আমি ধন্য হয়েছি ওগো ধন্য তোমারই যত্নের জন্য

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

অনেক দিন ধরেই ঘর সংসার, ভাবনা, পেশাদার জীবনের গল্প বলে যাচ্ছি।মনে হয় সবই ধারাবাহিক লিখছি কিন্তু পরে মনে হয় অনেক কিছু বাকি রয়ে যায়।সেটা হয়তো কোনো সুখ কোনো দুঃখ কোনো দর্শন বাদ রয়েই যাচ্ছে।আমি আজ আমার খুব সৌভাগ্য মন্ডিত আনন্দের গল্প বলি।সংসার এর কাজকর্মে প্রথম প্রথম কোন হিসাব বা আন্দাজই ছিলো না আমার। গুছিয়ে কিছুই পারতাম না,এমনকি ভাবতাম ও না।খুব যে শাড়ি গয়না নিয়ে ভেবেছি তাও না।আমার চিন্তা ভাবনা ছিলো পড়াশোনা, নামাজ-কোরান আর গানের সাধনা নিয়ে। সংসারের থালাবাটি বাজার ঘাট আমি বুঝতামই না।তবে এটা বুঝতাম যে এই সংসারে সাশ্রয় দরকার। মাদারটেক যখন সংসার পাতলাম তখন আমাদের খুবই অল্প আয় ছিলো। খুবই মানে ভয়ংকর অল্প।একতলা বাসা।তখন ফেরিওয়ালা হাঁক ছাড়তো। এই মাছ, এই মুরগী, এই দেশী ডিম এমন অনেক কিছু। আমি আমার স্বল্প বুদ্ধিতে অনেক সময় বারান্দা দিয়ে তাদের ডেকে মাছ, ডিম, মুরগী এগুলো কিনতাম। এবং অবধারিত ভাবেই ঠকতাম।প্রথম প্রথম আমার সাহেব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন। কিন্তু একই ভুল বারবার করায় উনি রেগে যাচ্ছিলেন।কারণ মুরগীওয়ালা হয়তো আটটা মুরগী গছিয়ে দিয়ে গেছেন সবগুলোই ষাট সত্তর বছরের! হাহাহা। সেগুলোকে রান্না তো দূরের কথা জবাই-ই করা যায়না।একবার এক মাছওয়ালা বিশাল রুইমাছ গছিয়ে দিলো।সেই মাছের শ্যাওলা শ্যাওলা দুর্গন্ধে ঘরে টেকা দায়।ওই মাছ ওয়ালাই আরেকদিন এসেছেন, কেবল মাছের ডালা বারান্দার সামনে রেখে হাঁক ছেড়ে আমাকে ডাছেন,  আমার আগেই আমার সাহেব বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন যে আগের মাছের জন্য তাকে ধরবেন। মাছওয়ালা মাছ ভর্তি ডালা রেখে ভোঁ দৌড়! সেই যে দৌড় দিলেন আর সারাদিনেও এলেন না।এদিকে মাছ ভরা ডালায় মাছি বসছে,কাক বসছে,কুকুর শুঁকছে।আমি প্রতিজ্ঞা করলাম জীবনেও আমি আর কিছু কিনবোনা।সবাই আমাকে বোকা ভাবে,বোকা ভেবে বোকা বানায়। কাউকে আজও বোঝাতে পারিনি আমি সরল,বিশ্বাসী, বোকা নই।কিন্তু অনেক সময় নিজেই দ্বিধার দোলাচালে দুলে ভাবতে বসি আমি হয়তো শুধু বোকাই না, গাধাও আছি।সে যাইহোক। আমি আর কখনও বাজার ঘাট মাছ গোস্তো ডিম তেল নুন কিনিনি।এগুলো পুরোই উনার কাজ। ধীরে ধীরে রান্নাঘর বুঝে নিলাম। অনেক রান্নাই আমি নিখুঁত করে পারি।কোনোটা হয়তো এদিক ওদিক হয়।আবারও শুধরে নেই।বিদেশি, আশেপাশের দেশের রান্না, মায়ের রান্না শাশুড়ির রান্না সবই অনায়াসে রাঁধি।