আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

টিউশন প্রফেশন ভালো না লাগলেও শিক্ষক হিসেবে নাম করে ফেললাম। দূর দূরান্ত থেকে অনেক ছাত্রী পেতে থাকলাম।আলাদা রুম না থাকায় বা ড্রইংরুম অতিরিক্ত খোলামেলা হওয়ায় বেডরুমেই বিছানায় বসে গান শেখাতে লাগলাম। একজন একজন করে প্রায় সারাদিনই গান শিখাই,নিজের ও প্র‍্যাকটিস হতে লাগলো। গানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বেড়ে গেলো।খুবই অবাক যে ফারিয়া, আমার দু’বছরের কন্যা আমার সব সারগম মুখস্থ গাইতে লাগলো। আমি খুশি না হয়ে প্রমোদ গুনি। যাইহোক সে অন্য কথা।
হঠাৎ একদিন ডন কোম্পানি থেকে হারানো দিনের গান রেকর্ড করার ডাক এলো। একসঙ্গে দুটি অডিও ক্যাসেট। বারো বারো চব্বিশটি গান।
ফেরদৌসী আপার গান,সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এর গান লতা মুঙ্গেশকরের গান দিয়ে সাজানো সেই অ্যালবামের লিস্ট।বেশির ভাগ গানই আমার জানা।বাবার কাছে শেখা,হয়তো ক্যাসেটে এবং নানাবাড়িতে শুনেছি। ডন কোম্পানি যা প্রস্তাব দিলো, আমার স্বামী তা ঠিকঠাক বুঝে নিলেন। আমার এসব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই।বস্তুত ক্যাসেট নিয়েই আমার কোন মাথা ব্যথা নেই।আমার পয়লা ক্যাসেট বেরিয়েছিল ৮৫ সালে কনকর্ড কোম্পানি থেকে। অনেক সুন্দর সুরের গান ছিলো সেখানে। মইনুল ইসলাম খান সাহেবের সুরে আহমেদ ইউসুফ সাবের, নজরুল ইসলাম বাবু ভাইয়ের লেখা গান ছিলো। এর পর এস এস প্রোডাকশন থেকে গজল টাইপ একটা ক্যাসেট বের হলো, তাও মইনুল ইসলাম সাহেবের, এর পর মধুমিতা মিউজিক কোম্পানি থেকে আরেকটি ক্যাসেট, সবকটিতেই সুন্দর গান ছিলো। কিন্তু কোনটাই বাজার ধরতে পারেনি। গান হিট হতে অনেক সুন্দর ক্যাসেট কভার দরকার হয় মেয়ে শিল্পীদের।আর আমি স্টুডিও তে গিয়ে ছবির পোজই দিতে পারিনা।আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমাকে দিয়ে ক্যাসেট ট্যাসেট কিছুই হবেনা। তাই ডনের চুক্তি টুক্তি আমার মনে কোন দাগই কাটতে পারেনি। আমি জাস্ট মইনুল ইসলাম খান সাহেবের কথায় কাজ করতে রাজি হয়ে গেলাম।
ডনের মালিক বাবুল সাহেব চুক্তি করলেন। একসঙ্গে দুইটি ক্যাসেট বিশ হাজার টাকা। কাজের আগেই পুরো টাকা অ্যাডভান্স করে গেলেন এবং গানের লিস্ট সহ গান একটা ক্যাসেটে পাঠিয়ে দিলেন। সব গানই আমার জানা।আমি একটা খাতায় নতুন করে পর পর লিখে ক্যাসেট থেকে গান তুলে পারফেকশন আনার জন্য নজর বুলিয়ে নিলাম।কাকরাইল এ ছিল ডন স্টুডিও। আমি অফিসের কাজের মত করে এক এক দিনে ছয়টা করে গান গেয়ে চারদিনেই দুইটা ক্যাসেটের গান শেষ করলাম। এবার কভার ফটো তোলার পালা। এই স্টুডিওতে গিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তোলা কি যে কষ্টের কাজ! বাবুল ভাই আমার ছবির জন্য মেকআপ ম্যান, শাড়ি, কতকিছু রেডি করলেন। তাঁর এসব চেষ্টা বিফলে গেলো।আমি একলা একলা সেজেই নিজের শাড়ি গয়নাতেই ছবি তুললাম। যাইহোক গান ডাবিং করতেন রেকর্ডিস্ট রাজা ভাই আর সুরকার সংগীত পরিচালক জনাব মইনুল ইসলাম খান। গানগুলো ভালোই হলো। ক্যাসেট নাকি সুপার হিট হয়ে গেলো। আবারও বলি, তাতে আমার মনে আসলে তেমন কোন ছাপ পড়েনি।আমার কাজ করা দরকার ছিলো করেছি। কিংবদন্তি শিল্পীদের গানের যাতে এতোটুকুও ছিঁড়ে না যায়, নষ্ট না হয় এই খেয়াল আমার পুরোপুরি ছিলো। সেটুকু করতে পেরেছি ভেবে কিছু তৃপ্তি হয়তো পেয়েছিলাম আর একটা ভাবনায় আমি খুশি হয়েছিলাম যে আমি যে হৈমন্তী দিদিকে গিলে খেয়ে কপিক্যাট হয়ে বসেছিলাম সেখান থেকে কিছুটা বের হতে পেরেছিলাম। কারণ হৈমন্তী শুক্লার কন্ঠে তো ফেরদৌসী রহমান হয় না। হৈমন্তী দিদি হলেন রুদ্রাক্ষমালা আর ফেরদৌসী আপা যমুনা নদী। এঁদের ছায়াতলে থেকে নিজেকে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলা ভয়ংকর কঠিন কাজ।আমি সেটারই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম।যদিও তাঁদের গান কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তাঁদের অনুসরণ করতে, অনুকরণ নয়।কারণ সংসার চালানোও যেমন কঠিন ছিলো তার চেয়েও কঠিন ছিলো কনকচাঁপা হয়ে ওঠা!

ছবি: লেখক