আমি জ্যাকুলিন মিথিলাদের নিয়ে লিখতে চাই না

শারমিন শামস্, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

আমি জ্যাকুলিন মিথিলাকে নিয়ে লিখতে বসেছি। জ্যাকুলিন মিথিলা হলো সেই মেয়ে যে পুরুষতন্ত্রের ফাঁদে পা আটকে নিজের মৃত্যু পর্যন্ত একটা নোংরা জীবনের রশি টেনে নিয়ে বেরিয়েছে।

জ্যাকুলিন মিথিলা নাম নিয়ে মেয়েটি ফেসবুকে নিজের প্রোফাইল চালাতো। তার লাখখানেক ফলোয়ার। কারন কি? কারন সে লাইভে এসে নিজের শরীর প্রদর্শণ করতো। তাকে পুরুষেরা লিখতো, আরো দেখাও। সে তখন জামা সরিয়ে ক্লিভেজ দেখাতো। এইভাবে সে সেলেব্রিটি হয়ে গেল। যার বাবা মায়ের দেয়া নাম ছিল জয়া।এই অপূর্ব মিষ্টি নামটা ত্যাগ করে কেন এই মোহ আর লোভের পথে নামতে হয়েছিল তাকে, আমি জানি না। যৌনতার নোংরা ক্লেদাক্ত অন্ধকার পথে সে জ্যাকুলিন মিথিলা হয়ে গেল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই পথটা এড়িয়ে গিয়েও অন্যভাবে বাঁচার চেষ্টা সে করতে পারতো। এবং আমি আরো বিশ্বাস করি, চেষ্টা করলে এই ক্লেদাক্ত পথ এড়ানো যায়। তাতে ঝলমলে জীবন আর খ্যাতি হয়তো আসে না। কিন্তু যে ক্লেদক্লান্ত খ্যাতির সঙ্গে ‘বেশ্যা, মাগী, খানকি’ শব্দগুলোই শুধু আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছে, সেই জীবনের আনন্দটা আসলে কোথায় থাকে? সুখটা আসলে কোথায়? কেমন?

জ্যাকুলিন মিথিলা

তাহলে মিথিলা কি সেলিব্রিটি? মিথিলা কি জনপ্রিয়? না, এর কোনটাই না। মিথিলা হল পুরুষতন্ত্রের ভোগে নিজেকে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করা একটা নিতান্ত সাধারণ মেয়ে। স্বাধীনতা আর আধুনিকতার নামে, খ্যাতির তাগিদে শরীর প্রদর্শণের যে নেশা আর পেশা সে বেছে নিয়েছিল, তা আধুনিকতা তো নয়ই, বরং আদিম নারীভোগকে নতুন মোড়কে নতুন করে উপস্থাপন। পার্থক্য হলো এই যে, আগে যৌনকর্মী মেয়েটাকে জোর করে খদ্দেরের কাছে পাঠানো হত, আর মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হত। তারপর একদিন সব মেনে নিয়ে ভাত আর মোটা কাপড়ের তাগিদে পেশাটা চালিয়ে নিত। আর মিথিলারা কী করে? তারা নিজেরাই ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলে, তারপর জামা খুলে ক্যামেরা চালিয়ে বসে পড়ে। এরপর শরীরকে পণ্য করে যে অর্থ আসে তাই দিয়ে ভালো বাসা, ভালো গাড়ি, দামি পোশাক, সুগন্ধী, দামি গহনার পাশাপাশি ইয়াবা মদের নেশাটাও চালিয়ে নেয়া যায় বেশ। বেশ একটা সেলেব্রিটি ইমেজও আসে। সবাই এক নামে চেনে। সে কিন্তু এও জানে, এই নামের আগে পিছে নোংরা গালি আর উপাধি সেটে রয়েছে চিরস্থায়ী।সেটা সে উপেক্ষা করে। না করলে চলবে কেমন করে!

