আমি ইতালী থেকে লিখছি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডঃ মাতলুবা খান
প্রভাষক, কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়

ইতালীর ঔপন্যাসিক ফ্রান্সেশকা মেলান্দ্রি, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে রোমে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে  গৃহবন্দীপ্রিয় ইউরোপবাসীর জন্য ‘তাদের ভবিষ্যৎথেকে`শিরোনামে তিনি সম্প্রতি একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি পৃথিবীতে কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য চিঠিটি অনুবাদ করেছেন ড: মাতলুবা খান মিশু।প্রাণের বাংলা প্রচ্ছদেরএবারের আয়োজনে রইলো  সেই চিঠি।

ফ্রান্সেশকা মেলান্দ্রি,

এ চিঠি পৃথিবীর সংকাটকাল অতিক্রমের এক আশ্চর্য ছবি হয়ে উঠেছে। কথা বলেছে মৃত্যুর গভীর ছায়ার নিচে বসে পৃথিবীতে এখনো নিরাপদ অথচ আশংকায় টালমাটাল মানুষদের সঙ্গে। এই চিঠি বলতে চেয়েছে সামনের সময়ে কেমন অবয়ব ধারণ করবে আমাদের প্রিয় পৃথিবী। 

আমি ইতালী থেকে লিখছি মানে তোমাদের ভবিষ্যৎ থেকে লিখছি এই চিঠি। আমরা এখন সেই বর্তমানে যেখানে কিছুদিনের মধ্যেই তোমরা পদার্পন করবে। মহামারীর এই ভয়াল আবর্তে আমরা সবাই চক্রাকারে ঘুরছি।

সময়ের পথ-পরিক্রমায় আমরা তোমাদের থেকে শুধু কয়েক ধাপ এগিয়ে, যেমনটা উহান ছিলো আমাদের সামনে। আমরা যেমনটা করেছিলাম ঠিক একই আচরণ এখন তোমরা করছো। যারা এখনো বলছে ‘এটা শুধুই সর্দি-কাশি, এতো তর্কের কী আছে?’ আর যারা এর মধ্যেই বুঝতে পেরেছে – এই দুই দলে ভাগ হয়ে একই তর্ক আমরাও করেছিএইতো ক’দিন আগেই।

এই যে এখন আমরা  ইতালী থেকে – তোমাদের ভবিষ্যৎ থেকে- তোমাদের দেখছি, আমরা জানি  যখন তোমাদের গৃহান্তরীণ হতে বলা হয়েছিলো,অনেকেই তোমরা জর্জ অরওয়েলকে উদ্ধৃত করেছ, কেউ কেউ হবসকেও।কিন্তু খুব শীগগির তোমরা তাও করতে পারবে না।

প্রথম প্রথম, তোমাদের খাওয়া দাওয়া বেড়ে যাবে । এজন্য নয় যে, খাওয়াটা অন্তিম সময়ের মহার্ঘ্য জিনিসের একটা যা তোমরা করতে পারো।

অবসর সময়টাকে কিভাবে ফলপ্রসু করা যায়, তার জন্য বহু টিউটোরিয়াল খুঁজে বের করবে সামাজিক যোগাযোগের গ্রুপগুলোতে। তার সবগুলোতে নাম লেখাবে,

আর তারকিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করবে।

বইয়ের তাক থেকে মহাপ্রলয়ের বই বের করবে, কিন্তু পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে অচিরেই।তারপর আবার খাওয়াদাওয়ায় মনোযোগী হবে। ঘুম হবে না ভালো। নিজেদের প্রশ্ন করবে, গণতন্ত্র কোন চুলোয় যাচ্ছে?

অন্তর্জালে এক বিরামহীন সামাজিক জীবন শুরু হবে তোমাদের – মেসেঞ্জার, ওয়াটস্যাপ, স্কাইপ, জুম…

প্রাপ্তবয়স্ক  সন্তানের জন্য তোমাদের এমন কষ্ট হবে যেমনটা আর কখনো হয় নি; তাদের আর কখনো দেখতে পাবে কি না এই শংকা ঢেউ হয়ে বুকে আছড়ে পড়বে।

অতীতের আফসোস আর মন কষাকষিগুলো তখন মামুলি মনে হবে। জীবনে যাদের মুখ আর দ্বিতীয়বার দেখবে না বলে ভেবেছিলে তাদের ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, ‘কেমন আছ?’ অনেক নারী গৃহনির্যাতনের শিকার হবে।

তোমরা ভাবতে শুরু করবে, যাদের ঘর নেই তারা কেমন করে ঘরে থাকবে? খাঁ খাঁ

করা রাস্তা দিয়ে দোকানে যেতে তোমার ভয় করবে, বিশেষ করে যদি মেয়ে হও। নিজেদের জিজ্ঞেস করবে, এভাবেই কি সভ্যতা ধবংস হয়? এমন তড়িৎবেগে?

