আমি সেদিন পারিনি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ছবির গানে যখন মোটামুটি পাকাপোক্ত জায়গা তৈরি হয়েছে সে সময় অনেক গীতিকার আমাকে বলেছেন আমি যেন তাদের অন্তত একটি গান ছবির গানে সংযুক্ত করার জন্য চেষ্টা করি। আমি তাদের কিছুতেই বোঝাতে পারিনা যে ছবির গানের জগৎ টাই আলাদা।এখানে আসলে বলে কয়ে কিছুই হয়না। অনুরোধ উপরোধ করে একটা অনুষ্ঠানে হয়তো কাউকে গাইবার জন্য নেয়া যেতে পারে কিন্তু ছবির জগৎ! সে বড় শক্তিমান মাধ্যম। এখানে মামা বড়ভাইয়ের অনুরোধ চলে না। আটানব্বই এর মাঝামাঝি সময়ে এক নির্জন দুপুরে বাসায় ইন্টারকম এ ফোন এলো। আমাদের কাজিপুরের গ্রাম থেকে একজন মহিলা এসেছেন। আমাদের পাড়াতো মামার ভাগ্নী।সরাসরি গ্রাম থেকে এসেছেন। বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। আমার সাহেব বললেন আসুক।গ্রাম থেকে এসেছে, এই দুপুর বেলা। ফিরিয়ে দিওনা।তিনি এলেন। বোরকা পরিহিত মাঝবয়েসী একজন মহিলা, সঙ্গে ছোট ভাই।আমি দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার, আমি কি করতে পারি।উনি একটা বিশাল ফাইল বের করে আমার হাজব্যান্ড এর হাতে দিলেন। পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবির স্ক্রিপ্ট। উনি লিখেছেন। আমার কাছে এসেছেন আমি যেন কোন ডাইরেক্টর কে দেই।উনি দাবি করছেন ওনার স্ক্রিপ্ট সুপার ডুপার হিট ছবি হবে।উনি গোটা পঞ্চাশেক স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। আমার হাজব্যান্ড কয়েক পাতা পড়ার চেষ্টা করলেন। তারপর উনাকে বোঝালেন যে এই স্ক্রিপ্ট আসলে চলচ্চিত্র বানানোর উপযুক্ত নয়।আর আগে থেকে লেখা স্ক্রিপ্ট দিয়ে এভাবে সিনেমা হয়না। কোন উপন্যাস থেকে চিত্রকল্প তৈরি করে চলচ্চিত্র হতে পারে।সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু স্ক্রিপ্ট লেখককে প্রযোজক পেতে হবে। প্রযোজক পরিচালক এর সঙ্গে সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা বসতে হবে।সেটা আসলেই উনার পক্ষে কতটা সম্ভব সে সম্পর্কেও যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যায়।উনি প্রথম খুব হতাশ হলেন তারপর গালমন্দ টাইপ ভাষায় অনেক কথা বললেন। একই গ্রামের আত্মীয় ধরনের মানুষকে আমরা ইচ্ছে করেই সহায়তা করলাম না, আমরা শুধু নিজেদেরই চিন্তা করি এমন অনেক কথা বলে উনি চলে গেলেন এবং চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে স্ক্রিপ্ট কেড়ে নিয়ে তা নেড়ে নেড়ে বলে গেলেন এই স্ক্রিপ্ট দিয়েই সুপার ডুপার হিট ছবি হবে এবং তাতে একটাও কনকচাঁপার গান থাকবেনা। আমরা রাগতে গিয়েও থেমে উনাকে হাসিমুখেই বিদায় দিলাম। এর কিছুদিন পরে আমি আবারও একই ধরনের বিপদে পড়লাম। না, ঠিক বললাম না।আমি অনেক বড় কষ্টে পড়লাম। স্ক্রিপ্ট বিষয়টা উটকো ঝামেলা ছিলো কিন্তু এবার খুব আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম।ছোট বেলায় ( ওস্তাদজী জনাব বশীর আহমেদ সাহেবের কাছে গান শেখার আগে) আব্বার কাছে আমাদের সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার তিন গান পাগল মানুষ আসতেন। তারা গানের সুত্রে তিন বন্ধু।জালাল ভাই, মেসের ভাই আর তোফাজ্জল ভাই।তারা তিন তরুণ গান গেয়ে শিল্পী হবার স্বপ্নে বিভোর। শিল্পকলা একাডেমিতে তাদের নিয়মিত যাতায়াত। পাড়ার অনুষ্ঠানে তারা গান গান।তোফাজ্জল ভাই মেসের ভাই রেডিও বাংলাদেশেও গান গান।আর জালাল ভাই ওস্তাদ ফজলুল হক সাহেবের পিছু পিছু ঘুরঘুর করেন উচ্চাঙ্গসংগীত শেখার উদ্দেশ্যে। তারা তিনজনই আমাকে কিছু কিছু গান শেখান।জালাল ভাই আমাকে রাগ ভায়রো আর ঠাট বিলাবল শেখালেন।তোফাজ্জল ভাই শেখালেন ঐ জলকে চলে লো কার ঝিয়ারি, মেসের ভাই শেখালেন মুসাফির মোছ এ আঁখি জল।এভাবে তাঁদের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হলো। কালের প্রবাহে সে সম্পর্ক ফিকেও হয়ে গেলো।শুনলাম জালাল ভাই কানাডা থাকেন। তোফাজ্জল ভাই রাজশাহী রেডিওতে গান করেন। মেসের ভাইকে আর কখনও দেখিনি।যাইহোক। ঠিক একদিন দুপুর বেলা তোফাজ্জল ভাই আসলেন আমাদের বাসায়। ঠিক ওইদিন আব্বা আম্মা রত্নাপা সবাই আমার বাসায়। এক উৎসব মুখর পরিবেশে আমরা সময় কাটাচ্ছি।তোফাজ্জল ভাই তার ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম।এরপর তোফাজ্জল ভাই কথা তুললেন। বললেন কনক,তোমাকে আমি পয়লা গান শিখিয়েছি,সেই দাবি থেকেই আমার একটা আর্জি,একটি সিনেমায় আমি তোমার সঙ্গে ডুয়েট গান গাইবো।তুমি আমাকে না করতে পারবেনা!আমি আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম। তোফাজ্জল ভাইয়ের তখন আর না হয় পঞ্চান্ন থেকে ষাটের কাছাকাছি বয়স। সিনেমার গানে একদম টনটনে কন্ঠ ছাড়া কোন রকম কন্ঠের স্থান নেই।সেখানে উনি ডায়াবেটিক রুগী। কথাই ঠিক মতো বলতে পারছেন না।তাঁকে আমি যে বলবো দেখি চেষ্টা করে এই বাক্যটাও শান্তনা স্বরূপ বলতে পারছিনা।কারণ মিথ্যা শান্তনা দেবো,উনি আশায় আশায় থাকবেন তারপর? আমি উনার সামনে থেকেই চলে ঘরে এসে কাঁদতে লাগলাম। আমার হাজব্যান্ড আবারও উনাকে ধীরে ধীরে খুব সুক্ষ্মভাবে বোঝাতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পরে আমাকে ড্রইংরুমে ডাক দিলেন আমার সাহেব। বললেন এদিকে এসো।তোফাজ্জল ভাই চলে যাচ্ছেন। তোফাজ্জল ভাই আমার মাথায় হাত দিয়ে অনেক দোয়া করলেন এবং বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।আমি সেইদিন সারা সন্ধ্যা কেঁদে কেঁদে পার করলাম। এরও মাস ছয়েক পরে ঠিক এমনই আরেকটি দিন এলো আমার সামনে।

