আরাবল্লির পল্লব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): আরাবল্লির কথা প্রথম শোনায় পল্লব। পল্লব বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসেছিলো কোনও এক অজ্ঞাত কারণে। বলেনি কখনও। তবে খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে বলেই মনে হতো। কথা খুব কম বলতো। বাচ্চাদের পড়াতো বলে পাড়ায় নাম ছিলো মাস্টার’দা। দু’হাজারের বন্যার সময় একটা রসগোল্লা তৈরীর কারখানায় খাতাপত্রের কাজ করতো। তারপর দুম করে চলে যায় কোথায়! দু’বছর কোনও যোগাযোগ নেই। হঠাৎ একদিন ফোন, জম্মু থেকে। অবাঙালী টানে জ্যায় বলে ফোনে ডাকলো কে! পল্লব। এখন জম্মুতে রসগোল্লা তৈরীর কাজ করে। আবার দু এক বছর কোনও খবর নেই। একদিন ফোন আসলো যোধপুর থেকে। কোনও হোটেলে আছে।

একবার রাজস্হান থেকে ফিরছি। আমি আর সুজিত। দু’হাজার চার পাঁচ হবে। যোধপুর-হাওড়ায় পল্লবের সঙ্গে দেখা, জয়পুর ষ্টেশনে। হাতে একটা টু টায়ারের ওয়েটিং লিস্ট টিকিট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ দেখা হয়ে সে কি আনন্দ! পল্লব তখন আরাবল্লির পেটের ভিতর অরণ্যবাস বলে একটা রিজর্টের ম্যানেজার। বললো, এবার রাজস্হান আসলে এসো। পাহাড়ের মধ্যে জঙ্গল চিরে ঝর্ণা চলে গেছে। চিতাবাঘ আসে জল খেতে। সবচেয়ে মজার কথা কোনও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। আরাবল্লির গল্প শুনতে শুনতে সেবার হইহই করে সময় চলে গেলো।

পরে পল্লবের কাছে গেছি। আমি আর জীবন’দা, মোটর সাইকেল নিয়ে। মার্বেল মাইনস এর মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পাহাড়ি রাস্তা। ছবির মত। সেই রাস্তা ধরে যেতে যেতে যেতে যেতে লেক পেরিয়ে কেল্লা পেরিয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে পল্লবের অরণ্যবাস। ওর ভালবাসায় মুগ্ধ হয়েছি। রিজর্টের সবাই পল্লবকে কত ভালবাসে! সম্মান করে। ওকে সবাই বাসু বলে ডাকে। বাসুজি। জ্যোতি বসুর জনপ্রিয়তা তখন পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে আরাবল্লির অন্তরেও।

পল্লবের জীবন তারপর নানান দিকে গড়িয়েছে। উদয়পুর থেকে ও চলে যায় ভাইজাগ। সেখানে একটা ভাল রেস্তোরার শেফ হয়ে যায়। আবার বহুদিন যোগাযোগ নেই। তারপরে চেন্নাই থেকে ফোন আসে। কষ্টে আছে। পরে আবার রাজস্হান চলে আসে। আরাবল্লির আর এক প্রান্তে একটা বড় লেকের সামনে একটা রিজর্টের ম্যানেজার হয়ে। ঝাড়োল। পল্লবের আহ্বানে কয়েকবার গেছি ওখানে। ওরকম খাতির জীবনে কোথাও পাইনি।

পল্লবের জীবনের ঘটনা বলে শেষ করা যাবে না। এত বৈচিত্র জীবনে। তাও তো প্রথম জীবন সম্বন্ধে কিছুই জানিনা প্রায়। স্মৃতি ঘন থাকতে থাকতে বলে ফেলতে হবে সে গল্প। অরণ্যবাসে থাকার সময় কাছাকাছি একটুখানি জায়গা কিনে রেখেছিলোু পল্লব। আরাবল্লিতেই থেকে যাবে সে। পৃথিবীতে আর কোনও আশ্রয় ছিলো না তার। বাবা মা ভাই বন্ধু প্রেমিকা কেউ না। রাস্তায় তৈরী হওয়া বন্ধুর মত, দাদার মত কিছু সম্পর্ক ছিলো শুধু সঙ্গে। তাতেই ও স্বপ্ন দেখতো একদিন বিল গেটস্ হবে।

পল্লব চলে গেছে। আরাবল্লিতেই হারিয়ে গেছে কোথাও। পৃথিবীতে কেউ জানতেই পারেনি সেদিন। জানার মত কে কে ছিল সেটাও কেউ জানতো না। তা না হলে এরকম একটা তারকার মৃত্যু অনেক অশ্রু নামিয়ে আনতো আরাবল্লির আনাচে কানাচে।

আমি এখন আরাবল্লি গেলেই এলোপাথাড়ি ছবি তুলি। রাস্তার উপরে মেঘের ছবি, পাহাড়ের জঙ্গলের মানুষের ছবি। খচাখচ তুলে রেখে দিই পরে ভালো করে দেখবো তাই। যদি কোনও মেঘের মধ্যে, জঙ্গলের সবুজে বা মানুষের মুখে পল্লব বেরিয়ে আসে!


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box