আলীকদম ট্যুর প্রস্তুতি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালমা রহমান শুভ্রা

১ আগস্ট ২০১৯। ক’দিন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম অনেকদিন পর কোনো গ্রুপের সঙ্গে ট্রেকিং ট্যুরে যাবো। ট্যুরমেটরা ঢাকা থেকে রাতেই রওয়ানা দেবে। সময় বাঁচাতে তাই কক্সবাজার থেকে আগের দিনই রওয়ানা হলাম। হানিফে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটে চকরিয়া। মাঝে ১৫ মিনিটের বাধ্যতামূলক বিরতিতে কক্সবাজারের বিখ্যাত ছোট সাইজের পিঁয়াজু, যা মুচমুচে ভাজা শুকনা মরিচের সাথে খাওয়াটাই এখানকার রীতি, আর চায়ের পর ছোট বডির জিপ শেষ যাত্রী হিসেবে টিকেট কাটলাম। প্রথমবার আলীকদম যাচ্ছি। মায়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে বান্দরবানের এই উপজেলাটা পর্যটকদের কাছে প্রায় নিষিদ্ধ এলাকা ছিলো বহুদিন! যাকগে, খেয়াল করে দেখলাম জিপটা আমার আসার পথেই ফিরে গিয়ে চলতে শুরু করেছে! ফাঁসিয়াখালি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সীমানায় পৌঁছে বুঝলাম- কেন!। জিপ বাঁদিকে মোড় নিয়ে লামা-আলীকদম সড়কে ঢুকে পড়লো। জিপের পেছনের দরজার পাশে বসলেও জানালায় কাঁচের বদলে প্লাস্টিকের আবরণ থাকায় মিরিঞ্জা রেঞ্জের ওপারে দারুণ সুন্দর একটা সূর্যাস্তের ছবি তোলা মিস হয়ে গেলো!

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে ৭০ থেকে ৮০ কি.মি. স্পিডে ঠিক ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটে আলীকদম বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিলো ছোটবডি। নেমেই রিক্সা নিয়ে সোজা হোটেল দামতুয়া ইন। মালিক অংশেথোয়াই মারমা, বান্দরবান জেলা পরিষদের প্রয়াত সদস্য থোয়াইচাহ্লা মার্মার ছেলে। ঠিকাদারি ব্যবসার ফাঁকে নিজের অফিসের দোতলাটাকে হোটেলে রূপান্তরিত করেছেন এ বছরই। তবে সেদিন তিনি কক্সবাজারে কাজে এসেছিলেন। দেখা না হলেও ফোনে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো রিপন আর অংশেথোয়াই দাদা মিলে।

হোটেলে চেকইন করলাম ৭টা ৪০-এ। পরিচিত হলাম ম্যানেজার ববেনটু চাকমার সঙ্গে। দুপুরেই ওর সঙ্গে কথা হয়েছিলো। কিন্তু নামটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না! ডিনারের অর্ডার নিতে এসে ও সেবছর বইমেলার সময় প্রকাশিত বান্দরবান ট্যুর গাইড ‘দামতুয়া’ দিয়ে গেলো। পড়তে পড়তে আফসোস হলো- কেন আরও ১০ বছর আগে এই গাইডটা প্রকাশিত হয় নি কিংবা বয়সটা কেন আরও অন্তত ১০ বছর কম হলো না! চার হাজার ৪৭৯ বর্গকি.মি. আয়তনের বান্দরবান জেলার প্রতিটা উপজেলার আনাচে-কানাচে আরও যে কতো কতো পাহাড়চূড়া-ঝর্ণা-ঝিরি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে (যার অনেকগুলোই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে), গাইডটা হাতে না পেলে তা নতুন করে জানা হতো না!

আলীকদমের আছে আলীর সুড়ঙ্গ (মোট চারটি সুড়ঙ্গ), তামাংঝিরি জলপ্রপাত, তিনাম ঝর্ণা, থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা, পালংখিয়াং ঝর্ণা, লাদমেরাগ ঝর্ণা, পোয়ামুহুরী ঝর্ণা, রূপমুহুরী ঝর্ণা, তুইনুম ঝর্ণা, ওয়াং পা ঝর্ণা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬৫০ ফুট উচ্চতায় মারাইংতং জাদী, শিলবুনিয়া ঝর্ণা ইত্যাদি। আরও আছে মাতামুহুরী নদী, চৈক্ষ্যং খাল আর তৈন খাল। তৈন খালের দু’পাশেই কিছুদূর পরপর ছোটখাট ঝর্ণাধারার দেখা মেলে। এছাড়াও মাতামুহুরী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ইকো রিসোর্ট ’শৈলকুঠি’।