আমার দাদাভাই এর গানের কন্ঠ ছিলো এবং সেখান থেকেই আব্বা অপূর্ব সুমধুর কন্ঠ পেয়েছিলেন। কিন্তু ছোট বেলাতেই বাবাহীন এতিম বালকের আর গায়ক হওয়া হয়ে ওঠেনি। সে অন্য উপাখ্যান। আমার নানাবাড়িতে গানের চল ছিলো। আমার বড় খালা খুব সুন্দর করে নিলুফার ইয়াসমিন এর গান গাইতেন। কিন্নর কণ্ঠে কিন্তু তাতে আমাদের বেবী নাজনীন এর ঝাঁঝ।দারুণ কণ্ঠ ছিলো তাঁর। সবার ছোট ফজলে আনোয়ার মিন্টু মামা গাইতেন জগন্ময় মিত্রের গান।তুমি আজ কতদূরে, এমনও শারদ রাতে সাতটি বছর পরে। সাত বছর পরে আর আগের গল্পে চাঁদের আলোয় মিন্টুমামার সুমধুর কণ্ঠ আমাকে অনেক দূরে নিয়ে যেতো।কালো বার্নিশ করা জার্মান জুবলী সিঙ্গেল হারমোনিয়াম ছিলো। তা একটা ছাপবাক্সের উপর ফুলতোলা কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকতো। কেউ গাইবার জন্য বিছানায় নামালে আমি হারমোনিয়ামের বেলো না খুলেই সাদাকালো রীডের উপর ছোট ছোট আঙুল দিয়ে খেলতাম। তখনও আমি জানতাম না আমি গাইতে পারি কিনা,কোনদিন আমার একটি হারমোনিয়াম হবে কিনা।কি এক দুর্নিবার আকর্ষনে আমাদের জন্য নানীবাড়িতে রেখে দেয়া খেলনা ফেলে হারমোনিয়ামের দিকেই লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থাকতাম।কিন্তু মনে কি অনুভূতি জাগতো তা এখন আর মনে পড়েনা।

ধীরে ধীরে গানের প্রবল জোয়ার এলো। জীবনে শুধু গান আর গান।মিন্টু মামা ও আব্বা ছিলেন আমার গানের বড় ও প্রধান ভক্ত।যদিও এ দাবী (আমার বড় মামা) আজিজুল বারী নান্নু মামাই করার অধিকার রাখেন কারণ তিনি শুধু ভক্ত নন, রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করা ছাত্র অবস্থাতেই তিনি আমার গান শেখানোর জন্য তার টিউশনের টাকা দিয়ে আমার আব্বার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।না হলে হয়তো আমার শিল্পী জীবন তৈরিই হতো না।

