আমি এখনও নি:শ্বাস নিতে পারছি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

যতটা বলা, তারচেয়েও না বলা কথা অনেক বেশী ওই একটি বাক্যে। টেলিভিশনে দেখছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে দাঙ্গার চিত্র – জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু উত্তরকালে।।দেশটির বিভিন্ন শহরে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে সহিস দাঙ্গা। তেমনি একটি মিছিলে একটি কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরীর মুখাবরনীর ওপরে লেখা ক’টি – ‘আমরা এখনও নি:শ্বাস নিতে পারছি’। সারাদিন ধরে কথাটি আমার করোটি আর হৃদয়ে ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে’ কথা কইতে থাকলো।

প্রথম ছবিটি ১৯৯২ সালে রডনি কিংয়ের অত্যাচারের সমযে এবং দ্বিতিয় ছবিটি ১৯৬৩ সালে অ্যালাবামায় কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের সময়

মনে হলো, এ ছোট্ট বাক্যটির সত্যতা অত্যন্ত সুগভীর এবং বিরাট এক বাস্তবতার এটি একটি সুতীব্র ঘোষণা। এই কিশোরী এখনও হয়তো নি:শ্বাস নিতে পারছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বিভাজিত দেশে, একটি বর্ণবাদী সমাজে, এবং শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী একটি ক্রমপ্রসরমান জনগোষ্ঠীর প্রেক্ষিতে এমন সময় ও ঘটনাপ্রবাহের শিকার কি এ মেয়েটি হতে পারে না, যেখানে সেও হত্যার মুখেমুখি হয়ে জর্জ ফ্লয়েডের মতো বলবে, ‘আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না’?

‘আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না’ – এই কথাটি যে কতবার উচ্চারিত হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অবদমনে শেতাঙ্গ পুলিশী বর্বরতার মুহূর্তে। আজ থেকে মাত্র ছ’বছর আগে ২০১৪ সালে যখন নিউইয়র্কের পুলিশ এরিক গার্নার নামক কৃষ্ণাঙ্গ তরুনের টুঁটি চেপে ধরে তাঁকে হত্যা করেছিলো, তখনও সে বলেছিলো, ‘আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না’। ১৯৯২ সালে লজ এ্যঞ্জেলসে পুলিশী বর্বরতার শিকার রডনি কিং একই কথা বলেছিলেন। ১৯৬৩ সালে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারের স্বপক্ষের শান্তি মিছিলে আক্রমনের সময়েও আক্রান্তেরা একই ভাবে তাঁদের আর্তি প্রকাশ করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অবদমনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্হতি এতোদিনেও তেমন কিছু একটা বদলায় নি। ‘আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না’ – এ কথাটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর জীবন-বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের অবদমন আর অত্যাচারের কারনে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর স্বাধীন নি:শ্বাসের জায়গাটি ক্রমাণ্বয়ে সাীমিত হয়ে আসছিলো, সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন বাহিনীর চরম নিপীড়নে তা আজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আট বছর একজন কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপ্রধান দেশ শাসন করলেও অবস্হার তেমন কোন তারতম্য ঘটে নি।

দিনের পর দিন দারিদ্র্য, বঞ্চনা, বৈষম্য ও অসমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাধারন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবন আজ প্রান্তিকতার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আর্থ-সামাজিক দিক থেকে বিচার করা যাক। শেতাঙ্গদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার যেখানে ৮ শতাংশ, কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে তা ২০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে শেতাঙ্গদের গড়পড়তা আয় যেখানে ৬৯ হাজার ডলার, কৃষ্ণাঙ্গদের তা ৪০ হাজার ডলার। একজন শেতাঙ্গ ব্যক্তি যেখানে ৭৯ বছর বাঁচার প্রত্যাশা করতে পারেন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু সেখানে ৭৪ বছর। আজকের করেনা সঙ্কটকালেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সংক্রমিত মানুষের ২৫ শতাংশ একজন কৃষ্ণাঙ্গ, যদিও জনসংখ্যায় তাঁদের অনুপাত মাত্র ১২ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অবদমনের ক্ষেত্রে আরো পাঁচটি কথা উল্লেখ্য। এক, ঐতিহাসিক ভাবেই দেখা গেছে যে, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবদমনে আইনরক্ষাকারী বাহিনীর যে সব সদস্য মূল হোতা বা মূল নায়ক, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন শাস্তির ব্যবস্হা গ্রহন করা হয় না। নামমাত্র কোন শাস্তি পেয়ে তারা পার পেয়ে যায়। বর্তমান ঘটনায় ও তার ব্যতয় ঘটবে বলে আশা করা যায় নি।

