আমি নিরালায় বসে বেঁধেছি আমার স্মরণ বীণ

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

বাচ্চাটা একটু বড় হতে লাগলো। ধীরে ধীরে ধীরগতিতে আমি আমার গানের জগতে ফিরে যাচ্ছিলাম। সে যাওয়া আসলে তেমন যাওয়া নয়।বিটিভিতে দু’একটা গান, রেডিওতে দু’একটা গান গাচ্ছিলাম। ছবির গানের চ্যাপ্টার যেনো ক্লোজ হয়ে গেলো। সারাদিন যেমন তেমন রাতে ঘুমাতে গেলে শুধু মনে হয় আমি কি এখানেই থেমে যাবো? এখানেই থেকে যাবো? খুবই ভয়ংকর, নির্মম সত্য যে বিবাহিত এবং স্বয়ং স্বামী সবসময় সঙ্গে থাকেন  বলে আমাকে কেউ গান গাওয়াতে চান না।আমি সে সব বোঝার ভান করেও না বোঝার ভাব ধরে থাকি।কেউ কেউ দোষ ধরেন আমার কাপড় পড়ার ধরনের! কেউ কেউ চুলের স্টাইলের ভুল ধরেন এবং নিশ্চিত করে বলেন এই কাপড়, ব্লাউজের কাটিং এর জন্য এবং গ্রামের মেয়েদের মত লম্বা চুলের যন্ত্রনাতেই আমার কিছুই হবেনা। গানের সময় কোনো নড়াচড়া নাই, প্রডিউসারদের সঙ্গে আড্ডা নাই, সুরকার দের সঙ্গে বন্ধুত্ব নাই, কাপড় জামা গ্রামের মতো, শুধু কি গলা থাকলে হবে? আমি শুধু ভাবি তোমরা আমাকে  চিনতেই পারছোনা।কন্ঠ আমার যে ক্যাটাগরির হোক শিল্পীর জাত হিসেবে আমি অবশ্যই বিনোদনকারী নই! খুব কাছের একজন আত্মীয় বারবার বলেন তোমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যা দাড়াচ্ছে তাতে দু’দিন পর খুবই ভয়াবহ অবস্থা হবে। তিনি নিজে একটি গন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি করেন। খুব মমতা এবং দুশ্চিন্তা নিয়েই উনি আমাকে প্রায়শই ওই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাঠকর্মীর প্রশিক্ষণ নিতে বলেন। আমি উনার কথায় রাগ হইনা, দিশাহারা হই! মঞ্চানুষ্ঠান করছি দু’চারটা।নিজের তেমন গান নাই, কিন্তু অন্যের কি গান যে গাই বুঝতেই পারিনা।মঞ্চে দাঁড়াতেই লজ্জা পাই।শাড়ি কিভাবে গায়ে টানবো তাও বুঝিনা। দু’য়েকটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ডাক পেলাম। তাতে যা অভিজ্ঞতা হলো তা ভয়াবহ। মানুষের বাড়িতে পেইড আর্টিস্ট হয়ে গান গাওয়া খুবই অস্বস্তিকর।এমন না যে কেউ অসম্মান করছে কিন্তু একদিন গাইলে আজীবন শুনতে হয় ‘ওহ, আপনি? হ্যাঁ আপনার গান শুনেছি অমুকের বাসায়!’ যেন ওই বাসা ছাড়া আর কখনো কোন জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রে আমার গান বাজেই না! একবার এক পুরান ঢাকার বাড়িতে গাইবার জন্য সিনিয়র মহিলা শিল্পী নিয়ে গেলেন। অনুষ্ঠানের উপলক্ষ জানিনা।উনি আগে গাচ্ছিলেন। টাকার বান্ডিল থেকে টাকা উড়ে উড়ে উনার হারমোনিয়ামের উপর পড়ছিলো। মদের গন্ধে ভুরভুরে পরিবেশ এ ভয়ংকর অস্বস্তি হচ্ছিলো। আমার হাজব্যান্ড আমাকে বললেন চলো পালাই! আমার কান্না পেয়ে গেলো! দু’জনেই পালিয়ে এলাম।দুয়েকদিন পরে সেই সিনিয়র আপা বলছিলেন তোমরা পালিয়ে এলে কেনো? জানো সেদিন আমি পঞ্চাশ হাজারের উপর ‘ছুট’ ই পেয়েছিলাম, কনক নিশ্চয়ই দুই তিন লাখ টাকা পেতো! আমাদের তখন কি ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থা! কিন্তু আমার মনে একটা কথাই জপের মত বাজছিলো ‘ আমি বিনোদনকারী নই আমি বিনোদনকারী নই আমি বিনোদনকারী নই ’ এই কথাটা সমাজকে বুঝাতে আমার অনেক বছর সময় লেগেছে। জীবন উৎসর্গ করে বোঝাতে হয়েছে। না দূরের মানুষ না কাছের মানুষ কাউকেই বুঝাতে পারিনি বিনোদনকারী গায়িকা এবং শিল্পীর তফাৎ। সব প্রফেশনেই পিয়ন ক্লার্ক অর্ডারলী অফিসার জিএম এমডি ডিরেক্টর আছে কিন্তু যারা গান গায় তারা সবাই যেনো গায়িকা! জীবনের শুরুতেই এই অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছি, আজও সেই যুদ্ধই করছি।তাতে কোন অসুবিধা নেই কিন্তু আমার অবস্থান আমি বুঝাবোই একদিন যে ‘আমি শুধুই একজন বিনোদনকারী নই’।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে