আমি ছোটবেলায় বার বার রেপড হয়েছি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

আমার হাসপাতালে কাজের চাপ বেশ। সপ্তাহে তিনদিন অপারেশন থাকে। বাকি দু’দিন ক্লিনিক নয়তো ওয়ার্ড রাউন্ড। একটা বুধবারের কথা, আমি সার্জারির ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি। বেশ তাড়ায় ছিলাম সেদিন, রাউন্ড শেষ করেই আবার থিয়েটারে দৌড়তে হবে। একটা কাগজে রুগীদের নামের লিস্ট থাকে। তার দিকে চোখ বোলাতে বোলাতে একটা জায়গায় এসে ভ্রুঁ কুঁচকে গেল আমার।

” এলিসন উডওয়ার্ড এখনও বাড়ি যায়নি? কেন?”
আমরা এলিসনের অপারেশন করেছিলাম সোমবার দিন। মঙ্গলবারই ওর ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা। রুগী হিসাবের বেশিদিন হাসপাতালে থাকলে তা সার্জেনের চিন্তার কারণ হয়।

অপারেশনের পরে কোন কমপ্লিকেশন হলো না তো?
এলিসনের সমস্যা ছিলো ওর অতিরিক্ত স্থূলতায়। তাই ওর শরীরে বাসা বেঁধে ছিলো ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, আর্থারাইটিসের সমস্যা। অপারেশনটা করার কারণ ছিলো এলিসনের এই রোগগুলোর ভার কমানো। সেই অপারেশন জটিল হলেও একদিন পরেই রুগী বাড়ি চলে যায়। কিন্তু এলিসন যায় নি।

আমার সঙ্গে থাকা জুনিয়র ডাক্তারটি বললো,
“দাঁড়াও, নার্সকে জিজ্ঞাসা করে দেখি।”

নার্স বললো,” এলিসনের কন্সটিপেশনের সমস্যা হচ্ছে। অপারেশনের পর থেকে বাওয়েল মুভ করেনি।”

আমি একটা আশ্বস্ত হলাম শুনে, মনে মনে নিজের পিঠটাও চাপড়ে নিলাম। যাক অপারেশনটা তাহলে ভালই করেছি।
“ওহ, তেমন কিছু নয় তাহলে? খাওয়াদাওয়া করছে ও?”

“হ্যাঁ সে সব ঠিক ঠাক করছে, কিন্তু ওর পায়খানা না হলে ওকে তো বাড়ি পাঠানো যাবে না।”

“হুম, তাহলে একটা এনেমা দিয়ে দিলেই তো মিটে গেলো, দিয়ে দিন, বিকেলে বাড়ি চলে যাবে ও।”

নার্সকে এটা বলে আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম ওয়ার্ডের অন্য ঘরের দিকে। সেই নার্সের ডাকেই আবার পিছনে ফিরতে হলো।

“একটা প্রবলেম হয়েছে ডক্টর ঘোষ।”
” কী হলো?”
” এলিসন এনেমা নিতে চাইছে না। রিফিউজ করছে।”

কনস্টিপেশন হলে মলদ্বারে একটা নল ঢুকিয়ে কুড়ি মিলিলিটার মতো তরল পদার্থ দেওয়া হয়, এতে আটকে থাকা শক্ত মল বাইরে বেরিয়ে আসে। একে বলে এনেমা। কেউ কেউ এনেমা নিতে পারে না, তাদের জন্য আছে সাপোসিটরি। এটা ছোট্ট মোমবাতির টুকরোর মতো। কাজ এরও একই।

“ওকে, তাহলে একটা গ্লিসারিন সাপোসিটরি দিন ওকে।”
নার্স এবারে মুখ দিয়ে চুক করে একটা শব্দ করে বললেন,
“না, সেটাও নিতে চাইছে না ও।”

এবারে আমি বেশ বিরক্ত বোধ করলাম, এই টুকু একটা ছোট ব্যাপারের জন্য রুগী হাসপাতালের একটা বিছানা দখল করে রাখবে এটা মানা যায় না। একটা ছোট্ট ওষুধ নিতে ওর অসুবিধাটা কোথায়? আমি ভাবলাম এই মহিলা বেশ ফুলের ঘায়ে মূর্চ্ছা যায় প্রকৃতির। যতক্ষণ না একে জোর করছি ততক্ষণ কাজটা করানো যাবে না।
এলিসনকে আমাকে দেখতে যেতেই হলো। একটু পরেই বাকি রুগীদের দেখে থিয়েটারে দৌড়তে হবে, তাই খুব বেশি সময় ওর জন্য বরাদ্দ নয়।

এলিসনের বিছানার কাছে গিয়ে মুখে হাসি টেনে এনে বললাম,”গুডমর্নিং এলিসন, কেমন আছেন?”
আমার এই কথা বলার ভঙ্গীতে হৃদ্যতার সঙ্গে মিশে থাকা প্রচ্ছন্ন বিরক্তিটা আমার কাছে বেশ প্রকট ছিলো, জানি না এলিসন তার আঁচ কতটা পেয়েছিলো। এলিসনের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, গায়ের রঙ গোলাপী ফরসা, গোল মুখ, নীল চোখের মণি। একটা টপ আর পাজামা পড়ে অ্যালিসন বসে ছিলো ওর বিছানায়।

“ভাল আছি ডক্টর, অনেক ধন্যবাদ আপনাদেরকে।”

“হুঁ, বাড়ি যাবেন তো?”

“হ্যাঁ বাড়ি তো যেতেই চাই৷ কিন্তু দেখুন না পেটটা কেমন ফুলে আছে।”

“হ্যাঁ সে তো থাকবেই। অপারেশনের পরে কনস্টিপেশনটা একটা খুব কমন। হতেই পারে।”

“আমি অনেক জল খাচ্ছি ডক্টর, নার্স লাক্সাটিভও দিয়েছিল কাল। কাজ হচ্ছে না। ব্রেকফাস্ট লাঞ্চে অবশ্য কোন অবশ্য কোন অসুবিধা হচ্ছে না, আজকে ব্রেকফাস্টে চা….”

এলিসনের কথা শুনতে শুনতেই দেওয়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিলাম একবার।
সময় কম, সেটা বাকি রুগীদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে। এলিসনের জন্য বরাদ্দ কয়েক মিনিট প্রায় শেষ। এবারে সোজা কথায় আশা যাক। আমি ওকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

“আপনাকে মলদ্বারে ওষুধ নিতেই হবে। এনেমা নিতে পারলে বেস্ট। নাহলে অ্যাটলিস্ট সাপোসিটরি। দেয়ার ইজ নো আদার ওয়ে। প্লিজ এবারে আর না করবেন না। নার্সকে বলে দিচ্ছি, দিয়ে দেবে। আই হোপ ইউ উইল বি এবল টু গো হোম বাই দিস আফটারনুন। বাই।”

“সরি, ওটা আমি পারবো না ডক্টর। “

আমার বিরক্তি তখন সীমা ছাড়াতে চলেছে।
“কেন এলিসন? আপনিই প্রথম নন যে এনেমা নেবেন। ইটস আ কমন প্র‍্যাকটিস ইন দা ওয়ার্ড৷ এত ভয় পেলে চলবে নাকি? নিয়ে নিন এনেমাটা। “

“না, পারবো না আমি।”

এলিসনের না বলার মধ্যে একটা দৃঢ়তার সঙ্গে সঙ্গে অসহায়তাও ছিলো। চোখ দুটো ছলছল করছিলো ওর। এমন রূগী আমি আগে অনেক দেখেছি। তারা শরীরের মধ্যে কোন কিছুকে নিতে ভয় পায়। আমি এবারে একটু নরম হয়ে এলিসনের কাঁধে হাত রেখে বললাম,

” আমি বলছি তো, ভয়ের কিচ্ছু নেই। নিয়ে নিন এনেমাটা। ইউ উইল বি জাস্ট ফাইন।”

কাঁপা কাঁপা গলায় এলিসন বললো,
“নট পসিবল, আমি পারব না ডাক্তার।”

আমার হাত এলিসনের কাঁধের ওপর থেকে উঠে আসছিলো, তখন ও বলল,

“আমি কী আপনাকে কিছু বলতে পারি?”