জ্যাকুলিন মারা যাবার আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। তারপর মরে গেছে। মরে যাবে বলার পরও কেউ বন্ধু হয়ে তার কাছে আসেনি। ঠিক যেমন বছর খানেক আগে মডেল সাবিরার বেলায় ঘটেছিল। ঠিক তেমনি। তারপর মিথিলা মরে গেলে পর সব পুরুষ একটি কথাই বলে সুখ পেয়েছে, তা হল- বেশ্যা মরেছে, দুনিয়া পাপমুক্ত হয়েছে। তো এই বেশ্যার ফলোয়াররাই তার মৃত্যুতে সবচেয়ে খুশি। কারণ কি? কারন তারা জানে এক ক্লিভেজ যাবে, আরেক ক্লিভেজ আসবে। জ্যাকুলিন মিথিলা তাদের কাছে স্তন, ক্লিভেজ, যোনী, নিতম্বে মত কিছু মাংসের তালছাড়া তো আর কিছু নয়। তাই এক জ্যাকুলিন গেলে আরেক জ্যাকুলিন তার শরীর নিয়ে ঠিক হাজির হবে ক্যামেরার সামনে। তাই আফসোসের কিছু নেই। বরং এই মৃত্যুর পর জ্যাকুলিন মিথিলাকে বেশ্যা খানকি বলে দুটো গালি দিলে যদি লোকে চরিত্রবান এবং সর্বোপরি ধর্মপরায়ন সহি মুসলিম মনে করে, তবে তো কেল্লা ফতে।তাই এ সুযোগ হেলায় হারাতে চাননা জ্যাকুলিনের ক্লায়েন্টরা। হায় জ্যাকুলিন, এই পুরুষতন্ত্রের ভাষাটা বোঝোই নাই তুমি। কাউকে পেলে না। না জীবনে, না মৃত্যুতে।

জ্যাকুলিন মিথিলাদের নিয়ে আসলে লেখার কিছু নাই। এরা পুরুষতন্ত্রের সেবাদাসী। এরা নারীত্বের অবমাননাকারী। শরীরকে যৌনবস্তুতে পরিনত করে তারা সেবা দেয় পুরুষতন্ত্রকে, কারন তারা নারীত্বের শক্তি আর ক্ষমতা সম্পর্কে অজ্ঞ এবং নিজেকে এরা নিজেরাই একটি সক্ষম পূর্ণ মানুষ বলে মনে করে না। লৈঙ্গিক ধারনাটা আসে সামাজিক শিক্ষা থেকে। সমাজ মেয়েকে শেখায় তুমি দুর্বল, ক্ষমতাহীন, কম, নাজুক এবং শরীর তোমার আসল জিনিস। এ্‌ই ‘জিনিস’টা নিয়ে মেয়ে সদা সচেতন, সদা চিন্তিত, সদা সতর্ক থেকে থেকে বড় হয় এবং প্রয়োজনে কোন কোন মেয়ে এই শরীরকেই কাজে লাগায়। এখন যে মেয়েটা যৌনপল্লীতে জন্মেছে বলে কিংবা অপহরণ হয়ে, বিক্রি হয়ে বাধ্য হচ্ছে যৌনদাসত্ব করতে, তার সঙ্গে তো আমি মিথিলাকে গুলিয়ে ফেলতে পারি না। তাতে ওই যৌনপল্লীর অসহায় মেয়েটাকেই অপমান করা হয়। মিথিলাদের ইয়াবা, কার রেস, মদের আড্ডা আর ফেসবুক লাইভের জীবন থেকে অনেক দূরে সেই যৌনপল্লীর মেয়েরা।তাই মিথিলাদের নিযে কেনই বা লেখা? কি হবে লিখে? মিথিলারা আসে, ঝা চকচকে জীবনে কী যেন এক সোনার হরিণ খুঁজে ফেরে, তারপর মোহ ভাঙ্গে, তারপর নেশা স্তিমিত হয়, তারপর আঘাত আসে, তারপর তারা ফিরে যায়। কোথায় যায় কে জানে। যদি জীবন মৃত্যুতেই শেষ হয়, তবে হয়তো শেষ হয়। আর জীবন যতক্ষণ থাকে, সেই জীবন নিজের মত করেও তো বাঁচে আমার বাসায় ঘর মুছতে আসা তাহমিনা, আম্বিয়া, রুনার মায়েরা। কিংবা যৌনপল্লীর সেই মেয়েটা- যে স্বপ্ন দেখে, পয়সা জমিয়ে একদিন সে নিজেকেই কিনে নেবে পল্লীর দালাল সুচরিতা মাসির কাছ থেকে!

ছবিঃ গুগল