দুই, সব ঘটনায়ই দেখা গেছে যে যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা অত্যাচারের আসল হোতা হিসেবে কাজ করেন, তখন অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা মূল হোতার সহযোগী হিসেবে কাজ করে। অথচ, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের আইনের আওতায় আনা হয় না।

প্রথম ছবিটি জর্জ ফ্লয়েডের ও দ্বিতীয় ছবিটি ২০১৪ সালে এরিক গার্নারের শ্বাসরুদ্ধকরণের

তিন, কৃষ্ণাঙ্গ অবদমনের মূল শিকার হন সাধারন দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী। সে ক্ষেত্রে বিত্তবান ও ক্ষমতাবান কৃষ্ণাঙ্গেরা অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে মুখের কথা ভিন্ন কার্যকর ব্যবস্হা এগিয়ে আসেন না। তাঁর আট বছর শাসনামলে প্রেসিডেন্ট ওবামা অতি সতর্কতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছেন তাঁর কৃষ্ণাঙ্গরাও  সযত্নে সুপ্ত রাখতে, যাতে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে চিহ্নিত না হন এবং কৃষ্ণাঙ্গদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিহিত না হন। ফলে না কৃষ্ণাঙ্গদের কোন উপকার হয়েছে, না যুক্তরাষ্ট্রের চিরায়ত বর্ণ ও জাতিভেদ প্রশ্নের কোন মীমাংসা হয়েছে। তার বদলে নিজের কৃষ্ণাঙ্গত্বকে পরিস্কারভাবে স্বীকার করে তিনি যদি এই প্রশ্নগুলোকে সরাসরিভাবে মোকাবেলা করতেন, তা’তে পরিপূর্ণ সফল না হলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইতিহাসে স্মরিত হতেন। এখনও জর্জ ফ্লয়েড মৃত্যুর পরে তাঁর মুখে কিছু শোনা যায় নি।

চার, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন বর্ণবাদী এবং কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। সত্যিকার অর্থে, প্রশাসনের কথা-বার্তায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের সুর প্রায়ই প্রচ্ছন্নভাবে উঠে আসে। সে অবস্হায় এটা ভাবা বাতুলতা যে বর্তমান সঙ্কটকে একটি সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ ও জাতিভেদের মূল সমস্যার মীমাংসার দন্যে আন্তরিক কোন প্রতেষ্টা নেয়া হবে। কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করা হবে অনেক, দোষারেপ করা হবে আরো, কথা বলা হবে অফুরন্ত; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না।

পাঁচ, বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই বলছেন, সংহিসতা গ্রহনযোগ্য নয় এবং সহিংসতা কোন সমস্যার সমাধান হতে পারে না। দু’টোই সত্যি। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সাধারন মানুষ শান্তিপ্রিয় এবং প্রথমেই তাঁরা সহিংসতার পথ বেছে নেয় না। মানুষ অবদমন ও অত্যাচার যখন দিনের পর দিন চলতে থাকে, যখন তাঁরা ক্রমাগতভাবে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, ও বৈষমযের শিকার হন, যখন সব পণ্হা অবলম্বন করেও ন্যায্য বিচার তাঁরা পায় না এবং যখন তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনই তাঁরা সহিংস হয়ে ওঠে। এ কথাটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

শেষের কথা বলি। এ জাতীয় ঘটনায় আমাদের মতো বাদামী গাত্র বর্ণীয় মানুষেরা নিশ্চুপ থাকি, নির্লিপ্ত থাকি, গা বাঁচিয়ে চলি। নিজেকেই বলি,’ আজ রাতে তারা ওদের জন্যে আসলে, কাল প্রভাতে ওরা আমার জন্যে আসবে’। যুক্তরাষ্ট্রের অকৃষ্ণাঙ্গ বিত্তবান, ক্ষমতাবান ও শাসককুলকে বলি, ‘দিনে দিনে বাড়িয়ছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’।‘আজ না হয় কাল, কাল না হয় পরশু’। অস্বীকার তারা করতে পারবে না, ‘এ দায়ভাগে তারা সমান অংশীদার’?

ছবি: প্রথম ছবিটি জর্জ ফ্লয়েডের ও দ্বিতীয় ছবিটি ২০১৪ সালে এরিক গার্নারের শ্বাসরুদ্ধকরণের; তৃতীয় ছবিটি ১৯৯২ সালে রডনি কিংয়ের অত্যাচারের সমযে; এবং চতুর্থ ছবিটি ১৯৬৩ সালে অ্যালাবামায় কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের সময়।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]