“হ্যাঁ বলুন না।”

কয়েক মুহূর্তের জন্য এলিসন চোখ নামিয়ে নিলো, তারপরে আমার দিকে চেয়ে বললো,”আই অ্যাম গোইং টু টেল ইউ সামথিং অ্যান্ড টেক ইট ব্যাক। প্লিজ ডোন্ট জাজ মি। বাট ইউ নিড টু নো দিস।”
আমি আপনাকে কিছু বলেই ফিরিয়ে নেব সঙ্গে সঙ্গে।

কিন্তু ও যা আমাকে বললো তা ফিরে গেল না আর, রয়ে গেলো আমার সঙ্গে।

“ডক্টর, আমি জানি আমি খুব বিরক্ত করছি আপনাকে। একটা ছোট ওষুধ নিতে চাইছি না। আমার যে খুব ভয় করে।”

“আপনাকে তো বললামই ভয়ের কোন কারণ নেই, এই এতটুকু একটা জিনিস..”

“আমি ছোট বেলায় বার বার রেপড হয়েছি। থ্রু মাই ব্যাক। আমার স্বামীও আমাকে ছাড়েনি। বারবার জোর করেছে আমার সঙ্গে। আমার ডিভোর্স হয়েছে আজ প্রায় সাত বছর হলো। কিন্তু এখনও ওই মুহূর্তগুলোকে ভুলতে পারি না আমি। সায়কায়াট্রিস্ট দেখিয়েছি, রোজ ওষুধ খাই এর জন্য। তাতেও কিছু হয় না। মলদ্বারে কিছু ঢোকানোর কথা ভাবলেই আমার গা তাই শিউরে উঠছে, আমি পারবো না ডক্টর, আমি পারবো না।”

কাঁদতে কাঁদতে আমার হাতদুটোকে ধরে এলিসন এই কথা গুলো বলছিলো। ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা শব্দ গুলো যেন থাপ্পড়ের মতো আছড়ে পড়ছিলো আমার মুখের ওপর। আমি নাকি ওর চিকিৎসক। এলিসনের অপারেশনটা ভাল ভাবে করে দিয়ে ভাবছি ওর জীবনে বড় একটা উপকার করে দিয়েছি। অথচ মেয়েটা যে বিষাদকে বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, তার কণামাত্রও বুঝতে পারলাম না আমি। ওর এই যন্ত্রণার উপশমের উপায় তো আমার জানা নেই। স্ক্যালপেল অবধিই আমার দৌড়।

সেদিন আরো কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম এলিসনের সঙ্গে, একটা সাপোসিটরি আনিয়ে ওর হাতে দিয়ে বলেছিলাম দেখো কত ছোট এটা। এইটুকু মলদ্বারে ঢোকালে তুমি কিছুই বুঝতে পারবে না। মেয়েটা আমার কথায় ভরসা করেছিলো। সাপোসিটরিটা পরে নার্স দিয়ে দেন। বিকেলের দিকে থিয়েটার থেকে ওয়ার্ডে ফোন করে জানতে পারলাম এলিসন বাড়ি চলে গেছে।

আমি এলিসনের চিকিৎসা করলাম। কিন্তু ওকে সুস্থ করে তুলতে পারলাম কি? উলটে খারাপ ভাবে জাজ করলাম ওকে।

‘জাজ করা’-র কোন ভাল বাংলা প্রতিশব্দ পাইনি আমি কোথাও। তার মানে বাঙালিরা কি কাউকে জাজ করে না? নিশ্চয়ই করে। আমরা উঠতে বসতে আমাদের চারপাশের মানুষগুলোকে দেখছি নিজের চোখ দিয়ে। জাজ করছি তাদের ভাল খারাপ। নিজের মতো করেই ভেবে ফেলছি তাদেরকে নিয়ে।

এক একটা মানুষ এক একটা অগোছালো রুবিকের কিউব। তার পাঁচটা রঙ এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কেউ একমাত্রিকও না, সবাই বহুমাত্রিক। অথচ আমাদের কারোর সময় নেই উল্টোদিকের মানুষটাকে ভাল করে চেনার। যেটুকু দেখতে পাই সেটুকুতেই গোটা মানুষটার অবয়ব কল্পনা করে নিতে এতটুকু বাঁধে না আমাদের। কারোর হাসির লাল রঙ দেখলে বুঝতে চাই না এর পিছনে বিষাদের নীলও মিশে থাকতে পারে। কেউ ঝলমলে সবুজ, ভিতরে একাকীত্বের হলুদকে লুকিয়ে। আমরা দেখেও দেখি না। সময়ই নেই সেই দেখার মতো।

আমরা সবাই মানুষ দেখি, কিন্তু কোন দিন মানুষ বুঝি না।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]