তারপর এইসব ভাবনাগুলোকে জোরে সরিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে আবার খাওয়াদাওয়ায় স্বস্তি খুঁজে নেবে।

তোমাদের ওজন বাড়বে। অন্তর্জালে ফিটনেস ট্রেনিং এর ক্লাশ খুঁজে বেড়াবে।

তোমরা হাসবে। মাতালের মতো হাসতেই থাকবে। সবকিছুতে এমন রস খুঁজে পাবে যা আগে কখনো ভাবতেই পারতে না। সবকিছুই অত্যধিক সিরিয়াসভাবে নেয়া লোকেরও মনে হতে থাকবে এই জীবন, এই মহাবিশ্বের সমস্তকিছু অসাড়, অর্থহীন।

কাঁচাবাজারের লম্বা লাইনে তোমরা বন্ধু আর প্রিয়জনদের শুধুমাত্র একটু চোখের দেখা দেখার জন্য আলাদা করে সময় নির্ধারণ করবে, সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে।

কী কী জিনিসের তোমাদের দরকার নেই তা একসময় বসে গুনবে।

আশেপাশের মানুষের সত্যিকারের চেহারা বড় স্পষ্টভাবে বের হয়ে পড়বে। যা আগে থেকেই ধারণা করেছিলে তা নিশ্চিত হবে, আশ্চর্যও কম হবে না।

খবরে রোজ দেখা বিদগ্ধজনেরা অদৃশ্য হতে থাকবেন, তাদের মতামতকে হঠাৎ করেই অবান্তর মনে হবে, কেউ কেউ এমন সব অমানবিক যুক্তি-তর্ক সাজাবেন যে লোকে তাদের কথায় আর কান দেবে না। যাদেরকে অবজ্ঞা করেছ তারাই দেখা দেবে দয়ালু, নির্ভরযোগ্য, বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন আর চক্ষুষ্মান হয়ে।

এই বিপুল জগাখিচুড়িকে নতুন বিশ্ব গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখার নিমন্ত্রণ হয় তো সবকিছুকে এক বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রেরণা যোগাবে। একইসঙ্গে এইসবই তোমাকে চরমভাবে বিরক্তও করবে। কার্বন ডাই অক্সাইড কমে গিয়ে ধরিত্রী আরাম করেশ্বাস নিচ্ছে, সেখুব ভালো কথা, কিন্তু সামনের মাসের বিল পরিশোধ হবে কেমন করে!

তুমি বুঝতে পারবে না এই বিপর্যয়কাল শেষে নতুন পৃথিবীর জন্ম কি সুবিপুল আড়ম্বরপূর্ণ? নাকি এক শোচনীয় বিষয়?

তুমি তোমার জানালা থেকে বা সামনের লন থেকে গান বাজাবে। আমরা যখন আমাদের বারান্দা থেকে অপেরা গাইছিলাম, তোমরা ভাবছিলে, “ওহ, হুজুগে ইতালীয়গুলো!” আমরা জানি, তোমরাও এক অপরকে চাঙ্গা করার জন্য গান গাইবে। আর তারপর যখন তোমাদের জানালা থেকে ‘আই উইল সারভাইভ’ গাইবে, আমরা দেখবো আর মাথা নাড়বো যেমনটা করেছিলো উহানবাসী, যারা ফেব্রুয়ারীতে তাদের জানলা থেকে এই গান গেয়েছিলো, মাথা নাড়িয়ে, আমাদের দিকে চোখ রেখে।

অবরুদ্ধ সময়ের শেষে প্রথম কাজ হবে তালাকের দরখাস্ত  করা, এই পণ করে তোমাদের অনেকে রাতে ঘুমুতে যাবে।অনেকে সন্তানসম্ভবা হবে।

তোমাদের সন্তানদের স্কুলের পড়াশোনা হবে অন্তর্জালে। তারা তোমার জীবন বিষময় করে দেবে, আবার তারাই আনন্দের উপলক্ষ এনে দেবে।

বুড়োরা হতচ্ছাড়া কিশোরদের মতো কোন কথাই মানতে চাইবে না। বাইরে বেরিয়ে, ভাইরাসের জ্বর বাঁধিয়ে যেন মরে না যায় তার জন্য তোমাদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হবে।

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে একাকী যারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে, তাদের ভাবনা থেকে তোমরা নিজেদের মনকে সরিয়ে রাখতে চাইবে।

সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের পায়ে চলা পথকে তুমি গোলাপের পাঁপড়িতে ভরিয়ে দিতে চাইবে।

তোমাদের বলা হবে, সমস্ত সমাজ এক যুথবদ্ধ প্রচেষ্টায় একীভূত, তোমরা সবাই একই নৌকোর যাত্রী। এটা সত্যি। বিপুলা এক পৃথিবীর ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে তুমি নিজেকে যেভাবে দেখতে, এই অভিজ্ঞতা সেই দেখার চোখকে চিরতরে বদলে দেবে।

সমাজের কোন শ্রেণিতে তোমার অবস্থান তা অনেক কিছুই নির্ধারণ করবে। সুন্দর বাগানঘেরা বাড়ীতে বন্দী থাকা আর জনাকীর্ণ আবাসনে আটকে পড়া এক জিনিস নয়। ঘরে থেকে কাজ করার সুযোগ পাওয়া আর তার অভাবে চাকরি চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও এক নয়। সেই নৌকো যাতে সগর্বে এই মহামারীর মোকাবেলা করবে বলে সওয়ার হলে, তা সবার কাছে এক রকম দেখাবে না, এক রকম তা নয়ও, কখনো ছিলো না।

তারপর এক সময় তুমি বুঝতে পারবে এই যাত্রা কঠিন। তুমি ভয় পাবে। তুমি প্রিয়জনের সঙ্গে তোমার ভয়ের কথা বলবে, অথবা বলবে না। এই ভয়ের ভারে তারাও ন্যুব্জ হোক, চাও না বলে।

তুমি আবারও আহারেই শান্তি খুঁজে নেবে।

আমরা এখন ইতালীতে এবং এই হলো তোমাদের ভবিষ্যৎ চিত্র। এটা খুব ছোট মাপের ভবিষ্যৎবাণী। আমরা খুব ছোট চোখে দেখি কি না!

যদি আমরা দূর ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, যে ভবিষ্যৎ আমাদের উভয়ের কাছে অজানা, আমরা তোমাদেরকে শুধু এটুকু বলতে পারি, এই সবকিছুর শেষটা যখন আসবে-

এই পৃথিবীটা একই রকম থাকবে না।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]