আমি লায়লা খালেদ…

‘‘লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, দিস ইজ ই্ওর ক্যাপ্টেন টিডব্লিউএ ফ্লাইট-৮৪০ অ্যান্ড উই হ্যাভ বিন হাইজ্যাকড’’। ১৯৬৯ সালের ২৯ আগস্টের এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে আমেরিকার টিডব্লিউএ এয়ার লাইন্সের -৮৪০ ফ্লাইটের যাত্রীরা এমন কথাই শুনতে পেয়েছিলেন। আর ঠিক তখনই প্লেনের ককপিটের দরজায় পিন খোলা গ্রেনেড হাতে দাঁড়িয়েছিলেন আরব গেরিলা লায়লা খালেদ।
গোটা পৃথিবীতে নারী গেরিলা হিসেবে মুহূর্তেই ইতিহাস হয়ে যান লায়লা। পত্রিকার পৃষ্ঠায় আর টেলিভিশনের পর্দায় অস্ত্র হাতে তার ছবি সৃষ্টি করে আলোড়ন। শুরু হয় আলোচনা। লায়লা খালেদ ছিলেন ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর দা লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন(পিএলএফপি)’ সংগঠনের নারী গেরিলা। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে দুটো বিমান অপহরণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন লায়লা খালেদ। দ্বিতীয় বিমানটি অপহরণের সময় তিনি ধরা পড়েন। গোটা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে সেই সময়ে প্রবল আলোচিত নাম ছিলো লায়লা খালেদ। পোস্টার, দেয়ালচিত্র আর খবরের শিরোনাম এই অনিন্দ্য সুন্দরী নারী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন প্যালেস্টাইনী জনগণের মুক্তির লড়াইয়ের এক অকম্পিত শিখায়। আগামী ৯ এপ্রিল এই আলোচিত প্যালেস্টাইনি গেরিলা ৭৩ বছরে পা রাখবেন। ১৯৪৪ সালে বর্তমানে ইসরাইল অধিকৃত হাইফায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনে এবার সেই লায়লা খালেদ যিনি এক সময় বলেছিলেন, ‘সামটাইমস ইটস ওকে টু বি আ টেররিস্ট’।

লায়লা খালেদের জীবনের গল্প শুনতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে ১৯৪৪ সালের হাইফা শহরে। সেখানেই তাঁর জন্ম।আরব বাবা মায়ের সন্তান লায়লা ১৯৪৮ সালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পালিয়ে চলে আসেন লেবাননে। ১৫ বছর বয়সে যোগ দেন আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। ১৯৬৯ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পরে যোগ দেন পিএলএফপিতে। বিমান অপহরণের পর এই নারী আলোচিত হয়ে ওঠায় পশ্চিমা গণমাধ্যম ফিলিস্তিনী মুক্তি সংগ্রামে গ্ল্যামার যুক্ত হয়েছে বলে প্রচারণা চালালেও লায়লা খালেদ যে ঠিক গ্ল্যামারের ছাপে আটকে থাকা কেউ নন সেটা তিনি নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন ১৯৭০ সালে ইসরাইলের বিমান সংস্থার উড়োজাহাজ অপহরণ করে। তবে এই উদ্যোগটি সফল হয় নি। ধরা পড়েছিলেন লায়লা খালেদ। তাঁর মুক্তির দাবিতে আরব গেরিলারা আরো তিনটি বিমান অপহরণ করে। বৃটেনের তৎকালীন বিমান সংন্থা বিওএসি‘র একটি বিমান হাইজ্যাক করে তারা লায়লা খালেদের মুক্তির জন্য দরকষাকষি শুরু করে। পরিণতিতে মুক্ত লায়লা খালেদ। মুক্ত হয়ে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘‘যে কারণের জন্য লড়াই করছি তার জন্য আমি নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত আছি’’।
প্রথম বিমানটি অপহরণের আগে পিএলএফপি‘র নেতাদের কাছে তথ্য ছিলো এই বিমানের অোরোহী হবেন আমেরিকায় ইসরাইলের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আইজ্যাক রাবিন। কিন্তু বিমানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়ার পর লায়লা আবিষ্কার করেন রাবিন সেখানে নেই। শেষ মুহূর্তে তিনি প্লেনে আরোহন করেননি। প্লেনটিকে অস্ত্রের মুখে নিয়ে যাওয়া হয় দামাস্কাসে। সেখানেই সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হয়। লায়লা আর তার সঙ্গীরা ধরা পড়েন সিরিয় পুলিশের হাতে। কিছুদিন আটক থাকার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। ইসরাইলী গোয়েন্দাদের চোখে ধূলো দিয়ে এই আলোচিত নারী একেবারেই উধাও হয়ে যান। বলা হয়, তার সংগঠনই সে সময় তাকে লুকিয়ে রাখে অজ্ঞাত কোনো জায়গায়। সেখানেই তার নাক এবং চোয়ালে ছয়বার প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। মুখের আদল বদলে আবার গোপন স্থান থেকে বের হয়ে আসেন লায়লা। উদ্দেশ্য আরেকটি বিমান ছিনতাই।

মুক্ত লায়লা খালেদ

এবার ১৯৭০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর খোদ ইসরাইলের ইএল এএল নামে একটি বিমান সংস্থার প্লেন ছিনতাই করলেন লায়লা খালেদ। যাত্রী নিয়ে বিমানটি অ্যামস্টারডাম থেকে নিউ ইয়র্কে যাচ্ছিলো। কিন্তু এবার বিমানের ভেতরেই পন্ড হলো ছিনতাই পরিকল্পনা। লায়লা ধরা পড়লেন বৃটিশদের হাতে।কিন্তু গেরিলারা আরো কয়েকটি বিমান ছিনতাই করে জিম্মী নাটকের মধ্যে দিয়ে চাপ তৈরী করলো বৃটিশ সরকারের ওপর। কিছুদিনের মধ্যে আবারো মুক্তি পেয়ে মুক্ত আকাশের তলায় বের হয়ে এলেন লায়লা খালেদ। আবারো যোগ দিলেন প্যালেস্টাইনের মুক্তি সংগ্রামে।সময়ের যাত্রায় তিনি প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিতও হন।
১৯৭০ সালে ইসরাইলের বিমান ঠিনতাইয়ের সময় ধরা পড়েন লায়লা খালেদ। বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার হাতে কিছুদিন আটক থাকতে হয় তাকে। সেই সময় বিবিসি‘র পক্ষ থেকে তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এই সাক্ষাৎকারটি বহুদিন বৃটেন সরকারের গোপন তথ্য হিসেবে আলোর মুখ দেখেনি। বহুদিন পর লায়লা খালেদের সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। ‘ইউকে কনফেডেন্সিয়াল’ নামে এই পেপারটি ২০০১ সালে প্রকাশ পায়।সেই কথোপকথনের কিছু অংশ প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য।
লায়লা খালেদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো বিমান ছিনতাই কেন করেছিলেন তিনি? উত্তরে লায়লা বলেন, প্যালেস্টাইন ইস্যুটিকে গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতেই তারা বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। এতোগুলো সাধারণ যাত্রীর তো কোনো অপরাধ ছিলো না? উত্তরে লায়লা খালেদ বলেছিলেন,ইসরাইলের কারাগারে আমাদের হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে যখন ‍নির্যাতন করা হয় তখন তাদের চীৎকার কে শোনে?

