আমি, তুমি ও ম্যাকবেথ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘তুমি রাজা হবে ম্যাকবেথ!’ তিন ডাইনি‘র ভবিষ্যতবাণী উসকে দিয়েছিলো স্কটল্যান্ডের এক সেনাপতির আকাঙ্ক্ষার আগুন। ঘরে তার প্রলোভনে পোড়া স্ত্রী! তারপর ঘটে চলা একের পর এক ঘটনা। ষড়যন্ত্র, খুন, রক্ত, ক্লেদ… কিন্তু এই ভয়ংকর কাহিনি বহু বছর আগে শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন তাঁর নাটকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ১৫৯৯ থেকে ১৬০৬ সালের মধ্যে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া নাটক ‘ট্র্যাজেডি অফ ম্যাকবেথ’ রচনা করেন শেক্সপিয়ার৷ আর প্রথমবার তা ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত হয় ১৬২৩ সালে৷ পৃথিবীটাই তখন অন্যরকম ছিলো৷ মধ্যযুগ চলছে। অন্ধকার সময় বেড়ে উঠছে পৃথিবীর বুকে। মানুষের বুকের ভেতরে জমে থাকা প্রাগঐতিহাসিক অন্ধকার নানান রূপ ধরে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সেই যুগের সঙ্গেই কি উবে গিয়েছে ম্যাকবেথ নাটকে উঠে আসা লোভ, ক্ষমতালিপ্সা, সন্ত্রাস, রক্তপিপাসা, অপরাধবোধের অনুভূতিগুলো? উত্তর একটাই, সেই অন্ধকারের উত্তরাধিকার আমরা আজও বহন করে চলেছি। রচনার প্রায় ৪০০ বছরর বেশি সময় পরেও ম্যাকবেথের গল্প সমকালীন। আজও জীবনের মঞ্চে ম্যাকবেথের মতো অসহায় ক্রীড়নক বলে ওঠে,‘ জীবন গল্পের মতো; এতো এক মূর্খের সংলাপ। কোলাহল আর ক্রোধের বিস্তার ধরে রাখে শুধু এ জীবন। বাকি সবকিছু থাকে অনির্ণীত।’

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো, ‘আমি, তুমি ও ম্যাকবেথ’। 

ডাইনিদের ভবিষ্যত বাণী সেনাপতি ম্যাকবেথের মনে উসকে দিয়েছিলো লোভ, ক্ষমতার লোভ। স্কটল্যান্ডের রাজা ডানকানের সেনাপতি ম্যাকবেথ  এক যুদ্ধ জয় করে ফিরছিলেন।সঙ্গে লর্ড ব্যাঙ্কো। অন্ধকার সেই রাতে পথে তাদের সঙ্গে দেখা হয় তিন ডাইনির। তারপর তাদের সেই সংলাপ ‘তুমি রাজা হবে ম্যাকবেথ’ চমকে দেয় রাজার সেনাপতিকে। ক্ষমতার লোভের ঝকঝকে চাঁদ ওঠে ম্যাকবেথের মনে। ম্যাকবেথ চিঠি লিখে স্ত্রীকে জানান। স্বামীর চিঠি পড়ে লেডী ম্যাকবেথ মেতে ওঠেন প্রসাদ ষড়যন্ত্রে।রাজা ডানকান ম্যাকবেথের ইনভার্নেসের দূর্গে রাত্রিযাপন করতে এলে স্ত্রীর প্ররোচনায় ম্যাকবেথ খুন করেন রাজাকে। ক্ষমতার লোভ আর ষড়যন্ত্রের গল্প এখানেই থেমে যায়নি। বার্নামের অরণ্য এগিয়ে আসা, তিন ডাইনির ভবিষ্যতবাণী, ম্যাকবেথের স্কটল্যান্ডের ক্ষমতা দখল, মানসিক বিপর্য়য় আর শেষ পর্যন্ত তার হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে শেষ হয় এই ট্র্যাজেডির গল্প।

সাহিত্যের গবেষকরা বলছেন, ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক দুঃসময়ে বসে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তিনটি নাটক লেখেন। কুখ্যাত বিউবনিক প্লেগের সময় ঘরে আটকে থেকে লিখেছিলেন ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’। ম্যাকবেথ এবং কিং লীয়র লেখা হয়েছিলো ১৬০৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড়  তোলা ‘বারুদ কেলেংকারি’-এর ঘটনার সময়। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা ‘গান পাউডার প্লট’ নামে পরিচিত। ওয়েস্টমিনিস্টার প্রাসাদের নিচ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিলো কয়েক ডজন বারুদ ভর্তি ড্রাম। এগুলো বসানো হয়েছিলো রাজা জেমস ও হাউজ অফ লর্ডসের সদস্যদের হত্যা করার জন্য। গবেষকরা বলছেন, এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পেছনের কুশীলবদের আটক হওয়ার ঘটনা শেক্সসপিয়ারের চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিলো। তিনি লিখে ফেলেছিলেন একজন ভালো মানুষ সেনাপতির হঠাৎ করে প্রাসাদ ষড়যেন্ত্রের কাহিনি নির্ভর নাটক-ম্যাকবেথ। যেখানে ক্ষতালোভী কয়েকজন মানুষ আর তাদের উন্মাদ হয়ে ওঠার গল্প শেক্সপিয়ার উপস্থাপন করেছেন।

ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা দখলের রাজনীতি আর হত্যাকাণ্ড শেক্সপিয়ারের নাটকে নতুন নয়। হ্যামলেট, কিং লীয়র, জুলিয়াস সিজার, অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা নাটকে এই রক্তপাত আর ষড়যন্ত্রের কাহিনিকেই মূল উপজীব্য করেছেন এই মহান সাহিত্যিক। শেক্সপিয়ারের নাটকের কাহিনিগুলো কিন্তু আজও মানুষকে তাড়া করে ফেরে। আমরা চারপাশে দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই সেই একই লোভ, সেই একই একনায়কতন্ত্র আর ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি। রাজনীতির কু-ডাক যেন আমাদের পেছন ছাড়ে না।রক্তের দাগ শুকায় না আমাদের হাত থেকেও। লেডী ম্যাকবেথ যেমন বারবার চেষ্টা করেন নিজের হাতে লাগা নিয়তির মতো রক্তের অদৃশ্য দাগ ধুয়ে ফেলতে তেমনি আমরাও কি চেষ্টা করি না অপরাধবোধ থেকে, ক্লেদ থেকে নিজেদের আত্মাকে মুক্তি দিতে? ডাইনিদের মিথ্যা ভবিষ্যতবাণীর মতো আমাদেরকেও নিয়তি টেনে নিয়ে যায় এক উচ্ছেন্নে যাওয়া সময়ের কেন্দ্রে। সেখানে থাকে অভ্যুত্থান, সেখানে থাকে আগ্রাসন, ষড়যন্ত্র আর দখলের কালো অধ্যায়। এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন ব্যক্তি মানুষও মিশে যায় এই স্রোতে। রাজনীতি আর ক্ষমতার অন্ধ চক্রে সেই মানুষটিও তখন পরিণত হয় চার‘শ বছর আগে লেখা ম্যাকবেথ চরিত্র। সে ভবিষ্যতবাণীর হাত ধরে অন্ধের মতো এগিয়ে চলে নিজের গণ্ডীর ভেতরে ম্যাকবেথের মতো;তার লক্ষ্য ক্ষমতা দখল।

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এই নাটকে সন্ত্রাসকে ব্যবহার করেছেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে। রাজাকে খুন করার পর প্রমাণ লোপাটের জন্য পরিচারকদের ওপর খুনের দায় চাপিয়ে তাদেরও হত্যা করা, গোপন হত্যাকারী পাঠানো ব্যাঙ্কো আর তার ছেলেকে খুন করার জন্য, এ সবই তো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নমুনা। আর নাটকের অন্তিমে যুদ্ধ ডেকে আনা। নিজের ভয়ানক পরিণতির দিকে এভাবেই হেঁটে যাই আমরা, হেঁটেছিলো ম্যাকবেথও। শেক্সপিয়ার তাঁর নাটকে এঁকেছেন মানুষের জীবনের অন্ধকার   এক অধ্যায়ের ছবি। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র তার চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিলো সেই মধ্যযুগে বসে। রাজনীতির পাশা খেলার টালমাটাল সময়ে শেক্সপিয়ার যেসব চরিত্রের মাধ্যমে বিয়োগান্তক নাটকটি রচনা করেছেন তার ছায়া আজও সমকালীন হয়ে আমাদের সমাজে, রাজনীতির মাঠে নিঃশ্বাস ফেলে। ম্যাকবেথ আর তার স্ত্রী‘রা আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে আমাদের চোখের সামনে।

ইরাজ আহমেদ

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ  নিউইয়র্ক টাইমস, বায়োগ্রাফি, গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box