আর চোখের জল ফেলে লাভ কি আপা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শারমিন শামস্

কলেজে আমার খুব প্রিয় একজন টিচার ছিলেন। ইকোনমিকস পড়াতেন। আমি কলেজের পর উনার বাসায় পড়তে যেতাম ব্যাচে। মিস তখন নিজের জীবনের অনেক গল্প করতেন।

অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল বাসা থেকে। হাজব্যান্ড ছিলেন আর্মি অফিসার। স্ত্রীর পড়ালেখা করা তার পছন্দ ছিলোনা। তিনি চাইতেন বউ সংসার করবে, অফিসার্স পার্টি এটেন্ড করবে, বাচ্চা জন্মাবে, মানুষ করবে, আত্মীয় স্বজনের মন রাখবে। কিন্তু বউয়ের যে নিজের কোন চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে, বউয়ের যে ক্যারিয়ার গড়ার আছে, সেটি তার চিন্তা চেতনার থেকে সহস্র মাইল দূরে ছিলো।

তো, ধরি তার নাম শাহানা, শাহানা পড়তে চাইতেন। জোর করে পড়ালেখা করতেন। এজন্য স্বামী তাকে যত ধরণের যন্ত্রণা দেয়া সম্ভব সব দিতেন। বাচ্চাও হয়ে গেয়েছিলো। বাচ্চা পালতে হতো একাই। কারণ জামাই তার অফিস ও সামাজিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে বউয়ের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার আগের রাতে অফিসের পার্টি। না, কোন ছাড় নাই। পার্টিতে যেতেই হবে। শাহানা যেতেন। মধ্যরাতে ফিরেই স্বামী লাইট অফ করে শুয়ে পড়তেন। শাহানা তখন বাথরুমে ঢুকতেন বই হাতে। বাথরুমে বসে বই পড়ে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স করেন। পরে চাকরি পান ঢাকার সবচেয়ে নামকরা কলেজের একটিতে। সেই চাকরি করা নিয়ে কম ভুগতে হয়নি। কিন্তু কোনভাবেই আপোষ করেননি।

একজন আমার সঙ্গে তার মনের কষ্ট শেয়ার করেছিলেন। তার স্বামীকে সবাই উদার মানুষ হিসেবে জানেন। তিনি আসলেই সজ্জ্বন। কিন্তু স্ত্রীর পড়ালেখা বা ক্যারিয়ার তার সহ্য হতো না। তারা মফস্বলে থাকতেন। স্ত্রীর ভাল চাকরির অফার আসলেই তিনি এর নানা ধরনের খুঁত খুঁজে বের করতেন এবং হুমকি দিতেন রাজধানীতে গিয়ে চাকরি করা যাবে না। স্ত্রী মেনে নিতেন। কারণ রাজধানীতে চাকরি করার অনুমতি শেষ পর্যন্ত দিলেও সেই উদার স্বামীটি বলে দিয়েছিলেন, তাদের আলাদাই থাকতে হবে এবং কোন সন্তানকে সঙ্গে নিতে দেবেন না। অথচ সন্তানরা তখন নেহাতই দুধের শিশু। এভাবে মায়ের কাছ থেকে শিশুকে আলাদা রাখার হুমকি দিয়ে ভাল চাকরি থেকে বিরত রাখা হতো তাকে।
শেষ পর্যন্ত মহিলা সেই মফস্বলেই কোন রকম একটি চাকরি যোগার করেন এবং চাকরি করেন। যদিও ভীষণ মেধাবী ছিলেন, অনেক ভাল জায়গায় যাবার সম্ভাবনা ও প্রতিভা ছিলো তার, হয়নি। কিন্তু তিনি চাকরি করেছেনই। নিজে আয় করেছেন। এক্ষেত্রে যেভাবেই হোক আপোষ করেননি।

যেসেব মেয়েরা আমাকে তাদের দুঃখের কথা বলে, বিশেষত যারা পারিবারিক নির্যাতন, লাঞ্ছনা কি বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, তাদের জিজ্ঞেস করি, চাকরি বা ব্যবসা করেন?
উত্তর আসে, না।
পড়ালেখা?
আইএ পাশ। আর পড়তে দেয়নি।

এরপর তাকে আর কী বলবো জানি না। সে তো ঠেকে আছে শুরুতেই। দশ বছরের সংসার, দুইটা বাচ্চা, স্বামীর উপর নির্ভরশীল প্রতি পদে – এই মেয়ের সমাধান কী করবো?

প্রথমত, নির্ভলশীল বলেই আপনি আজ এভাবে অবহেলিত। পড়ালেখাও যথেষ্ট করেননি। ফলে সংসারে আপনার ভয়েসই প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

দুই, এত অত্যাচারের পরও আপনাকে কীভাবে বলবো বেরিয়ে আসুন কি মুক্তি নিন! আপনাকে খা্ওয়াবে কে? পরাবে কে? আপনি তো নির্ভরশীল ওই লোকের ওপরই যে আপনাকে দু’বেলা জুতো মারছে।

এসব ক্ষেত্রে মেয়ের বাপের বাড়িও পাশে থাকে না। ফলে সেখানেও যাবার উপায় নেই। বাপের বাড়ির হয়তো সামর্থ্যও নেই মেয়েকে বাচ্চাসহ পালার। ফলে সব পথ বন্ধ। মামলা করে, দেনমোহরের টাকা আদায় করে আর কয় বেলা? কয় বছর চলতে পারবেন? আর সবাই তো সেটাও উদ্ধার করতে জানেনা। অনেক মেয়ে জানেই না যে মানবাধিকার সংস্থা বলে কিছু আছে যারা তাকে এসব ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

তো, কথা এক জায়গাতে গিয়েই ঠেকে। টাকা। স্বাবলম্বন। আত্মপ্রতিষ্ঠা। আত্মঅবলম্বন। আত্মনির্ভরশীলতা।

বিয়ে করার সময় ম্যালা স্বপ্ন দেখছেন। লাল বেনারসী, গয়না, পার্লারের সাজ, স্বামীর সোহাগ ইত্যাদি। ফলে জামাই যা-ই বলছেন, তাই করে গেছেন। পড়ালেখা বাদ দিয়ে। নিজের যা কিছু যোগ্যতা দক্ষতা ছিলো সব ভুলেছেন। চাকরি করেন নাই। চাকরি করা অবস্থায় চাকরি ছাড়ছেন।

এখন জামাই লাথিগুতা মারসে। পরকীয়া করসে। এখন আপনারে মানুষই মনে করে না।
এখন আপনার দম বন্ধ লাগে। এখন আপনি মুক্তি চান।

কিন্তু আপা, মুক্তির জন্য যে ডানা চাই সে তো বহুকাল আগে নিজ হাতে কাইটা রান্নাঘরের জানালা দিয়া বাইরে ফালে দিয়েছেন। এখন না চেনেন রাস্তাঘাট, না জানেন কোন পথে গেলে কাজ জুটবে, না চেনেন মানুষজন, না আছে পড়ালেখার ডিগ্রি, না আছে আর কোন দক্ষতা। ফলে এই দেশে আপনার জন্য কোন কাজ এত সহজ না যোগাড় করা। আর তা না পেলে ওই লোকের ভাতই খেতে হবে।

ভাত খাবেন পেটে আর লাথি খাবেন পিঠে।

আপনার জামাই লোকটি দূরদর্শী। সে বহুকাল আগেই এই হিসাব সুন্দরভাবে করে রাখে দিযেছে। যাতে শত জুতার বাড়িতেও আপনি কোথাও যাতে না পারেন। এখন কি টের পাচ্ছেন তার সোহাগ ভরা বাসর রাতের ফজীলত?

জীবন তো সংগ্রামেরই। অথচ বিয়ের আগে বা পরে আপনি এই সংগ্রামটা করেন নাই। যুদ্ধ চালিয়ে যান নাই। আপোষ করছেন। অলসতা করছেন। দাসত্ব করছেন।

এখন আর চোখের জল ফেলে লাভ কি আপা?

কোন লাভ নাই।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]