আমি স্বপন পারের ডাক শুনেছি

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আমি, আমার জীবনসঙ্গী মিলেমিশে আমার খুব ছোট একটি সংসার চলছিলো। টিভিতে গাইছিলাম। রেডিওতে ও গাইছিলাম। মঞ্চানুষ্ঠান ও হচ্ছিলো।ছেলে আমার দুই বছর পার করে দিলো।কিছু পয়সা জমিয়ে মাশুকের আকিকা দেরিতে হলেও করলাম,সঙ্গে জন্মদিনও।দু’য়েক সময় মেহমান আপ্যায়ন ও করছি। নিজেরাও বেড়াই, কখনো মনে হয়না দারিদ্র্য আমাদের সঙ্গে একাট্টা হয়ে লেপ্টে আছে! থাকি শশুর-শাশুড়ির সঙ্গে। তাঁরা অসম্ভব ধৈর্যশালী মানুষ। ছোট দেবর বুয়েটে পড়ছে। অসম্ভব মেধাবী সেই মানুষটিও দারুণ কষ্ট করে পড়াশোনা করছে।সব কিছুই আমার খুবই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। কারণ এমন সংগ্রামের সঙ্গে আমি আজন্ম পরিচিত। একজন শৌখিন গীতিকার একটি অডিও ক্যাসেট এর জন্য এলেন। আলাপ আলোচনা শেষে সেই ক্যাসেটের কাজ শুরু করলাম। সেই ক্যাসেট এর পয়সা দিয়ে একটি ফ্রিজ (স্বপ্ন) কিনলাম। নিজে দোকানে গিয়ে একটি ফ্রিজ ও একটি ডাবল ক্যাসেট প্লেয়ার কিনলাম। সে কি উত্তেজনা। কিনতে যাওয়ার আগের দিন তো বলা যায় ঘুমই হলো না।পরদিন ফ্রিজ কিনবো বিকেলে, দুপুরেই রেডি হয়ে বসে আছি।রওয়ানা দিতেই শুনি বায়তুল মোকাররম বন্ধ। আহা,কি সাগরে পতিত হলাম, যাইহোক পরদিন আর তর সইলোনা, সকাল সকালই বায়তুল মোকাররম চলে গেলাম।পছন্দ করে কচি কলাপাতা রঙের একটি মাঝারি সাইজের রেফ্রিজারেটর ও ক্যাসেট প্লেয়ার কিনে আনলাম। আনন্দে ঘুম নাওয়া-খাওয়া সব মাথায় উঠলো।একি কম আনন্দের কথা? নিজেদের মাছ গোস্তো যেমন তেমন মাশুকের কচি মুরগী, কিছু ফল ব্লেন্ড করা খাবার রাখি বড় জায়ের ফ্রিজে, ননাস লিপি আপার ফ্রিজে।তাঁরা খুশি হয়েই রাখতে দেন কিন্তু কিছু অস্বস্তি তো থাকেই।ভাবতেই পারছিলাম না যে আমাকে আর অন্যের দরোজায় যেতে হবেনা! কি আনন্দ কি আনন্দ! আল্লাহ এতো সুখ ও আমার কপালে রেখেছেন! কিন্তু একি! ফ্রিজের পানি কোক খাবার কিছুই খেতে পারছি না। খাওয়া তো দূরের কথা! ফ্রিজের দিকে তাকাতেই পারছিনা।এমনকি পত্রিকায় ফ্রিজের ছবি দেখেও বমি হচ্ছে হড়হড় করে! তাজ্জব, আবারও মা হচ্ছি! আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। মাশুক গর্ভে আসলে খাওয়া দাওয়া নিয়ে কোনও কষ্ট হয়নি।কিন্তু এবার তো একদম নাজেহাল হয়ে গেলাম। প্রায় মাস ছয়েক শুধু ভাত পানি কাঁচামরিচ দিয়ে মেখে ভাত ছেকে ফেলে দিয়ে পানিটুকু চুমুক দিয়ে খেতাম। আর খেতাম শামুক শামুক একটা চিপ্স, সবুজ প্যাকেটে থাকে। এই ছিল আমার খাবার। কি ভয়ংকর কষ্ট মা হওয়া, দ্বিতীয় বার বুঝলাম। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছি, পেট ছাড়া আর কিছু দেখা যায়না। ঠিক এই সময় আমার হাজব্যান্ড একটা মোটর বাইক কিনলেন। সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে রাতে যখন বাড়ি ফিরতেন তখন বাইকের গন্ধ উনার চুলে মাথায় মেখে আসতেন। উনাকে দেখেই আমার সেই হড়হড় করে বমি! বেচারা আমি না ঘুমানো পর্যন্ত বারান্দায় বসে থাকতেন। আমি ঘুমালে উনি ঘরে ঢুকতেন।