আছে বর্ষাকালে অধিকাংশ সময় মেঘে ঢেকে থাকা ডিমপাহাড়, যার স্থানীয় নাম ‘ক্রাউদং’, অবস্থান আলীকদম-থানচি সড়কের ওপর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ ফুট উচ্চতায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্ব্বোচ্চ এই সড়ক। ১৪ জুলাই ২০১৫ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সিঙের মাধ্যমে ৩৩ কি.মি. দীর্ঘ এ সড়কটি উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবি এবং ১৭ ইসিবি এ সড়কটি নির্মাণ করেছে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে। পাহাড়ের মধ্যে আছে ক্রিসতং ও রংরং। এসব পাহাড় চিম্বুক রেঞ্জের অংশ।

আলীকদমের নামকরণ নিয়ে নানান ধারণা প্রচলিত আছে। কেউ বলেন- ম্রো অথবা মঘী (মগদের ভাষা) ভাষায় আলেহ্ ডং কিংবা আলোহক্যডং থেকে আলীকদম নামের উৎপত্তি। বোমাং (মার্মা) সার্কেল চীফের নথিপত্র আর ১৯৬৩ সালের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মানচিত্রে আলোহক্যডং নামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আবার ১৮৬০ সালে সৃষ্ট জেলা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার টি. এইচ. লুইনের মতে `Alley Kingdom’ থেকে ‘Alikadam’ নাম হয়েছে। তার ভাষ্য মতে, Alley অর্থ দমন আর Kingdom মানে রাজ্য। ইতিহাসমতে, মোগল আমলে বাংলার সুবেদার (১৬৬৪-১৬৮৮) শায়েস্তা খাঁ ঢাকায় হামলাকারী আরাকানীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান এবং তাদের তৎকালীন রাজধানী চট্টগ্রাম দখলের পাশাপাশি ছোট ছোট পাহাড়ি রাজ্যগুলোর গোষ্ঠীপতিদের বিদ্রোহ দমন করেন। তাই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এ অঞ্চলের নাম হয় Alley Kingdom বা দমন করা রাজ্য।

এটাও প্রচলিত আছে যে, যে ৩৬০ আউলিয়া এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আলী নামে কোনো এক সাধক এ অঞ্চলে আসেন। ওনার কদম বা পদধূলিতে ধন্য হয়ে এই এলাকার নাম হয় আলীকদম। অনেকে অবশ্য আলীর সুড়ঙ্গকে সেই সাধকের সঙ্গে সম্পর্কিত করেন। এখানে বাঙালির পাশাপাশি মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, চাকমা/ তঞ্চৈঙ্গ্যা জাতির বাস। ডিনার করতে বসে ববেনটুর সহযোগী মিলন তঞ্চৈঙ্গ্যা আর ডেভিড তঞ্চৈঙ্গ্যার সঙ্গে পরিচয় হলো। আরেকজন ছিলো, মারমা, নাম ঠিক মনে পড়ছে না!

তঞ্চৈঙ্গ্যারা আলাদা গোত্র থেকে আলাদা জাতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেও অনেকেই এখন আবারও নিজেদের চাকমা বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। পাহাড়ি খাবার খেতে চেয়েছিলাম। শেফ বাঙালি। তাই কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে ভাতের সঙ্গে খাওয়ালো দেশি মুরগির লাকসুক (সালাদ), শুটকিভর্তা, সব্জি।হোটেলটা ইটের হলেও রেস্টুরেন্ট-কাম-মিটিং স্পেসটা আলাদা আর পুরোটাই ইকো কটেজের আদলে বাঁশের তৈরি। দেয়ালে ঝোলানো ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট আর চাকমাদের ধর্মীয় আচারের সঙ্গে জড়িত গাছের ফল ‘গিলা’।

কৌতুহলী হয়ে ডিনারের ফাঁকে আলাপ জুড়ে দিলাম ওদের সঙ্গে। কথা হলো পাহাড়ে তৈরি হয় এমনসব জিনিসপত্র নিয়ে। আমরা হয়তো অনেকেই জানি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রতিটা জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচারাদি, পোশাক, তাঁত থেকে শুরু করে পোশাক, গহনা পর্যন্ত ভিন্ন! এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে বাজলো প্রায় সাড়ে ১১টা! ট্যুরমেটরা সকালে এসে পৌঁছাবে। তাই শুয়ে পড়তে হলো ১টার দিকে।

ছবি: লেখক

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন a[email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box