আমি আর আমার শহর কলকাতা

রাজা ভট্টাচার্জী

রাজা ভট্টাচার্জী

কলকাতা আমার শহর না। আমি জন্মাই নি এই শহরে। আমি যেখানে জন্মেছি – তা আদ্যোপান্ত একটা উদ্বাস্তু কলোনি, আমার জন্মের সময়ও তার সর্বাঙ্গ থেকে গঞ্জের সুবাস উঠত। মাটির রাস্তা ছিল প্রচুর; মাটির আর বেড়ার বাড়িও। সোজা, জনহীন ছায়া-ঢাকা রাস্তাগুলো দিয়ে হেঁটে যেত ঝিমঝিমে দুপুরের বাসনওয়ালা আর পাঁচ পয়সার আইসকিরিম। অনেকটা ফারাক রেখে দাঁড়িয়ে থাকত বাড়িগুলো – মাঝে তাদের ঝোপঝাড়ের সবুজ আশ্রয়।

প্রথমবার কলকাতায় আসার অভিজ্ঞতাটা প্রায় কোনও মফস্বলি ছেলেমেয়েই ভোলে না। শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে সেই প্রথম দেখা – আর দেখামাত্র সম্মোহিত হয়ে যাওয়াটা আমিও ভুলি নি আজও। সামনে মস্ত ফ্লাইওভার, তার উপর দিয়ে দিগ্বিদিকে পাড়ি দিয়েছে রাস্তা, ধাঁ ধাঁ করে দৌড়চ্ছে অসংখ্য গাড়ি – সে এক কাণ্ড বটে! কিন্তু সে সব নয়।

ধর্মতলা রোড

ধর্মতলা রোড

আমাকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়েছিল মানুষের ঢল।বিচিত্র পোষাকের, বিচিত্র ছাঁদের হাজারো মানুষ ছুটছে ঝড়ের বেগে ; কেউ কারুর দিকে দৃকপাত পর্যন্ত করছে না। এত কাজও আছে পৃথিবীতে! আমাদের ওখানে তো ফিরিওয়ালাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে বাবার সঙ্গে! ‘নাঃ, শহুরে ব্যস্ততা একেই বলে’ – এই রকম একটা সমীহের ভাব হয়েছিল আমার। ঠেলাওয়ালা ধাক্কা দিয়ে চলে গেলেও সেই ‘সশ্রদ্ধ’ মানসিকতা আমার কাটে নি। আর হ্যাঁ, মানুষই বা কত্ত রকমের রে বাবা! কেউ স্যুট, কেউ ধুতি-পাঞ্জাবি, কেউ বা নিছক প্যান্ট-শার্ট পরে কেজো। তবে হ্যাঁ, ব্যস্ত সব্বাই। একটু পরেই অবশ্য বুঝলাম – শিয়ালদা স্টেশনে যাঁদের দেখা যাচ্ছে – তাঁরা কেউ কলকাতার লোক নয়। এঁরা আমার মতোই মফস্বলের মানুষ – নানা কর্মসূত্রে কলকাতায় আসছেন বা কাজ সেরে ফিরে যাচ্ছেন। কারণ সেখান থেকে আমরা গিয়েছিলাম কাছেই একটা গলির মধ্যে ;

দিনেমানেও সে গলি অন্ধকার, ওপাশ থেকে আর একজন এলে কি করে যাওয়া যাবে – মাথায় ঢুকছিল না আমার। সেই গলির মধ্যে আরও অন্ধকার একটা বাড়িতে ঢুকেছিলাম আমরা, আর আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম – এ বাড়িতে ভুত আছে। আছেই আছে। পুরনো বাড়ির ছ্যাতলা-ধরা উঠোন সতর্ক পায়ে পার হয়ে, উঁচু চৌকাঠ পার হয়ে ঢুকতে হয়েছিল হলদে ডুম-জ্বলা ঘরে ; আর প্রথমেই চোখ পড়েছিল মস্ত দেওয়ালঘড়িটার উপর। তখন বেলা তিনটে বাজে। আমার মনে পড়েছিল, সেই বাড়ির বাসিন্দা আমাদের আত্মীয়টি আমাদের বাড়িতে গেলেই বলতেন -“আমরা শহরের মানুষ তো, এই গ্রামেগঞ্জে থাকাটা ঠিক পোষায় না।” এখন মনে হল – অন্ধকার থেকে অত আলোয় গেলে তো চোখে ধাঁধা লাগবেই! ভাল লাগার তো কথা নয় এদের! আর অমনি, ‘কলকাতার লোক’-দের প্রতি ভারি মায়া হয়েছিল আমার – আহা রে! কত কষ্টে এরা এইসব এঁদো গলির ভিতরের সোঁদা ঘরগুলোয় থাকে !
উচ্চ-মাধ্যমিকের পর, সবার মতো আমার সঙ্গেও, কলকাতার পরিচয় ঘটল বইমেলাকে কেন্দ্র করে। এই প্রথম অভিভাবক ছাড়া, বন্ধুবান্ধবদের সাথে কলকাতায় আসা ; ধর্মতলায় নেমে আমিনিয়ায় বিরিয়ানি! সেই প্রথম বিরিয়ানি খেলাম আমি। আমাদের ওখানে তখন বাইরের খাবার বলতে বাদামতক্তি আর মটরভাজা – এগরোল বা মোগলাইও পাওয়া যেত না। কাজেই বিরিয়ানি আমার কাছে দেবভোগ্য খাবার হয়ে গেল – এখন

কলেজস্ট্রিট

কলেজস্ট্রিট

ও তাই। তারপর বইমেলা। হাজার হাজার মানুষ, লক্ষ লক্ষ বই – আর আমার আত্মসমর্পণ।
কিন্তু এও নিতান্ত বাইরে থেকে ক্ষণিকের দেখা। কলকাতার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটল এম.এ.পড়ার সময়। আর আমার জীবনের উষ্ণতম প্রেম এল & nbsp; জীবনে। কলেজ স্ট্রিট। অগুন্তি বইয়ের দোকান, দোকানিদের ডাকাডাকি, এড়িয়ে যাওয়া, সাত টাকায় কিনে ফেলা ‘কুমারসম্ভব’, তিরিশ টাকায় ‘জিম করবেট অমনিবাস’! ফুটপাথে অবহেলায় পড়ে থাকে ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রথম বছরের কোনও কপি। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা আমায় শিখিয়ে ফেলল – বারদুয়ারি বা খালাসিটোলায় না-গেলে লেখক হওয়া অসম্ভব! তখন পিতৃহীন হয়েছি, পকেটে থাকে মান্থলি, আর কোনোক্রমে কিছু খেয়ে নেওয়ার মতো পয়সা। বারদুয়ারি যাওয়ার শুধু পয়সা নয়, হিম্মতও ছিল না আমার, চিরকালের আনস্মার্ট ক্যাবলা। ফলে লেখক হওয়া আর হল না আমার। কিন্তু মগজের মধ্যে হু হু করে ঢুকতে লাগলেন কালিদাস থেকে মার্কেস। আর সুমন চট্টোপাধ্যায়। তখন ওই নামেই চিনতাম তাঁকে – কবীর সুমন হয়ে ওঠা আরও অনেক বছর পরের কথা। কাজেই ইউনিভার্সিটির লন ভরে উঠল ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’র সুরে। প্রথম শুনলাম শহীদ কাদরির নাম। ল্যাংস্টন হিউজ বা এলভিস প্রেসলি, নচিকেতা বা বব ডিলানের সাথেও আলাপ হল লনে বসে, বন্ধুদের মুখ থেকে শুনে শুনেই। হাজারো সুরে ভরে দিল আমায় কলকাতা। ঋণ, বড় ঋণ হে….

