আমি ভাবছি বিপ্লবের অমরত্বের কথা

দিনটা কি রৌদ্রকরোজ্জ্বল ছিলো নাকি মেঘলা? কোনো বইতেই সেই দিনটি কেমন ছিলো তার বিবরণ পাওয়া যায় না। আর্নেস্টো চে গুয়েভারাকে বন্দী করে ওরা রেখেছিলো বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা নামে ছোট্ট গ্রামের একটি স্কুলের শ্রেণীকক্ষে। হয়তো সূর্যের আলো স্পর্শ করেছিলো স্কুলটিকে হয়তো নয়। হয়তো পাখি ডাকছিলো হয়তো নয়। টুলবেঞ্চি ঘেরা একটি শ্রেণীকক্ষে বন্দী ছিলেন চে। ঘড়িতে সময় তখন বেলা এগারোটা হয়তো। সেই ঘরে হয়তো আলো প্রবেশ করছিলো না। হয়তো দমবন্ধকর, রুদ্ধশ্বাস এক পরিবেশ। হাত ও পা জোড় করে বাঁধা চে গুয়েভারা হয়তো বসে আছেন মেঝেতেই। অপেক্ষা মৃত্যুর। অপেক্ষা বিপ্লবের বিপ্লবের এক অকম্পিত শিখার নিভে যাবার।

বিলিয়ার সেনাদল আর সিআইএ-এর এজেন্টদের হাতে ঘেরাও হয়ে যাবার তেরো দিনের মাথায় আহত চে’কে বেঁধে রাখা হয় সেই স্কুলঘরে।সিআইএ এজেন্ট ফেলিক্স রডরিগেজ আর বলিভিয়ার সেনা কর্মকর্তারা বহু জিজ্ঞাসাবাদেও চে‘র মুখ থেকে জীবিত কমরেডদের সম্পর্কে একটি শব্দও বের করতে ব্যর্থ।তাই সিদ্ধান্ত হলো মেরে ফেলা হবে চে গুয়েভারাকে।জীবিত চে তাদের বড় ভয়ের কারণ যে। ছবি তোলা হলো ফেলিক্সের রাইফেলটি চে গুয়েভারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে।শেষ ছবি চিরবিদায়ের আগে। তারপর তো খালি গায়ে শরীরে গুলির দাগ নিয়ে শুয়ে থাকা চে গুয়েভারা। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর এক মানুষের নিথর শরীর। সামান্য খোলা চোখ তখনও স্বপ্ন দেখছিলো? ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবির পর ছবি। মৃত চেগুয়েভারা। জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আলোতিক, উল্লাস স্বৈরশাসকদের শিবিরে শিবিরে। ওয়াশিংটনে বসে থাকা মার্কিন কর্তারা শুধু অপেক্ষা করছিলো এই মানুষটি-ই চে গুয়েভারা সেটুকু নিশ্চিত হতে।

‘কি ভেবেছিলেন আপনি, অমর থেকে যাবেন এই পৃথিবীতে?’ এক সেনা কর্মকর্তা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। চে‘র শান্ত উত্তর, ‘না। আমি ভাবছি বিপ্লবের অমরত্বের কথা।’

খুন করতে হবে চে গুয়েভারাকে। ডাক পড়লো এক সেনা সদস্য মারিও টেরানের। টেরানকে সেদিন বলা হয়েছিলো চে‘র মুখ গুলির আওতার বাইরে রাখতে। উঠে দাঁড়িয়েছিলেন চে। মৃত্যুর মুখোমুখি এতো শান্ত হয়ে কেউ দাঁড়ায়! গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো টেরানের।প্রথম গুলিটা লাগে গোড়ালিতে। ব্যথায় কি একটু কুঁচকে গিয়েছিলো চে‘র মুখ?বিবরণে জানা যায় খানিকটা ভীত আর উত্তেজিত টেরান এরপর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে গুলি ছুঁতে শুরু করে। গুলিতে সেলাই হয়ে যাওয়া এক শরীর হয়তো খুব শান্ত ভঙ্গীতেই খসে পড়েছিলো পৃথিবীর মাটিতে প্রাণহীন। নয় নম্বর গুলিটা লেগেছিলো চে‘র গলায়।ঘড়িতে সময় তখন দুপুর ১.১০। চে গুয়েভারাকে মৃত ঘোষণা করা হলো। তারিখটা ৯ অক্টোবর ১৯৬৭।

মৃত্যুর আগেও ভাবছিলেন বিপ্লবের অমরত্বের কথা। কিউবায় আজো স্কুলের শিশুরা ক্লাসে বসার আগে শপথ নেয়, ‘আমরা চে‘র মতো হবো’। সেই বিপ্লবের হয়তো স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে আজকের ভোগবাদী দুনিয়ায়। কিন্তু চে গুয়েভারা ফুরিয়ে জাননি। ফুরায়নি তার আবেদন। তিনি মানুষকে শেখাতে চেয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগুন জ্বালবার কৌশল।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

ছবিঃ গুগল