পিঠা বানাই,সস বানাই,আচার বানাই,মিষ্টান্ন, হালিম,দইবড়া, গোস্তের কাবাব, চাপ সবই করি খুব আরামে এবং নির্ভাবনায়, নির্ভরতায়। রান্নার এই নির্ভার নির্ভরতা এলো আমার সাহেবের নিখুঁত বাজারের জন্য। গরুর গোস্তো কিনতে উনি ভোররাতে কসাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ান।যে গরু জবাই হবে তাকে প্রদক্ষিণ করে তার অসুখ বিসুখ আছে কিনা দাঁত কয়টা সেই গরু দেশী কিনা সব দেখেন। কসাই তার সামনে জবাই করেন। উনি সামনের পেছনের রানের সিনার গোস্তো মিলিয়ে কেজি দশেক কিনে আনেন।মুরগী ও টিপে টিপে পা, নখ ঠোঁট দেখে কেনেন। আর মাছ? যখন থেকে আমরা ফরমালিনে ডোবানো তখন থেকেই উনি মাছ কেনেন যমুনা নদীর নদী সংলগ্ন আড়ৎ থেকে। তারপর আমাদের মাননীয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আমার ভাই শ্রদ্ধেয় ইকবাল হাসান মাহমুদ সাহেব আমার হাজব্যান্ড কে বললেন জামাই তুমি মাছ কিনতে কষ্ট করে সিরাজগঞ্জ আসো? দাঁড়াও, আমি তোমাকে লোক ঠিক করে দেই।তারপর থেকেই আমাদের রুই, পাবদা, আইড়, চিংড়ি, পিয়ালি ইত্যাদি মাছ সেই মাছওয়ালাই দিয়ে যান।আমরা কখনো ফরমালিন ওয়ালা মাছ ফল খাইনি।অনেক সময় উনি বগুড়া ফতেহ আলী বাজার থেকে মাছ কেনেন। সেসব মাছ এমন ভালো স্বাদের যে একবার খেলে আজীবন মনে থাকবে। আমার মেয়ের বিয়েতে উনি যা দেখালেন! পোলাওয়ের চাল এলো বগুড়া থেকে ঘি এলো টাংগাইলের জামুর্কি থেকে ছাগল এলো যশোর থেকে গরু এলো সিরাজগঞ্জ থেকে বোরহানির দই এলো জলখাবার থেকে ! সে বিয়ের খাবার খেয়ে সবাই বলেছেন জীবনে অনেক বিয়ে খেয়েছি কিন্তু এমন মধুর স্বাদের খাওয়া কখনো খাইনি। দাওয়াতিদের মধ্যে বলাই বাহুল্য হেভিওয়েট ব্যাক্তিত্ব ছিলেন কিন্তু সবাই তো আর ভোজন রসিক নন।কিন্তু সাবেক মহামান্য প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ খাবেন না বলেও রান্নার খুশবুতেই হয়তো বললেন খাবেন। তৃপ্তি ভরে খেয়ে বাবুর্চি কে ডেকে পাঠালেন। বাবুর্চি কে উনি কমপ্লিমেন্ট এর সঙ্গে বড় অংকের টাকা দিলেন খুশি হয়ে এবং রান্নার রহস্য জিজ্ঞেস করায় বাবুর্চি বললেন স্যার আমি এমনই রাঁধি কিন্তু আসলে মইনুল ইসলাম খান স্যার এমন সুন্দর বাজার করে দিয়েছেন যে আমার আজকের রান্নাটা জীবনের শ্রেষ্ঠতম হয়ে গেলো! মাশুকের বিয়ের খাওয়াও এমন সারাদেশ থেকে এসেছে এবং সে খাওয়াও এমন অপূর্ব স্বাদেরই হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। রেগুলার বাজার ফল ফলাদি বিস্কুট স্ন্যাকস সবই উনি নিজেই কেনেন যত্ন ভরে।হঠাৎ কখনো হুটহাট বাজার যেতে না পারলে তখন উনি অভিনব বুদ্ধি দিয়ে হলেও সেই শ্রেষ্ঠ বাজারটাই করেন। এতে কোন কমপ্রোমাইজ করেন না।একবার চট করে মেহমান আসবে।উনি অনেক কিছু বাজার করেছেন কিন্তু মুরগী কেনেন নাই।দেশ তখন দেশী মুরগির নামে কক, সোনালী মুরগি দিয়ে ভরা! তো অ্যাপার্টমেন্ট এর দারোয়ান কে বলেছেন মুরগী আনতে।সেই দারোয়ান খায়ের ভাই যখন মুরগী আনলেন তখন দেখি একটা বাঁধাই করা ছবি কাগজে মোড়ানো, খায়ের ভাই সেটা মুরগী সহ আমাকে হাতে দিলেন। আমি অবাক! এটা কি? খায়ের ভাই বললেন স্যারের ফটো! কেন? তখন খায়ের ভাই বললেন মুরগী ওয়ালা যদি আমাকে ঠকায় সেজন্য স্যার দেয়াল থেকে এই ছবি খুলে দিয়ে বলেছেন মুরগী ওয়ালাকে দেখাতে যে এই স্যারের জন্য মুরগী দেন! কি অভিনব বুদ্ধি! হাহাহা। এই গল্প যখনি মনে হয় আমি সুখে হাসি সুখে ভাসি! এখন তো প্রযুক্তি পাল্টে গেছে। দারোয়ান এর হাতে স্মার্ট ফোন।কয়দিন আগে দেখি ভিডিও কলে মুরগী দামাদামি করছেন। দারোয়ান এর ফোন আর আমার সাহেবের ফোনের ভিডিও কল।মাঝখানে চিপায় পড়ে পানখাওয়া তরমুজের বীজের দাঁতে মুরগীওয়ালা হাসছেন। আমার বাঘসাহেব বলছেন বুড়া মুরগী দিবি তো… মুরগীওয়ালা শূন্যস্থান পূর্ণ করেন … ভিডিও কলেই গুলি কইরেন। আমি এবং আমরা হেসে বাঁচিনা!

আমি খুব গর্বিত স্ত্রী যে আমার জীবনসঙ্গী কাঁচামরিচ,  সরিষার তেল থেকে গুঁড়া মশলা  সবকিছুই এতো গুনগতভাবে ভালো ভালো জিনিস কেনে যে আমাকে এসব নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয়না। আমি বাজারের লিষ্টে যা কিছু লিখলেই উনি আনেন না কারণ বাজারে হয়তো সেই জিনিস ভালো পাওয়া যাচ্ছেনা এবং আরেকটা ব্যাপার আমরা কখনওই অমৌসুমী ফল সব্জি খাইনা।কখনোই লাল টুকটুকে বিষাক্ত টমেটো কেউ আমার বাসায় অদিনে পাবেন না।এমনকি আমরা কোল্ড স্টোরেজের সব্জি খাইনা।আমিও কখনও ভরা শীতের আগে অদেখলার মত সেপ্টেম্বর অক্টোবর এ সীম ফুলকপি কিনেতে চাইনা।আমি সব্জীর মৌসুম চিনি।এবং মার্চ এপ্রিল এ কখনও ল্যাংড়া গোপালভোগ আম কিনিনা।তাদের সত্যিকারের পাকার সময়েই আমরা তা কিনে আনি।সালাদে খাওয়া ছাড়া কখনো তরকারিতে আমরা ভারতীয় পেঁয়াজ খাইনা।এসব ক্ষেত্রে উনি আমাকে ছাত্রীর মতো ধরে ধরে সব শিখিয়েছেন। আমি তার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ। আর উল্টে দিয়ে একটি বাক্য আমার পক্ষে বলতে চাই সেটা হলো সংসার সুখের হয় পুরুষের গুনে।উনি যদি আমাকে কোন ক্রেডিট না দেন তাতে অবশ্য কিছুই মনে করবো না।কারণ উনি এভাবে লিখছেনও না আর ঘরের ভেতরের এতো কথা এভাবে মন খুলে বলেনও না।শুধু বাজার নয়, মেহমান আসলে উনি কাঁচের শখের থালাবাটি কাবার্ড থেকে নামিয়ে ধুয়ে মুছে টেবিল গোছানোর দায়িত্বের সঙ্গে ঘর ঝাড়ুর ফিনিশিং টাচ ও উনিই দেন হাসিমুখে আলহামদুলিল্লাহ ।

আবারও বলি শুধু গান নয় আমার রান্নাঘরের শান্তির জন্য ও উনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments