আমি আর টিনটিন

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

(ইংল্যান্ড থেকে): যখন আমার ৫-৬ বছর বয়স তখন বাবা একদিন বাড়িতে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে এলো, আনন্দমেলা। যুক্তাক্ষর পরতে খুব অসুবিধা হতো, তাই প্রথমেই প্রেমে পড়ে গেলাম গাবলুর। কথা কম, ৬ টা ছবিতেই একটা গল্প। কিন্তু আরেকটা ধারাবাহিক কমিক্স কিছুতেই মাথায় ঢুকলো না, একটা কালো গরিলা একটা কম চুল ওলা ছেলে কে তাড়া করছে। সেই প্রথম আলাপ টিনটিনের সঙ্গে। গল্পটা কৃষ্ণ দ্বীপের রহস্য। পরে বাবা যখন অফিসের লাইব্রেরির বাতিল হয়ে যাওয়া পুরনো আনন্দমেলা গুলো এনে দিয়েছে তখন সেগুলো সাজিয়ে পুরো গল্পটা জোগাড় করে ছিলাম। এখন বেটু কিছু চাইলেই মনে হয় কিনে দি, আমার বাবাও হয়তো ভাবতো, কিন্তু সেই কাজটা সেই সময়ে এতটা সহজ ছিলো না, তাই আনন্দমেলার কমিক্সের পাতা গুলো কেটে নিয়ে স্টেপল করে বানিয়েছিলাম কালো সোনার দেশে, চাঁদে টিনটিন। সেগুলো নিয়েই স্বপ্ন দেখতাম বন্ধুরা মিলে। স্কুল থেকে ভ্যানে করে বাড়ি ফেরার সময় টিনটিনই অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকতো। আরো দু’বছর পরে প্রথম হাতে পেয়েছিলাম আনন্দ থেকে বেরনো টিনটিনের গোটা বই, পান্না কোথায়। স্টেপল করার দিন তারপরে শেষ হলো, দুই ভাইয়ে মিলে পয়লা বৈশাখে পাওয়া টাকা জমিয়ে কিনেছিলাম তিব্বতে টিনটিন, লোহিত সাগরের হাঙর।
তখন ডিডি ওয়ান আর টু এর সময়। বিদেশের সঙ্গে পরিচয় মানে শুধু টিনটিন। ইউরোপে সাইপ্রাস গাছ আছে, ইনকাদের পিরামিডের মাথাটা চ্যাপ্টা, সমুদ্রের জল নীলও হয়, ক্রোয়েশিয়ার বর্ডারে জলকে দোজট বলে, ধর্মের নামে জাহাজের খোলে কালো চামড়ার মানুষ পাচার হয়ে যায়, এগুলো টিনটিন না পড়লে জানতাম না। একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলে তার কুইফ হেয়ার স্টাইল আর ফক্স টেরিয়ার কুট্টুসকে নিয়ে দুনিয়া ময় ছুটে বেড়াচ্ছে, সে সৎ, নির্ভীক এবং বুদ্ধিমান। আর তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো কেউ দারুন সায়েন্টিস্ট কিন্তু কানে শুনতে পায়না, কারও দরাজ মন কিন্তু মুখের ভাষা অদ্ভুত, কেউ দারুন গায়িকা কিন্তু গলায় সুর নেই, এরা সবাই নিজেদের দোষ,গুন, এক্সেন্ট্রিসিটি নিয়ে আছে, কিন্তু কেউই কখনো ‘জাজড’ হচ্ছে না।
আমাদের সময়ের ছেলেমেয়েদের টিনটিন অনেক স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলো, প্রাইমারীতে পড়বার সময় স্কুলের বন্ধুরা মিলে টিনটিন নিয়ে নাটক ও করবো বলে ভেবেছিলাম, তার অনেকটা কৃতিত্ব যায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে, মানুষটা একার ইচ্ছাতে টিনটিনের শুধু অনুবাদ করে থেমে থাকেননি, একটা আলাদা ডাইলেক্ট তৈরি করেছিলেন। তাই হ্যাডকের মুখে সহস্র কুঝঝটিকা, জ্বালা ধরানো কোটি কোটি ফোস্কা পরে যে আনন্দ পেতাম সেটা পরে ইংলিশে মিলিওনস অফ থান্ডারিং টাইফুন পরে পাইনি। 
এই গৌরচন্দ্রিকার একটাই কারন, আজকে ছোটবেলার হিরোর সঙ্গে ১৫.০৪.১৭ তারিখে দেখা করে এলাম! আমার ব্রাসেলস আসার প্রথম কারণ ছিল এইটিই। ব্রাসেলস কে বলে কমিক স্ট্রিপের রাজধানী, শহরের অলিতে গলিতে বাড়ির দেওয়ালে কমিক্স আঁকা, লাকি লুক, জেন, মারসুপিয়ামি, গ্যাস্টন, এই সবকটার জন্ম এই শহর থেকে, আর টিনটিনেরও, আর্জে স্থানীয় খবরের কাগজে কাজ করতে করতে টিনটিন তৈরি করে ফেলেন ১৯২৯ শে।
আর্জের মিউজিয়ামটা ব্রাসেলস শহর থেকে একটু দূরে, যেতে মিনিট চল্লিশেক সময় লাগলো, বাইরের অবয়ব টা খুব ছিমছাম, শুধু আমেরিকায় টিনটিন থেকে একটা বড় স্কেচ একপাশের দেওয়াল জুড়ে। ভেতরে একটা অডিও গাইড মিললো, তিনটে তলা মিলিয়ে ২০০০ স্কোয়ার ফুটের মিউজিয়াম, প্রথমে লিফট এ তিনতলায় চলে যাও, তারপরে এক্সিবিট গুলো দেখতে দেখতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসো, প্রায় সব ক’টা গল্পের ম্যানাস্ক্রিপ্ট, টিনটিনের প্রথম দিক কার স্কেচ, সব যত্ন করে রাখা আছে। অনেকেই জানেন আর্জের আসল নাম জর্জ রেমি। প্রথম দিকে দৈনিকে বেরনো টিনটিনের প্রবল সাফল্যের সময়তেই আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, চাকরি যায় রেমির, তখন এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে নিজেই টিনটিনের ম্যাগাজিন বার করতে শুরু করেন। তার পরে পরে আসে কুইক ন ফ্লাফকি, জো,জেট আর জোকো এদের কমিক্স, কিন্ত টিনটিন বরাবরই রেমির অনেক কাছের। নিজে ছিলেন বয় স্কাউট, তাই টিনটিনও অনেকটা সেই আদলেই তৈরি। এমনকি টিনটিনের প্রথম আবির্ভাব যখন ‘টোটোর’ নামে তখন তার পোষাকও ছিল স্কাউটদেরই মতো। পরে আসে প্লাস ফোর ট্রাউজার আর ইটন কলার।
রেমি নিজের ছদ্মনাম নেন আর্জে, নিজের নামটা কে উল্টো করে আদ্যক্ষর গুলো কে ফ্রেঞ্চে পরলে আর্জেই দাঁড়ায়। নিজের জীবনটা ক্ষততে ভর্তি, কিন্তু টিনটিন থেমে থাকেনি, তাই চাকরি চলে যাওয়ার পরেও এসেছে টিনটিন কঙ্গোয়, ১৮ মাস ডিপ্রেশনে ডুবে থাকার পরেও তৈরি করেছেন মমির অভিসাপ, সদ্য রক্তাক্ত ডিভোর্সএর পরেও এঁকেছেন তিব্বতে টিনটিন।
টিনটিন তার ৩৭ বছরের জীবনে সব মিলিয়ে ২৩ বার অ্যাডভেঞ্চারে বেড়িয়েছিল, সেগুলো থেমে যায় ১৯৮৩ র একটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে, যেমন থেমে গেছিল ফেলুদা আর ব্যোমকেশ। স্রষ্টার মৃত্যুর সঙ্গে সৃষ্টিরও মৃত্যু হয়। এটা এমন একটা সম্পত্তি যেটা উইল করে পরের প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়া যায়না। সেটা হলে আজকে পেটমোটা,চেক জামা পরা ফেলুদাকে দেখতে হতো না, অথবা স্পিলবার্গের অসম্ভব খারাপ টিনটিনের জগাখিচুড়ি সহ্য করতে হতো না, যেটা দেখতে গিয়ে অনেক টিনটিন প্রেমীই মাঝপথে হল থেকে বেড়িয়ে এসেছিলো।