নর্থকলকাতা

নর্থকলকাতা

এরপরের ঘটনাটা অবশ্য আমাকে স্থায়ীভাবে বেঁধে ফেলল কলকাতার সঙ্গে। এই শহরেরই একটা স্কুলে পড়াতে এলাম আমি। অজানা রাস্তার নাম, অজানা ঠিকানা। ধর্মতলা আর কলেজ স্ট্রিটের বাইরে তো খুব কিছু চিনি না আমি। তারপর, এই প্রথম আমার কাছে ঘোমটা খুলে সোজা চোখে তাকাল সত্যিকারের কলকাতা। এ কোলকাতার মধ্যে আছে যে আর-একটা কলকাতা – সেই না-দেখা, না-চেনা শহরটা আস্তে আস্তে ধরা দিতে লাগল আমার কাছে। এর সরু গলির মধ্যে লুকিয়ে আছে মাটির বাড়ি। এর সুপ্রাচীন প্রকাণ্ড ইমারতে বাস করে হদ্দ-গরীব একই পরিবারের পঁচিশ ঘর বাসিন্দা। বিকেল চারটের সময় লম্বা গরাদের জানলার সামনে উবু হয়ে বসে কলপ-করা গোঁফ ছাঁটে শীর্ণকায় প্রৌঢ়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে রং-মাখা মেয়ের দল। দালালের দল ঝিমোয় গাড়িবারান্দার ছায়ায়। পুরনো বন্ধ ফোয়ারার উপরে গুটিসুটি মেরে ঘুম দেয় দাড়িওলা পাগল। জরাজীর্ণ বাড়ির গেটের উপর দাঁড়িয়ে থাকে পৃথিবীর বুকে পা তুলে দেওয়া সিংহ। বিশাল ভগ্নপ্রায় নাচমহল দেখিয়ে অটোওয়ালা বলে -“এইটাই আমাদের পুরনো বাড়ি, বুয়েচেন স্যার। একন অবস্তা পড়ে গিয়ে – এই যা দেকচেন – অটো চালাই!” ‘মিড ডে মিল’ এসে গেছে খবর পেলে হাসি ফোটে অভিজাত বাড়ির অভুক্ত ছাত্রের মুখে। কনকনে শীতের ভোরে গঙ্গাস্নান করতে যায় পাড়ার বুড়িটা। সন্ধ্যের পর রোয়াকে জমে ওঠে আড্ডা, একই রকের তিনদিকে মুখ ফিরিয়ে চা শেষ করে সিগারেট ধরায় তিন প্রজন্মের কলকাত্তাই বাবু। চায়ের দোকানে ভরদুপুরেও জমে ওঠে তর্ক – সৌরভ না ধোনি – কে বেটার ক্যাপ্টেন। মিনার্ভায় আসে নতুন থিয়েটার। পুজোর আগে চুলে লাল রং করে ইশকুলে এসে খামোখা বকা খায় কেলাস ফাইভের বিচ্ছু – কেননা রংটা আসলে করিয়ে দিয়েছে ওর বাবা। পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ সন্ধ্যায় ধীর পায়ে ঢোকেন তাঁর বাঁধা রক্ষিতার ঘরে। কলঘরে উঁকি মারে কৌতুহলী কিশোর। রাস্তার কল থেকে জল ভরে বাড়ি ফেরে ভগ্নস্বাস্থ্য যুবতী। প্রাচীন দুর্গের ঢঙে তৈরি শৌখিন সৌধে চলে স্কুল। আর আমার প্রবীণ সহকর্মী আমায় চিনিয়ে চলেন -“এই হল রবি ঠাকুরের বসতবাড়ি। এই স্কুলে পড়তেন তিনি। এই দ্যাখ বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত স্কুল। এই বাড়িটায় এককালে খাতা লিখতেন সাধক রামপ্রসাদ। এটা প্রসন্নকুমার ঠাকুরের ‘টেগোর ক্যাসল্’। আর এটা হল কালীপ্রসন্ন সিঙ্গির…..”

হাওড়া ব্রীজ

হাওড়া ব্রীজ

আর আমি চিনে নিতে থাকি উত্তর কলকাতাকে – যার প্রতি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে বাঙালি জাতির অভ্যুত্থানের ইতিহাস। একদিন যে কলকাতা গোটা ভারতকে পথ দেখিয়েছিল – তার ভগ্নাবশেষ দেখে বেড়াই আমি। আমার কান্না পায়। আমার গর্ব হয়। নিমতলার রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিসৌধ দেখে ভাবি – কোনকালে লিখেছিলেন তিনি -“আর এক ওই শান-বাঁধানো নিমতলার ঘাট…মানুষের মরেও শান্তি নেই।” কোম্পানির বাজার থেকে আখ কিনে খাই বাচ্চাদের মতো, বাড়িতে নিয়ে আসি ট্যাঁপারি। মিত্র কাফে আর গোলবাড়ির কষা মাংসের দোকানের দিকে তাকাই লুব্ধ চোখে।আনমনে পেন্নাম ঠুকি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সিঁড়িতে। আর এই সব কিছু নিয়ে আমার মগজে হু হু করে ঢুকতে থাকে আমার কলকাতা। সে কলকাতা ঝাঁ-চকচকে নয় মোটেই। আমি জানি – অদূরেই আছে আর এক কলকাতা,তার আকাশে উঠেছে মস্ত মিনার, আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে অসংখ্য ফ্লাইওভার আর শপিং মলে। তিরিশ তলা, বত্রিশ তলা ইমারত উঠছে অজস্র। আর এই কলকাতার ঘরদোর ভাঙা, পর্দাগুলোয় ময়লা জমেছে। কিন্তু সে বেঁচে আছে খুব। নাড়ি চলছে দিব্যি। হুতোমের কলকাতা আর আমার কলকাতা – যেন দেড়শো বছরের ব্যবধান পেরিয়ে হঠাৎ হাত ধরে পরস্পরের। আমি দু’হাতে চেপে ধরি তাদের হাত। তারপর হাঁটতে থাকি সরু গলি ধরে। গঙ্গার ঘাটের দিকে। অতীতের দিকে। ভবিষ্যৎ দেখে নিতে হেঁটে যাই সনাথ সন্ধ্যায়…আমি আর আমার শহর…


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box