা শুরু করলেন।নানারকম বড়শীর ছিপ রেডি করতে লাগলেন।আম্মা ও খুব খুশী কারণ আব্বা বেজার হলে আম্মার দিন কিভাবে যাবে? বৃষ্টি নামলে মাদারটেকের কাদা ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করতো। কমপক্ষে চারদিন লাগে রাস্তার কাদা শুকিয়ে চলার মত পথ বেরুতে! কিন্তু কাদা শুকানোর জন্য অপেক্ষা করলে কি আর কাজ কর্ম বসে থাকে? জুতা খুলে সে পথে হাঁটলেও কাদা ছিটে জামাকাপড় মেখে যায়।সে কাপড় নিয়ে ভদ্র পরিবেশে যাওয়া দুষ্কর।

ওস্তাদজীর বাসায় যেতে হলে একটা ঘরের কাপড় পড়ে কাদার মাঝেই রওনা হতাম। পাশের বাড়ির মালিক হায়দার কাকার বাসাবোর বাসা পর্য্ন্ত গিয়ে উনার বাসায় কাদাওয়াinsite-jan-3-2017লা কাপড় বদলিয়ে অন্য কাপড় পড়ে ওস্তাদজীর  বাসায় যেতাম,ফেরার পথে আবার কাপড় বদলিয়ে বাড়ি ফিরতাম।কিন্তু বৃষ্টি বন্যার দিনে স্কুলে খালিপায়েই যেতাম।কারণ ক্লাস করার পুরো সময় স্যান্ডেল জুতা হাতে নিয়েই বইতে হতো।খাজনার চেয়ে বাজনা বেশী হতো বলে স্কুলে স্যান্ডেল নিতাম না।

এই যে গল্পচ্ছলে কিশোর কাহিনী বলে যাচ্ছি তাতে যুদ্ধ ছিল বটে কিন্তু দারিদ্র ছিলনা।কখনওই নিজেদের ওভাবে ভাবিনি।কখনওই মনে হয়নি আমি শহরের অন্য বাচ্চাদের চেয়ে দরিদ্র। রেডিও টিভিতে তখনি অনেক অনেক বড় বড় অনুষ্ঠান করেছি।দু একটি জামা একজোড়া জুতা পড়েই বছর পার করেছি,কিন্তু কখনওই জামাজুতার জন্য দুঃখ বোধ ছিল না।কারণ হলো আমার পরনের কাপড় জামা ছিল আব্বার হাতে বানানো। অপূর্ব সুন্দর ছিল আমার জামাগুলো।যেখানেই যেতাম সবাই ডাক দিয়ে কাছে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন,এই জামা নাকি তোমার আব্বা বানিয়েছেন? আম্মা বানাতেন উলের মেশিনে দারুন দারুন সোয়েটার। সে সোয়েটার নিয়েও বাড়তি আগ্রহ ছিল সবার।এবং এ ব্যাপার নিয়ে প্রচ্ছন্ন একটা গর্ব ছিল আমাদের সবার,বিশেষ করে আমার।কারণ আমার জামাগুলোই বেশী সুন্দর ছিল।

এখন আমি বসে বসে ভাবি কতইনা সমৃদ্ধ কৈশোর ছিল আমার! সাধারণ সচ্ছল সাদামাটা জীবন আমার হলে এভাবে জীবন কে আমি দেখতাম কি ভাবে? এইযে সাধারণ একটা মাটির প্রকরণ, যা অল্প বৃষ্টিতে কঠিন কাদা হয়ে গলে যায়,আবার বাতাস পেলে ধীরেসুস্থে তা আঠালো ভাব ধারন করে শুকিয়ে আবার কঠিন রূপ ধারণ করে, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে বিশাল দর্শন লুকিয়ে আছে যা কিনা আমার এই ভাবনাময় জীবনের পথে বিশাল পাথেয়। সত্যই কৈশোরকাল মাদারটেকে কাটাতে পেরেছি বলে নিজের ভাবনাজগত কিছুটা হলেও সম্বৃদ্ধ করতে পেরেছি বলে আমার মনে হয়।

এজন্যই আমি প্রায় সময়ই নিজে নিজে গুনগুনিয়ে গাই ‘আমার সোনার কাদারটেক আমি তোমায় ভালবাসি ‘

ছবি: লেখক