আমি? সব ভালো নিয়ে নিজের মতো চলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

শিশু বয়সে বাবা যখন জানতে পারলেন আমি গাইতে পারি তখন থেকেই শুরু হয়ে গেলো বাবার নিস্তার হীন গান শেখানো। তিনি যা জানতেন খুব অল্প দিনেই তা শিখে নিলাম। বাবা খুব চমৎকৃত আবার হতাশ ও হয়তো। কারণ তার ঝুলিতে গান ছিলো অনেক কিন্তু গ্রামার ছিলো না।গান গুলো ছিলো বড়দের গান।মায়ের সেখানেই আপত্তি। রাগভিত্তিক গান চলছিলো কিন্তু যখনই বাবা “আর ডেকোনা সেই মধুনামে” ও শিমুল বন দাও রাঙিয়ে মন ” শেখানো শুরু করলেন তখনই ঘটলো বিপত্তি।মা বললেন এসব হচ্ছেটা  কি! দুধের শিশু এসব প্রেমের গান গাইবে? বাবা যুক্তি খন্ডান অনেক ভাবে। কিন্তু তাতে কাজ হয়না। তখনই আমার একজন শিক্ষক প্রয়োজন হয়ে পড়ে।আমাকে ওস্তাদ ফজলুল হক সাহেবের কাছেও শিখতে দেয়া হয়েছিলো কিন্তু তিনি একদিন বাসায় এসে আর এলেন না।যাইহোক আমি খুবই সৌভাগ্যবানদের একজন। আমার সঙ্গীত গুরু হিসেবে পেয়ে গেলাম বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী জনাব বশীর আহমেদ সাহেবকে।উনার কাছে যখন গেলাম ফরাস পাতা বিছানায় হারমোনিয়াম নিয়ে আমাকে সহ বসে নাম কুশলাদি জিজ্ঞেস করে প্রথমেই বললেন আগে যা শিখেছো সব ভুলে যাও।মনে করো গানের সঙ্গে তোমার আজই প্রথম দেখা! আমি মনে মনে বলি তা কি করে হয়! কিন্তু তা তো আমি বলতে পারিনা।ওস্তাদজীর সামনে জোরে নিঃশ্বাস নিতেও ভয় পাই।নীচে বসলে একটু পর হয়তো পা ধরে আসে বা পায়ে ঝিঁঝি ধরে তবুও পা বদলে বসিনা সেখানে কোন কথা বলার প্রশ্নই আসেনা।আমি মাথা নেড়ে আগের সব ভুলে যাওয়ার সম্মতিসূচক ভঙ্গি করে বসে থাকলাম। কিন্তু যা শিখেছি তা তো ভোলা যায়না। বাবা শিখিয়েছিলেন গানের কারুকাজের মধ্যে কেমন করে মধুর দানার মতো মোটা দানা, ভিটেবালুর মতো ঝরঝরে দানা, তুলোর মতো পেলব উড়ে যাওয়া, পিংপং বলের পড়তে থাকার শব্দ নদীর পানিতে প্রতিধ্বনির শব্দ গলায় তুলতে হয়।আস্ত আস্ত অনেক কঠিন গানই আমি তখন তুলে ফেলেছি।বাবা আমাকে ভিক্ষুকের সামনে গান গেয়ে প্রশংসা পেতে শিখিয়েছিলেন হাহাহা। সেই আমি কি করে সব ভুলি আর আমার একই সঙ্গে একটা দোষ ও গুণ ছিলো যে খুব অল্পতেই শিখে নেয়া পড়াশোনা গান সহ যাবতীয় কাজ একবার মনে গেঁথে গেলে আর তা কখনওই না ভোলা। অতএব ভোলা আর আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি কিন্তু আমি একদম সাদা কাগজের মতো সাদা হয়ে ওস্তাদজীর সামনে নাভীমূল থেকে দম নিয়ে সায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া বলেছি যতক্ষণ ওস্তাদজী দম না ছেড়েছেন।ওস্তাদজী এক সাগর সুরের সঙ্গে শেখালেন কি করে নরম অথচ স্পষ্ট করে “ড়” উচ্চারণ করতে হয়।কি করে দম আটকে অল্প খরচ করে মোমের আলোর উজ্জলতা ছড়ানো যায়।উর্দু হিন্দি উচ্চারণের বাঁক শেখালেন। ও আর বো র মাঝামাঝি না জানা অক্ষর থেকে শুরু করে উদারা মুদারা তারার উচ্চারণের তফাত, কতকিছুই না শেখালেন। শেখালেন শিল্পীর শিল্পীত জীবন কিভাবে গুছিয়ে নেয়া যায়।সবার মতো হয়েও কি করে আলাদা হয়ে ওঠা যায়।এই করে করেই ওস্তাদজীর কাছে শিখতে শিখতেই পেয়ে গেলাম জীবনসঙ্গী সঙ্গীত পরিচালক জনাব মইনুল ইসলাম খান সাহেবকে। তিনি বললেন গানে এতো কারুকাজ? কতই বয়স তোমার? যা শিখেছো তা থেকে একটু পিছিয়ে যাও!

আমার কি আর পিছিয়ে যাওয়া হয়, না আমি তা শিখেছি! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খালি সামনে যাওয়া আর সামনে যাওয়া।এর মধ্যে ক্যাসেট প্লেয়ারে উচ্চাঙ্গসংগীত, ভজন, গজল,ঠুমরী, কান্ট্রি সং থেকে শুরু করে ইন্ডিপপ কত গান যে আমি শিখে ফেলেছি! আশা ভোঁসলের নিঃশ্বাস শিখতেই তো একজন শিল্পীর কয়বার জন্ম নেয়া দরকার। সেখানে এইসব সুরের ভেলায় ভেসে ভেসে সে পথে পিছু হটা বড়ই কঠিন! তারপর ও আমি বড় দানার কারুকাজ বাদ দিয়ে মইনুল ইসলাম খান সাহেবের কথা মতো সুরের আকাশে মাঞ্জা দেয়া সুরের সুতায় খোলা আকাশে ঘুড্ডি ওড়ানোর চেষ্টা করলাম।বাতাস আমার সেই ঘুড্ডিকে কতদূরে নিয়ে গেলো যা আমি ভাবিইনি কখনও।উনার এক গানেই পনেরো বছরের বালিকা আমি ছবির গানে ডাক পেলাম যখন কিনা বাঘা বাঘা শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এর শক্তিমান তারকারা গানের জগতে সদর্পে বিচরণ করছেন! আমি সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলী ভাইয়ের ছবির গানের ডাক পেলাম। গাইতে গেলাম।আলী ভাই বললেন জীবনে একটু বেশিই শিখে ফেলেছো।এতো কিছু দরকার নেই।তুমি স -অ -অ- অ- অ-ব ভুলে গিয়ে সরল করে গাও!

তাজ্জব! সব ভোলা এতো সহজ? আমি যে খান সাহেবের সুরেলা গানের ঘুড্ডি উড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গানের উপরের প্রেম ভেতরের প্রেম প্রেমের অন্তর্গত প্রেম সহ অনেক কিছু শিখলাম! শিখলাম সুরের শিখরে গিয়ে কিভাবে “য়” “ই” “উ” ব্লক করতে হয় কিভাবে নিঃশেষ করতে হয়, কিভাবে না কেঁদেও কাঁদা যায়, কিভাবে মুখে না বলেও অভিমান বোঝানো যায় কিভাবে উল্টো মুখে দাঁড়িয়ে ভালোবাসি বলা যায়! ভুলে যাওয়া এতো সহজ? তারপর আমি কত গান গাইলাম! গাইতেই থাকলাম! কিশোরী নায়িকা, যুদ্ধংদেহী মানুষ, কামভাবাপন্ন গৃহবধু, মাতাল, আহ্লাদী বড়লোকের কন্যা, অহংকারী নায়িকা, ছ্যাঁকা খাওয়া নায়িকা, বৈরাগী বাউল শিল্পী, ভিক্ষুক, নর্তকী, ক্যাবারে ড্যান্সার ছয় বছর পাঁচ বছর চার বছরের কন্যা, বারো বছরের এতিম বালক, আশী বছরের মা, এমনকি বৃহন্নলা মানে হিজরার গান! গাইতে গাইতে এমন হলো যেন আমিই অভিনেত্রী! গানে অভিনয় আর কখনও সুরকারকে বলে দিতে হয়নি।গানের কথা পড়েই বুঝে নিয়েছি।

আজ বুঝি এইযে বাবা, ওস্তাদজী, স্বামী, এবং শ্রদ্ধেয় সব সুরকার এমনকি বয়সে ছোট যত সুরকার আছে তাদের গান, গানের কৌশল, উচ্চারণ, প্রক্ষেপণ, উপস্থাপন, স্থান কাল পাত্র সব শিখেছি। কোনকিছুই আমি ভুলিনি।যা শিক্ষনীয়, যা উপযুক্ত, যা কোয়ালিটি সম্পন্ন, যা দরকারী, যা যুগোপযোগী, যা মৌলিক সব আমি আমার শিক্ষার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছি।ভুলে যাও, মুছে ফেলো, পিছিয়ে যাও এই শব্দগুলো তাঁরা হয়তো আমাকে পরিচ্ছন্ন এবং সঠিক ভাবে তৈরি করতে ব্যাবহার করেছিলেন। কিন্তু আমারও কিছু বিবেচনা আছে, থাকে। আমি দরকার মতো দরকারী ব্যাপার গুলো আমার মনের লকারে সংরক্ষণ করেছি সযতনে। আমি ভালো কিছু কখনও ভুলিনা। আমি? সবার কাছেই আমি শিখি কিন্তু চলি নিজের মতো আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি:লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]