আমি এক যাযাবর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

গান রেয়াজ রেকর্ডিং মঞ্চানুষ্ঠান পুরস্কার পাওয়া সন্তান বড় করা রান্নাঘর সামলানো নিয়েই ভয়াবহ ব্যাস্ত জীবন কাটছিলো আমার, আমাদের। এর মধ্যে সমান তালে বিদেশ ট্যুর। সবচেয়ে বেশি যাওয়া হচ্ছিলো আমেরিকায়। এক এপ্রিল আরেক সেপ্টেম্বর নিয়ম করে দু’বার যেতাম। এপ্রিল এ পহেলা বৈশাখ আর সেপ্টেম্বরে সমস্ত বাংলাদেশীদের মিলনমেলা হতো ওপাড় বাংলার কোলকাতা থেকে ও অতিথি আসতেন। সেই নব্বই দশক এর মাঝামাঝি থেকেই এই “ফোবানা সম্মেলন” এ আমি অপরিহার্য শিল্পী ছিলাম এবং এখনও পর্যন্ত। ফোবানা একবার এক স্টেটে আয়োজিত হলে সম্মেলন শেষে তখনই ঠিক হয় পরের বার কোন স্টেটে তার দায়িত্ব পাবে।দেখা গেলো পরের বার ও আমি সেখানে আছি।

ফোবানায় সারা আমেরিকা কানাডা থেকে সম্মানিত বাংলাদেশীরা আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আসেন। নতুন প্রজন্ম দেশীয় সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে নৃত্যনাট্য, নাটক গান ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করে।একটা বিশাল হোটেল বুক করা হয়।সেই হোটেলের বলরুমে অনুষ্ঠান হয় আর হোটেলেই সবাই অবস্থান নেয়।বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট থাকায় সবাই একসময় নাস্তা করে। কুশলাদি বিনিময়ের একটা সুযোগ হয়।সত্যিকারের মিলনমেলা যাকে বলে আর কি।যাইহোক, সেবার লস এঞ্জেলস এ ফোবানা সহ আরও দু’য়েকটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার পরে ডাক এলো ডালাস থেকে। ডালাসের অনেক পুরাতন সাংস্কৃতিক সংগঠন ” অবাক” এর জন্মদাতা শ্রদ্ধেয় রাশেদ হুসাইন আমার হাজব্যান্ড এর খালাতো বোনের বর। দুলাভাই আপা অনুষ্ঠানের জন্য চুক্তিবদ্ধ করে আমাদের প্লেনের টিকিট পাঠালেন। এর এক সপ্তাহ আগে আমরা অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলাম নেভাডার রিনো শহরে। ডমেস্টিক ফ্লাইট খুব নীচ দিয়ে যাচ্ছিলো।

ভয়ংকর সুন্দর পাহাড় দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিলো ওগুলো যেন চকবার আইসক্রিম! আবহাওয়া খারাপ থাকায় ফ্লাইট খুব খারাপ ভাবে এদিক ওদিক কাত হচ্ছিলো। সবার বমি পাচ্ছিলো। যাইহোক শেষমেশ ল্যান্ড করার সময় এমন প্রচন্ড ভাবে ঝাঁকি খেলো, ছোট প্লেনের মাথায় আমার অনুষ্ঠানের আয়োজক মুমিনুল হক বাচ্চু ভাই মাথায় বাড়ি খেলো! কি একটা অবস্থা! ফ্লাইট এর দরোজায় পাইলট কো পাইলট দাঁড়ানো। আমার হাজব্যান্ড জিজ্ঞেস করলেন ল্যান্ডিং এমন হলো কেন? পাইলট তাচ্ছিল্য ভরে কি একটা উত্তর দিলেন যার অর্থ এমন দাঁড়ায় যে কি আছে জীবনের, জীবন জাস্ট ফর ফান।বাস! আর যাবা কই! আমার সাহেব আর ডমেস্টিক ফ্লাইটেই চড়বেন না! তো দুলাভাই আপা আমার যে টিকিট পাঠালেন তা তারিখ বদল যোগ্য কিন্তু ফেরত যোগ্য না।দুলাভাই আপা যতই বুঝান যে পৃথিবীর সব চাইতে নিরাপদ বাহন প্লেন, কে শোনে কার কথা। এদিকে অনুষ্ঠানের ফ্লায়ার ছাড়া হয়ে গেছে। দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে,অবশ্যই আমরা যাবো কিন্তু বাই রোডে।

লস এঞ্জেলেস থেকে ডালাস! যেই শোনে সেই হা হা করে ওঠে।কি করে এতো লম্বা জার্নি করবো! উনি ওনার জায়গায় অনঢ়। কোন এক দুপুরে রওনা দিলাম গ্রে হাউন্ডে।চলছি চলছি চলছি।চোখের সামনে দৃশপট বদলে যাচ্ছে।ফিনিক্স ফনিক্স অ্যালবেন অ্যালপ্যাসো কি কি সব জায়গা পার হচ্ছিলাম। উনার সঙ্গে কপট রাগ হলেও মনে মনে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম।ফ্লাইট এ গেলে তো এভাবে অলিগলি পাড়া জেলা সব ঘোরা হতো না! চোখের সামনে ওয়েস্টার্ন ছবির জীবন যাত্রা দেখছিলাম। আমরা যাদের আদিবাসী বলি তেমন সব মানুষ। ঘোড়া, উইন্ডমিল,পাতকুয়া, ভাঙ্গাচোরা ওয়াগন, দারিদ্র্য, মাথায় হ্যাট, ফ্রিল দেয়া গাউন, চুরুট আরও কতো কি!আমেরিকার আদিবাসীদের আমিশ বলে। তাদের মতো মানুষরা চোখের সামনে সিনেমার নায়ক নায়িকার মতো ঘোরাঘুরি করছে। ধু ধু মরুভূমির মাঝে বিশাল বিশাল ক্যাকটাস আর কিছু কাঁটা ওয়ালা ঝাড়! আমি চোখ বন্ধই করিনা।

একদিন দুপুর থেকে পরের দিন রাত বারোটা লাগলো আমাদের পৌঁছাতে, অথচ আমি কিনা ঘুমালামই না।কোন এক সময় চোখ লেগে এসেছিলো, বাস থামাতে ছন্দপতন হতেই চোখ মেলে আমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো।দেখি তিন তলা সমান একটা ক্যাকটাস একলা দাঁড়িয়ে, তার আগায় সাদা বিশাল ফুল! আমি চিৎকার দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলাম। কি অপূর্ব কি অপূর্ব! সেখানে নামলাম। সার্ভিস সেন্টার, কিন্তু ওই ফুলের কাছে যেতে হলে অনেক পথ ঘুরতে হবে। তাতো সম্ভব না।মাত্র বিশ মিনিটের যাত্রাবিরতি। যাইহোক, চোখে দেখলাম তো! মানসপটে তা জমা করে রেখেই সন্তুষ্ট হলাম আর আল্লাহ কে বললাম আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখক

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box