ইয়াসির আরাফাত

লায়লার কাছে জানতে চাওয়া হয় ওই ছিনতাইয়ের সময় কী কী ঘটেছিলো। উত্তরে সেই গেরিলা বলেন, মোট তিনটি বিমান ছিনতাইয়ের কথা ছিলো। তার সহযোগী প্যাট্রিক ওবেলো এসেছিলো নিকারাগুয়া থেকে। লায়লা বিমানে ওঠেন দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে। ওবেলোর কাছে ছিলো পিস্তল। তারা জানতেন ইসরাইলী ওই বিমানে সশস্ত্র প্রহরা আছে। কিন্তু তারা জানতেন না ককপিটে থাকা ক্রুরাও অস্ত্র বহন করছে।
প্লেন আধঘন্টা চলার পর অস্ত্র হাতে তারা দুজন উঠে দাঁড়িয়ে ছিনতাইয়ের ঘোষণা দেন। আর তখনই বিমানের প্রহরীরা গুলি ছোঁড়ে। লায়লা গ্রেনেড হাতে চলে যান ককপিটে। সেখানে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলতে বলেন। কিন্তু তারা দরজা খোলে না। তার একটু পরেই হাতে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে মাটিতে পড়ে যান লায়লা খালেদ। দেখতে পান তার সঙ্গী গুলিবিদ্ধ। আর এক ব্যক্তি পিস্তল হাতে তার সামনে দাঁড়ানো। কেউ একজন মদের বোতল দিয়ে ওবেলোর মাথায় আঘাত করে সে সময়।
চোখ বন্ধ করার আগে লায়লা ভেবেছিলেন খেল খতম। কিন্তু তার জ্ঞান ফেরে বৃটিশ পুলিশের কাস্টডিতে। ছিনতাইয়ের আগে ভয় পেয়েছিলেন লায়লা? একেবারেই না। বরং তার ভালো লাগছিলো এমন একটি অভিযানে অংশ নিতে পেরে। ধরা পড়ার পরেও ভয় পাননি তিনি। তবে এর পরের কিছুদিন কষ্ট হয়েছিলো খুব। কিছু খেতে দেয়া হচ্ছিলো না তাকে।
তারা বিমানটিকে জর্ডানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের পর লায়লা পাইলটকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইফার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে। তিনি নিজের শহরটাকে আকাশ থেকে দেখতে চেয়েছিলেন একবারের জন্য। ধরা পড়ার পর কমরেডদের সফল পরিকল্পনায় মুক্তি পেয়ে যান লায়লা। তিনি বলেন, ‘আমরা অপহৃত বিমানের যাত্রীদেরও বোঝাতে চেয়েছিলেন কেন আমরা স্বাধীন প্যালেস্টাইনের জন্য লড়াই করছি।আমরা তাদের কোনো ক্ষতি করিনি।কোনো একজনেরও প্রাণ যায়নি।’
তার নামে গান লিখে সিডি প্রকাশিত হয়েছে।

লায়লা খালেদ এখন

তৈরী হয়েছে তথ্যচিত্র। সেই তথ্যচিত্র নির্মাতা হাইফা শহরে লায়লার পুরনো বাড়িটি খুঁজে বের করে দেয়ালের কয়েকটি পাথর নিয়ে এসে উপহার দিয়েছিলেন লায়লাকে। জূীবনে কোনোদিন আর সেই বাড়িতে ফিরে যাওয়া হবে না এই গেরিলার। অনস্ক্রিন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন লায়লা। আত্নজীবনী লিখেছেনতিনি, দেয়ালে চিত্রকর্ম হয়েছেন, পোস্টার ছড়িয়ে গেছে পৃথিবী জুড়ে তরুণদের মাঝে। লায়লা খালেদের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিলো তাঁর প্রেম নিয়ে। এখন জর্ডানে বসবাসরত এই অসম সাহসী নারীর উত্তর ছিলো, ‘আমি দেশের জন্য লড়াই করেছি। সেখানে প্রেমের কোনো স্থান ছিলো না ’
কোনোদিন মুক্ত দেশে ফিরে যেতে পারলে কী করবেন? লায়লা খালেদ জানিয়েছেন, ফিরে গেলে তিনদিন একটা গাছের তলায় শুয়ে ঘুমাবেন আর স্বদেশের মাটির ঘ্রাণ নেবেন বুক ভরে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, উইকিপিডিয়া.
ছবিঃ গুগল