আরেক হারানো সুর ক্যাসাব্লাঙ্কা

প্রথমে ঠিক হয়েছিল আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও অভিনেতা রোনাল্ড রিগ্যান মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন সিনেমায়। শেষে সুযোগ পেলেন হামফ্রে বোগার্ট। পৃথিবী কাঁপানো অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যানও কিন্তু পরিচালক আর প্রযোজকদের পছন্দের প্রথম তালিকায় ছিলেন না। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রথমে চিন্তা করা হয়েছিল হাসির গল্প নিয়ে সিনেমাটি হবে। হয়ে গেল প্রেমের অসাধারণ এক চলচ্চিত্র। নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পারছেন এতোক্ষণে বলছি ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ ছবিটির কথা। নির্মাণের ৭৫ বছরে পা রাখলো কালজয়ী এই সিনেমাটি।

আজও পৃথিবীর সেরা দশটি প্রেমের ছবির তালিকায় এক নম্বর আসনটি দখল করে আছে ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’। ছবিটির গান, ভালোবাসার বেদনা, হারানো প্রেমের সুরভি সব মিলিয়ে যেন এক ভালোবাসার হারানো সুর।

পেরিয়ে আসা ৭৫ বছরে ক্যাসাব্লাঙ্কা নিয়ে চলেছে অনেক গবেষণা। ছবিটির মূল সুর কিন্তু বিচ্ছেদ। পৃথিবীতে তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তান্ডব। গল্পের নায়ক রিক প্যারিসে হারিয়ে ফেলে ভালোবাসার মানুষকে। কয়েক বছর পর আবার চারচোখের মিলন হয় ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরে। প্রেক্ষাপট সেই বিশ্বযুদ্ধ। সেখানেও রিক আবার হারায় প্রেমিকাকে। তখন সেই প্রেমিকা হাঙ্গেরির হিটলার বিরোধী গেরিলা বাহিনীর নেতা। মনস্বত্ত্বিকরাও আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন এই ছবির ভাঙ্গা প্রেমের জনপ্রিয়তার কারণ। তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু ক্যাসাব্লাঙ্কা এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

ক্যাসাব্লাঙ্কা ছবির প্রথম নাম ঠিক হয়েছিল ‘এভরিবডি কামস টু রিক’। অদ্ভূত নাম! হয়তো এ নামে ছবিটি দর্শক-প্রিয়তার শীর্ষে উঠতেও পারতো না। দুই চিত্রনাট্যকার ফিলিপ এবং জুলিয়াস এপস্টেইম হাসির গল্পের প্লট মাথায় নিয়ে চিত্রনাট্য লিখতে বসেন। কিন্তু পরিচালক মিচেল ক্রুজ পছন্দ করেন না গল্প। কারণ তিনি রোমান্টিক কমেডি তৈরী করতে চান নি। হিটলার বিরোধী ছবির জন্য কলম ধরলেন কেসি রবিনসন। যুদ্ধ বিরোধী গল্পে প্রধান হয়ে উঠলো রাজনীতি, প্রেম আর বিচ্ছেদের চির রোমান্টিক সুর। ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই হলো ক্যাসাব্লাঙ্কার।

ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন বিখ্যাত অভিনেতা হামফ্রে বোগার্ট। তখন পর্যন্ত তিনি এ ধরণের রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করেননি। ক্যিাসাব্লাঙ্কার শ্যুটিং হয়েছিল যুদ্ধ চলাকালে। বোগার্ট তখন বেশ নার্ভাস থাকতেন। শ্যুটিংয়ের সময় দাবা খেলতেন আর চরিত্রটির ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করতেন।

ছবির নায়িকা ইনগ্রিড বার্গম্যান। এলসা নামে এই চরিত্রে তার অভিনয়ের কথা সিনেমা দর্শকরা মনে রাখবেন সারা জীবন। যদিও ছবিটি অস্কার পুরস্কার পেলেও বার্গম্যানের কপালে পুরস্কার জোটেনি। তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, এই ছবিতে তিনি বোগার্টকে অন-স্ক্রিন চুমু খেলেও তার সঙ্গে তেমন পরিচয়ই ছিল না। কিন্তু পর্দায় দুজনের অনবদ্য অভিনয় কিন্তু সে কথা একবারও মনে হতে দেয় নি দর্শকদের।

এই ছবিতে এলসার স্বামীর চরিত্রে প্রথমে অভিনয় করতে চান নি অভিনেতা পল হ্যানরাইড। শেষমেশ একটি শর্তে তিনি রাজি হন অভিনয় করতে। শর্তটি ছিল সিনেমার অন্তিমে নায়িকাকে তার সঙ্গে যেতে হবে। পরিচালক রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ছবির গল্প শেষ পর্যন্ত জয়ী করেছে মূখ্য চরিত্রকেই। তাই আজো হামফ্রে বোগার্ট ভিন্ন মাত্রা দাবি করেন এই ছবিতে। রুক্ষ, সাহসী, দয়ালু এই চরিত্রটিই ছাপিয়ে উঠেছে সবাইকে।

‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ সেরা ছবি, সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্য-এই তিন বিভাগে অস্কার পুরস্কার জিতে নেয়। ১৯৪৩ সালের ২৩ জানুয়ারী ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ আমেরিকায় মুক্তি পায়।

মনসুর রহমান

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল