আমি জেনে গেছি তুমি আমাকেই ভালোবাসো

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

পরপর আমি চারবার মেরিল-প্রথম আলো পাঠক জরিপ পুরস্কার পেলাম। সে এক অঅদ্ভুত নেশা ধরানো অধ্যায়। ৯৯/২০০০/২০০১/২০০২ এই চার সালের জন্য। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার যেমন উঁচু লেভেল থেকে আসে ঝরনা বা জলপ্রপাত এর মত আর এই পুরস্কার আসে ফল্গুধারার মতো তিরতির করে ভালোবাসা জমে জমে।নদীর ভেজা বালু যেমন হাত দিয়ে নেড়ে দিলে তিরতির করে পানি এসে জমে তেমন! বোঝা যায় যতটুকু পানি এসে চোখের সামনে জমলো তার চেয়ে কোটি গুণ জলধারা নদীর বুকের গহীনে প্রবহমান। আনন্দে আমার শুধু কান্না পেতো। প্রথমবার পুরস্কার পাওয়ার পর পাঠকের পাঠানো পেপার কাটিং স্লিপ থেকে লাকি ড্র করার জন্য আমরা পুরস্কারপ্রাপ্তরা দাওয়াতি হয়ে প্রথম আলোর কার্যালয়ে গেলাম।এক ঘর কুপন।কিছু কুপন খুলে খুলে দেখছিলাম। নিজের নামের ঘরে টিক চিহ্ন দেখে অদ্ভুত ভালোলাগায় বশিভূত হচ্ছিলাম। জীবনে তো এমন দেখিনি! হঠাৎ একটা স্লিপ দেখে চমকে উঠলাম! স্লীপ দাতা আমার আপন ভাগ্নে ইবনুল কাইউম সোহাগ এবং সে আমার বাসায় থাকা অবস্থায় আমাদের পেপার কেটে কুপন পোস্ট করেছে! লজ্জায় তাড়াতাড়ি অন্য কুপনের সঙ্গে তা মিলিয়ে দিলাম। পুরস্কারপ্রাপ্ত যারা ছিলেন তারা দেখলে খেপানো শুরু করবেন এই বলে যে ‘ওহ এই ব্যাপার! নিজেই নিজের ভোট!’ কিন্তু তারপর ও খুবই মজা লাগছিলো।

প্রথম বার খুব সাদামাটা অনুষ্ঠান ছিলো কিন্তু দ্বিতীয় বার খুব জমজমাট অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন প্রথম আলো। ন্যাম সম্মেলনের মুল অডিটোরিয়াম এ পুরস্কার এর আগেই নমিনেটেড সবাইকে ডেকে পাঠানো হলো। সবাইকে বলা হলো কোন এক সময়ে আপনাকে হয়তো এই প্রশ্ন করা হবে। বুকের মধ্যে দুরুদুরু শুরু হলো। আগে তো কোন আশা ছিলো না কিন্তু এই আয়োজন শুরু হয়েছে এবং আমি পেয়েছি জেনেই যেন আরও পাওয়ার ইচ্ছে জাগছিলো। পুরস্কার কে পাচ্ছে এই উত্তর এই অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কাউকে হাজার জেরা করেও উত্তর পাওয়া যেতো না। খুব একটা উত্তেজনার মুখোমুখি হয়েই এই পুরস্কার পেতে হয়েছে। অনুভব এমন ছিলো যেমন অনুভূতি ছিলো ছোট বেলায় যখন পুরস্কার ঘোষণা করতো সেই সময়টায়।এই ব্যাপারে একটা দুঃখ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আর তা হলো মেরিল-প্রথম আলো পাঠক জরিপ পুরস্কার ওর অনুষ্ঠানে একদম নাম ধরে কার্ড দেয়া হতো। অনেক অনুরোধ করেও আমি আমার বাবা-মায়ের জন্য দুটো কার্ড পাইনি।কবির বকুলকেও বলেছি যে কিনা এই অনুষ্ঠানের সরাসরি তত্বাবধানে থাকতো সে- ও অপারগতা জানিয়েছে। অমন টান টান উত্তেজনা ভরা একটা অনুষ্ঠানে আমার বাবা-মা থাকলে বিশেষ করে আব্বার যে বিশ্বজয়ের অনুভূতি হতো এ আমি হলফ করে বলতে পারি।অথচ কত সাধারণ জনগণ এ অনুষ্ঠানের টিকিট পেয়েছে তা তো নিজেই চাক্ষুষ করেছি।

তৃতীয় বার চালাকি করে বকুল কে বললাম বকুল এই অনুষ্ঠানের জন্য খুব শখ করে নতুন একটা শাড়ি কিনবো তুমি শুধু বলো আমি পুরস্কার পাচ্ছি কি না! কোন কিছুতেই কোন কাজ হয়না! তাদের টিমওয়ার্ক এতো শক্ত।চতুর্থ বার তাই কিছুই আর জিজ্ঞেস করিনি।পঞ্চম বার রিহার্সালের সময় দেখলাম নাম ঘোষণা করার সময় আমাদের ক্লিপিংস এ ‘আশা পূর্ণ হলো না আমার মনের বাসনা’ এই গান বাজানো হচ্ছে।আমি বুঝে গেলাম এবার আর পাচ্ছিনা পুরস্কার হাহাহা। সেবার আমার লালন গীতির সিডি নমিনেটেড হয়েছিলো। তারপর ও অনুষ্ঠান স্থলে গিয়েছি।কারণ সারাজীবন আমাকে পেতে হবে এমন কোন কথা নেই। সত্যিকার অর্থে ততদিনে আমি একটা অজানা ব্যাপার জেনে গেছি তা হলো ‘আমি জেনেই গেছি তোমরা আমাকেই ভালোবাসো’। এই অনুধাবণ খুবই দামী। হীরা মনি মানিকের চেয়েও অধিক মূল্যবান এই দর্শক শ্রোতাদের মূল্যায়ন। যা অনেক শিল্পী তাঁদের জীবদ্দশায় পাননা।আমি তা পেয়েছি এবং এই জানার জন্য আমি মেরিল-প্রথম আলো পাঠক জরিপ পুরস্কার এর কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ।প্রথম আলোর সব সাংবাদিকদের কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box