স্বপ্ন দেখা খুব সহজ, কিন্তু সেটাকে লালন করে বড় করা, বুকে করে নিয়ে বেরনো, আর সত্যি করার মধ্যে অনেক কাল ঘাম লুকিয়ে থাকে, আমার আরো একটা স্বপ্ন সত্যি হলো আজ, বেটু টিনটিনের কিছুই বোঝে না, ওকে ঘিরে এখন আনা,এলসা,মোয়ানারা। কিন্ত মেয়েটাকে বুঝিয়ে নিয়ে এসেছিলাম যে আজকে তোর জন্য টিনটিন ওয়েট করে আছে, কয়েকটা ছবিও দেখিয়ে ছিলাম টিনটিনের, তাই আজকে যখন সেই মেয়ে টিনটিন,কুট্টুস,হ্যাডক,ক্যালকুলাসের পুতুল কিনে বেরোলো আর বেরোনোর আগে বাই টিনটিন বলে এলো তখন নিজের মনটা একটা অন্যরকম আনন্দে ভরে গেলো, আমার বাবার নিজের ছেলেদের নিয়ে ইচ্ছা ছিলো অনেক, কিন্তু সেই সময় সামর্থ্য না থাকলেও শুধু ইচ্ছার জোরেই যতটা পেরেছেন আমাদের চারপাশটাকে সাজিয়ে দিয়েছেন, ওই লোকটার জন্যই আজকে এইদিনটা কে ছুঁয়ে আসতে পারলাম, কিন্তু বেটুর চারপাশে প্রাচুর্যের অভাব নেই, সব কিছু হাতের নাগালেই, আর সেই জন্যই বেটুর বাবার কাজটা আরো কঠিন।

ছবি: লেখক