মিন্টু মামার যত বন্ধু সবই গানসংক্রান্ত।যে গাইতে পারে,ঘন্টার পর ঘন্টা শুনতে পারে তারাই মিন্টুমামার বন্ধু হবার যোগ্যতা রাখে।তাদের মধ্যে অন্যতম একজন বেলাল মামা।বেলাল মামার পানির মতো তরল কণ্ঠ।যা গান তাই ভালো লাগে।পেশাদার কাপড়ের ব্যবসায়ী কিন্তু মন পড়ে থাকে গানের ভেতর। সন্ধ্যাবেলায় ধুনুট বাজারে তাঁর কাপড়ের দোকান শুধু গানের নেশাতেই আগে আগে বন্ধ হয়ে যায়!

সেই বেলাল মামাকে নিয়ে মিন্টু মামা এলেন আমার বাসায়। বেলাল মামা গান কে পেশা হিসেবে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতে চান।আমাদের কি অভিমত জানতে এসেছেন এবং অবশ্যই ভাগ্নী হিসেবে কিছু দাবি তাঁর থাকতেই পারে।এবার আমি মুখ খুললাম।বললাম মামা, আপনার বয়স এখন আর না হলেও পয়ঁত্রিশ, ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা এখন কত স্টাইলিস্ট আপনি ও জানেন। তারা সবাই জীবনের পয়লাতেই এই গান পেশা করে নিয়েছে। এই বয়সে এসে উপশহরের বেশভূষা চালচলন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবকিছু ঠিকঠাক করে গানের প্রধানতম শাখায় গিয়ে জায়গা করে নেয়া অনেক কঠিন। তারচেয়ে আপনি বরং রেডিও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে অডিশন দেন।অবশ্যই আপনি টিকবেন। তারপর যখন যখন ডাকবে আপনি ওখান থেকে এসে গাইবেন। সেটাই বরঞ্চ ভালো হবে।ঢাকা থেকে বাসাভাড়া নিয়ে বউবাচ্চা নিয়ে গান কে প্রধান পেশা হিসেবে নিয়ে জীবন চালানো আর চোখ বন্ধ করে মাঝরাস্তায় দাড়িয়ে জীবনজুয়ায় অংশগ্রহণ একই কথা। আপনি আরও আগে এই চিন্তা করতে পারতেন। অনেক দেরি হয়ে গেছে মামা।এরচেয়ে আপনি মনের সুখে নিজের বাড়িতে বসে গান এটাই ভালো আর সবাইকে গান বিক্রি করতে হবে এমন কোন কথা নাই।আর এই যে আমি পেশাদার শিল্পী আর আপনি সৌখিন শিল্পী, আমরা কি কেউ আসলেই জানি দু’জনের মধ্যে কে আসলে সুখী? সুখ ব্যাপারটা খুবই আপেক্ষিক তাইনা মামা!

বেলাল মামা বললেন ঠিকই বলেছো মা।তোমার কথা গুলো খুবই দামী। আমি আগে এভাবে ভেবে দেখিনি।মামা চলে গেলেন।আমি উপর থেকে উনার প্রস্থানের পথে ভেজাচোখে তাকিয়ে থাকলাম।

আমি তখনও ভাবি এখনো ভাবি গান কে পেশা হিসেবে নেয়ার অবস্থা, সম্মান আমাদের দেশে তখনও ছিলোনা এখনো নাই।আমার নিজের দুই সন্তান! তারা অনেক ভালো গায়,গান তাদের রক্তে।কত শিল্পী কত ছাইপাঁশ গেয়ে তথাকথিত স্টার হয়ে আছে সবকিছুই আমাদের নজরে আছে অথচ ঘুনাক্ষরেও আমরা শিল্পী দম্পতি একবারের জন্য ও ভাবিনি তাদের এই পেশায় নিয়ে আসবো। এনিয়ে আমাদের কোনদিনও একবারের জন্য ও একফোঁটা দুঃখ হানা দেয়নি। কিন্তু বাইরে থেকে এই জগৎ দেখে যারা প্রদীপের পায়ে নিজেকে সমর্পণ করতে জীবন উৎসর্গ করার জন্য আমার কাছে সহযোগিতা চেয়েছে আমি ইচ্ছে থাকা সত্বেও আসল চিত্র জেনে যাওয়ার জন্য তাদের কোনরকম সাহায্য সহযোগিতা করতে পারিনি।আমি আবারও বলি,আমি ইচ্ছে থাকা সত্বেও পারিনি। বারবার আমি হেরে গিয়েছি এইসব স্বপ্নীল ইচ্ছের বাতির নীচের প্রকট অন্ধকারের নিমজ্জিত ভয়াবহতার কাছে।

কাভার ছবি: জুওয়াইরিয়া ইসলাম

ভেতরের ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]