‘আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনি’-ঋত্ত্বিক ঘটক

ঋত্বিককুমার ঘটক বহুকাল আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনি। ছবি লোকে করে সাধারণত দু’টি কারণে-একটি খ্যাতির বিড়ম্বনা, অন্যটি অর্থাগম। এ দুয়ের কোনোটির উদ্দেশ্যেই আমার ছবি করার বাসনা নেই।’বারট্রল্ড ব্রেখটের নন্দনতত্বের ছাত্র ছিলেন তিনি। ব্রেখটিয় নন্দনতত্ত্ব সবসময়ই্ এই শিল্প মাধ্যমটির প্রতি দর্শকদের আচ্ছন্ন হতে দেয় না। বরং শিল্পের বক্তব্যের প্রতি দর্শকদের মনযোগী করে তোলে।ঋত্ত্বিক বলেছিলেন, ‘শিল্পী খুঁজে ফেরেন। কখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান, কখনও হয়তো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন না। কিন্তু দু’টো পদ্ধতিই আসলে সঠিক। শিল্পীর সার্থকতা হচেছ প্রশ্ন তোলা। মানুষকে নাড়িয়ে দেয়া। আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম। কিন্তু তা হয়ে উঠলো না, সম্ভবত হবেও না। তাতে বাঁচতে হলে বাঁচবো, না হলে বাঁচবো না। তবে ওই ভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না।’

নিজের শিল্পকে কখনোই কোলবালিশ বানাতে চাননি এই অসাধারণ চলচ্চিত্র পরিচালক। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সাল পর্য্ন্ত ধারাবাহিক ভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং ধারাবাহিক ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।ছবি মুক্তি পায়নি, সিনেমাহলে ক্ষুব্ধ দর্শক পর্দা ছিঁড়ে ফেলেছে, পত্রিকার পাতায় দিনের পর দিন লেখা হয়েছে বিরূপ সমালোচনা।দশ বছর

টানা চলেছিলো বিরতিকাল। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে পরপর দু’টি ছবি তৈরী করেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘যুক্তি তক্কো আর গল্প’। ঋত্বিক ঘটকের সেই সময়টা ছিলো ভাঙ্গন কাল। দু‘বার ঘুরে এসেছেন মানসিক হাসপাতাল থেকে।পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন তাঁর তছনছ।তারপর ১৯৭৬ সালে চোখ বন্ধ করলেন ঋত্ত্বিক ঘটক।

ক্যারিয়ারকে সারা জীবন ভাঁওতাবাজি বলে জেনেছেন। বলেছেন,‘বেদনা ও অন্ধকার সবার জীবনেই আসে। তা-ই নিয়ে যারা হারিয়ে যান তাদের মেরুদণ্ড নেই বলে আমি মনে করি। আমার জীবনেও এসব এসেছে। কিন্তু আজও আমি মাথা উঁচু করেই বেঁচে আছি। সেগুলি সম্পর্কে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প বলার অবকাশ নেই বলেই আমি মনে করি। দুঃখ-দুর্দশা না-হলে মানুষ কখনো শিল্পী হতে পারে না। আমি যা কিছু দুঃখ পেয়েছি তার দ্বারাই কিঞ্চিত মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি-অবশ্য যদি আমাকে মানুষ বলে আপনারা মানুষকুল ভাবেন। দুঃখকে ভালোবাসতে হবে। তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে পরম প্রাণ, যেটাকে খুঁজে বার করার মতো মনুষ্যত্ব থাকার দরকার বলে আমি অন্তত মনে করি।’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ নিজের পায়ে নিজের পথে

ছবিঃ গুগল