কি ভয়াবহ পরিস্থিতি। এভাবে প্রতিটি বাবা মায়ের বাবা-মা হওয়ার ব্যাক্তিগত আনকোরা গল্প থাকে। অনেক সময় সেই গল্প কেউ জানেনা দেখেনা,কেউ মানসিক আর্থিক সামাজিক সাহায্য পায়না। শুধু দুইজন আরেকটি মানুষ তৈরির খেলায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেন। মাস ছয়েক গেলে আমার খাওয়াদাওয়া অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো। উনাকেও সহ্য হয়ে গেলো। আমরা বাসা বদল করে শান্তিনগর থেকে মাদারটেক চলে গেলাম।ওদিকে বাসাভাড়া কম, আবার আমার মায়ের বাড়িও কাছাকাছি। এই প্রথম আমি আমার একটা সংসার পেলাম। এতো দিন বড় ভাশুরের বাসায় সাবলেটের মত ছিলাম। এখন আমার বাসায় নিজস্ব রান্নাঘর, নিজের বাথরুম, ড্রইংরুম পেলাম। ড্রইংরুম কিচেন নিজেদের বেডরুম নিজের মত করে সাজালাম।হোক তা মধ্যবিত্ত স্টাইলে। তাতে কি,আমি তো মধ্যবিত্তই। গর্ভবতী আমি আবার বাড়তি খাবার খাওয়া শুরু করলাম। আরেকটি শিশুর আশায় এই এতোদিনে আয়েশ করে স্বপ্নে বিভোর হলাম।জীবন বড়ই সুন্দর হয়ে উঠলো। মনে হলো স্বপ্ন আমাকে ডাকছে, আয় আয় আয়।

খুবই সাধারণ ভাবে কোন জটিলতা ছাড়াই আমি আবারও মা হলাম।সন্তান হওয়ার পর যখন শুনলাম কন্যা সন্তান হয়েছে তখন আবেগে অঝোরে কাঁদছিলাম। পাশের বিছানায় রুগীর মা আমার মাকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার মেয়ে কান্দে কেন? কি সন্তান হইছে? আম্মা কিছু না বুঝেই উত্তর দিলেন কন্যা সন্তান। মহিলা তখন বললেন কানবেই তো, মেয়ে হইলে কানবে না? আমার মেয়ের এইবার দিয়া পাঁচটা মেয়ে হইলো।মেয়ে, জামাই, মেয়ের শশুরবাড়ির ব্যাবাক উলু দিয়া কান্তেসে! আম্মা স্তম্ভিত, কি করে উনাকে বোঝান যে তাঁর কন্যা একটি কন্যা সন্তান পাওয়ার আবেগে খুশিতে আনন্দে কাঁদছে! আব্বা আমার কান্নায় হতবাক, পরে সব শুনে মৃদু ধমক দিলেন কান্না থামাতে।আব্বা বললেন খুশিতে কাঁদুক কিন্তু মানুষ যে ভুল বুঝছে! তোমার মেয়েকে থামতে বলো! হাহাহাহা। বাচ্চা নিয়ে বাসায় গিয়ে মনে হলো দুনিয়া জয় করেছি। আমার নিজের একটি কন্যা সন্তান! আল্লাহ আমাকে দিলেন। কন্যাকে কোলে নিয়ে দুপুরের রোদে বসি, লম্বা লম্বা আংগুল, লম্বা হাতপা, নিখুঁত চোখ নাক মুখ,মাথায় কোঁকড়াচুল। এই মেয়ে আমার…? আমার বিশ্বাস হয়না।মাশুক ছিলো ঘিয়ের পুতুল, আর এইটা গোলাপি বারবি! গোলাপি গোলাপ।আবার মানুষের এক কথা! এই বাচ্চা কই থেকে আসলো! মনে মনে মুণ্ডুপাত করি আবার। যাইহোক। আবারও গান ভুলে বারবির প্রেমে যত্নে মজে গেলাম। দ্বিতীয় বার মা হিসেবে পরিপক্ব হয়ে উঠছিলাম। একা একা গোসল করানো কাপড় বদলানো পারছিলাম। মাশুক কি বিস্ময় নিয়ে বোনকে আদর করতো! আমাদের ঘর যেন স্বর্গ হয়ে গেলো।আমার মনে হচ্ছিলো আমি সকাল বিকেল রাত স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি।জীবনে এতো সুখ কল্পনাও করিনি।আমি স্বপনে ডুবে স্বপনে ভাসতে থাকলাম।আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে