আমি ঝড়ের কাছে…

ঝড় আগন্তুক নয়। চৈত্র ফুরিয়ে গেলে বৈশাখের ঝড় আসে। জর্জ বিশ্বাসের কন্ঠে যখন শুনি রবীন্দ্রনাথের গান ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ তখন মনে হয় ঝড় তো জীবনের চিরসখা।কোথায় নেই ঝড়? ঝড়কে বলা যায় প্রকৃতির তারুণ্য। তার দাপটে উড়তে থাকে জীবনের যতো পুরনো পৃষ্ঠা। মেঘ জমে ওঠে আকাশের ক্যানভাসে। হাওয়া দৈত্যের মতো পেশী ফুলিয়ে জেগে উঠতে থাকে, বিদ্যূৎ তার বিশাল জিভ বের করে চেটে নিতে চায় পুরো আকাশটাকেই। তারপর কড়কড় শব্দে বাজ পড়ে। চমকে ওঠে মন! কখন ঝড় এলো! অদৃশ্য এক প্রলয়ের আয়োজন আছড়ে পড়ে আমাদের জমানো স্থিতির ওপর।বহুকাল আগে ডাকাত পড়লে যেমন হৈ হৈ রব উঠতো অনেকটা সেরকম। বৈশাথী ঝড় তো আরও ভয়ংকর। লেখাটা লিখতে বসে ঝড় দেখলাম। শেষ রাতের ঝড়। নগরীর শূন্য পথের ওপর, গাছপালার শান্ত শরীরের ওপর, দোকানগুলোর বন্ধ শাটারের ওপর, বাড়ির জানালায় নখ বিঁধিয়ে দিয়ে কী ভয়ংকর গলায় চিৎকার করতে থাকলো হাওয়া! কী মারাত্নক অন্ধকার নামলো। আর তারপরেই সেনাদলের মতো মার্চ করতে করতে এলো বৃষ্টি।

বৈশাখের ঝড়ের রূপটাই এমন। আমাদের জীবনেও ঝড়ের অন্ত নেই। চায়ের কাপের ঝড় থেকে শুরু করে গল্প কবিতা আর গানে ঝড় বাঙালির জীবনের আরেকটি অংশ হয়ে আছে।

এবার প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ঝড় নিয়ে ‘আমি ঝড়ের কাছে…’

ঝড় নিয়ে বাঙালির ভয় যেমন আছে আবার রোমার্টিকতারও শেষ নেই। রোমান্টিক কথাসাহিত্য, কবিতা সর্বত্রই ঝড় এসেছে অনুষঙ্গ হয়ে। ঝোড়ো হাওয়ার হাত ধরে এসেছে ভালোবাসা। সলিল চৌধুরীর সেই বিখ্যাত গান আজও মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে,‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। অনিশ্চয়তা, ছত্রখান নিয়তির কাছেও কেউ রেখে যেতে চায় জীবনের হিসাবের খাতাটা। আবার ঝড় উড়িয়ে নিয়ে যায় ভালোবাসা, সংসার। শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস ‘সারেং বউ’। সেখানে অন্তিমে খল চরিত্র সেই সারেং আর নবীতুনের ভালোবাসা,সংসার সব উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর এক সময় ঝড় থামে। কিন্তু তাদের জীবনের ঝড় কি থেমেছিলো? প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর কবিতায় লিখেছেন-

‘ঝড় যেমন করে জানে অরণ্যকে

তেমনি করে তোমায় আমি জানি৷’

ঝড়কে জানা কঠিন কাজ। ঝড়ের সঙ্গে দেখা হওয়াও ভীষণ অভিজ্ঞতা। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁর ‘স্মতিররেখা’ বইতে লিখেছেন, ‘তখনও এই রকম কালবৈশাখী নামবে, এই রকম মেঘান্ধকার আকাশ নিয়ে, ভিজে মাটির গন্ধ নিয়ে, ঝড় নিয়ে, বৃষ্টির শিকরসিক্ত ঠাণ্ডা জোলো হাওয়া নিয়ে, তীক্ষ্ণ বিদ্যুৎ চমক নিয়ে-তিন হাজার বছর পরের বৈশাখ-অপরাহ্নের উপর । তখন কি কেউ ভাববে তিন হাজার বৎসর পূর্বের প্রাচীন যুগের এক বিস্মৃতি! কালবৈশাখীর সন্ধ্যায় এক বিস্মৃত গ্ৰাম্য বালকের ক্ষুদ্র জগৎটি এই রকম বৃষ্টির গন্ধে, ঝোড়ো হাওয়ায় কি অপূৰ্ব আনন্দে দুলে উঠতো ?’ এমন আশ্চর্য সুন্দর কথাগুলো লেখার আগেই বিভূতিভূষণ লিখে ফেলেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’-এর সেই ঝড়ের দৃশ্য, যেখানে ঝড়ের মধ্যে অপু আর দূর্গা দুজনে গুটিসুটি হয়ে বড় গাছের তলায় আশ্রয় নিয়ে ঝড় দেখছে। তখনও কি অপু জানতো এমনি আর এক ঝড়ের রাত্রি দিদি দূর্গাকে তার জীবন থেকে মুছে দেবে?

ঝড় এমনই। ভেঙে ফেলে কখনও, আবার ফিরিয়েও দেয়। হাওয়ার সেনাদল নেয় অনেক কিছু। প্রাণও সংহার করে। কিন্তু কখনও ফিরিয়েও তো দেয় জীবনের কত হারানো জলছবি।

বাঙালির কাছে ঝড়ের সঙ্গে কিন্তু জড়িয়ে আছে চায়ের কাপের ঝড় বিষয়টাও। আড্ডাপ্রিয় বাঙালির চা আর চানাচুর হলেই চলে। আর সেখানেই চায়ের কাপে ওঠে ঝড়। এখন আড্ডা চলে গেছে ডিজিটাল পদ্ধতির দখলে। চ্যাটিং, গ্রুপ চ্যাটিং, মেসেজ কত কী নামে আমাদের নিখাদ আড্ডাগুলো প্রায় বিধ্বস্ত। কিন্তু যখন ঝড়ের কথা উঠলো মনে হলো, চায়ের কাপের ঝড়ের কথা। কত কী যে বাঙালি চায়ের কাপে ঝড় তুলে কুপকাৎ করে ফেলে তার ইয়ত্তা নেই। রাজনীতি, ফুটবল খেলা, প্রেম,  সবই আমাদের চায়ের কাপে ঝড় তুলে যায়। আলোচনা, সমালোচনায় নরক গুলজার না করলে বাঙালির পাকস্থলীতে ভাতও শান্তি পায় না বোধ হয়।ঝড় আমাদের রক্তে মিশে আছে। ক্ষয়ক্ষতির খাতায় ঝড়ে মৃত্যুর নাম লেখা থাকে জেনেও বাঙালির জীবনে ঝড় এক অন্য সুর বাজায়। ঝরে পড়া আমের মুকুলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, শূন্যে অনির্দিষ্ট উড়তে থাকা ঠোঙ্গা, ফেলে দেয়া চিরকুট, দোকানের সেবের খাতার পৃষ্ঠা, স্মৃতি- সবকিছুই উড়িয়ে দেয় ঝড়। সে ঝড় ঘন্টায় কত কিলোমিটার বেগে বয় তার হিসাব কে রাখে!

এই ঝড়ের দেশে মানুষও কখনও ঝড় তোলে। শুধু আকাশে নয়, শুধু মনে নয়; সে ঝড় তোলপাড় করে দিয়েছে মানচিত্র, ভেঙ্গে দিয়েছে শাসনযন্ত্রের সব স্বস্তি, লোপাট করেছে ঘুম। কারা জাগিয়েছিলো এমন ঝড়? ঝড় যখন উঠছেই তখন তাদের কথাও ভাবি। তখন সময়টা ভীষণ মারাত্নক। বিদ্রোহ জয়ী হচ্ছে চারদিকে। মধ্য ষাট থেকে সত্তরের দশক। সরবোর্ণ থেকে হাভার্ড হয়ে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, বলিভিয়া, চিলি, অ্যাঙ্গোলা-কোথায় ওঠেনি ঝড়? প্যারিসের রাস্তায় দ্য গলের ফৌজের ট্যাংকের নলে ঠোঁট ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিলো ছাত্ররা। ‘শুট দেম’ নির্দেশ পাঠাচ্ছেন জেনারেল। আদেশ অমান্য করছেন সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার। ‘স্যার, হাও কুড আই শুট আ কিস?’ সারা পৃথিবীকে শোসন মুক্ত করার স্বপ্ন দু’চোখে নিয়ে বলিভিয়ার জঙ্গলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন আর্নেস্তো চে গুয়েভারা, ভিয়েতনামে গেরিলাদের হাতে মার খেয়ে পালাচ্ছে প্রতাপশালী মার্কিন বাহিনী, জন লেনন গেয়ে উঠছেন, ‘গিভ পিস আ চান্স।’ আর ঠিক তখনই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তরাই অঞ্চলে উঠে দাঁড়াচ্ছেন শীর্ণকায় এক মানুষ, চারু মজুমদার। হাঁফানির রুগি, চোখে ভারী চশমা, হাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার। আর বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য হাজার হাজার যোদ্ধা অতিক্রম করছে নদী, পাহাড়। তাদের রক্তে পবিত্র হচ্ছে দেশের মাটি। এ-ও তো ঝড়। মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে মানুষের তোলা ঝড় অপূর্ব সুন্দর করে দিয়েছিলো পৃথিবীকে। এমন ঝড়ের দিনে সেই মানুষদের গল্পও যে প্রকৃতির ঝড়ের চাইতেও উন্মাতাল।তারা ঝড়ের কাছে তাদের ঠিকানা রেখে গিয়েছিলেন একদিন।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ স্মুতির রেখা/বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রেষ্ঠ কবিতা/ প্রেমেন্দ্র মিত্র
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box