আলী ভাই চলে যাননি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবিদা নাসরীন কলি : মধ্য নব্বুই।এক শীতের সন্ধ্যা।সাসটেইন স্টুডিওতে সিনেমার গানের রেকডিং চলছে।কন্ঠশিল্পী আগুন।আগুনের আমন্ত্রনেই আমার সেদিন ওখানে যাওয়া।সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী সেখানে বসা।সেদিনই প্রথম আমার আলীভাইকে সামনে থেকে দেখা।এতো এতো জনপ্রিয় গানের সুরস্রষ্টা আলাউদ্দিন আলী আমার কাছে সব সময় একজন বিস্ময়-মানুষ। ছোট-খাটো আকৃতির মানুষটাকে সামনে থেকে দেখে আমি আরও বিস্মিত হই। বোঝার কোনো উপায়ই নেই সুরের আগুন তাঁর ভেতরে কিভাবে জ্বলছে।বড়ো সাদাসিধে  তাঁকে সেদিন ভালো লেগে যায়। আরও ভালো লাগে তাঁর  সেন্স অফ হিউমার দেখে।নিজে হাসেন না তবে মানুষকে হাসিয়ে পেটে খিল ধরাতে পারেন। রেকডিং শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই ইলেকট্রিসিটি চলে যায়।তখনও জেনারেটরের ব্যবস্থা ছিলো না।তাই কেউ একজন মোমবাতি জ্বালিয়ে আনেন।সবাই চুপচাপ বসে। হঠাৎ আগুন ভেতর থেকে বলে ওঠে,‘ আলী চাচা আপনাকে দেখতে পাচ্ছিনা তো।’ আলীভাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেন,‘এই আলোতে কি আমাকে দেখা পাওয়ার  কথা চাচা!’ঘরের সবাই হেসে উঠলেও আলী ভাই অন্ধকারে নিজের মনেই সুরটা গুনগুন করছেন।সেদিন আমার পরিচয় জানলেও খুব একটা কথা আমার সঙ্গে হয়নি তাঁর।যেন গানটার ভেতরেই ডুবে আছেন তিনি।

তারপর অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়।আবার আলী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা  হয় শম্পা’পার (শম্পা রেজা) বাসায়।সম্ভবত ২০০১ সালে।এক সকালে আমি, ইরাজ আর শম্পা’পা বসে গল্প করছিলাম হঠাৎ সেখানে আলী ভাইয়ের আগমন। শম্পা‘পা পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, আলী, কলি ইরাজ এরা আমার বন্ধু।’ আলী ভাইয়ের প্রথম প্রশ্ন,‘তোমরা কি খাবে চা না কফি?’আমরা উত্তর দেয়ার আগেই আলী ভাই কিচেনে চলে যান এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই কফি আর বিস্কিটের প্লেট হাতে নিয়ে হাজির হন।তারপর সোফাতে আয়েশ করে বসে আমাদের সঙ্গে কথা শুরু করেন। যেনো অনেক দিনের চেনা।সেদিন থেকেই এই মানুষটার সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

সময়- অসময়ে শম্পা’পার বাসায় আমরা হানা দেই।আলী ভাই বাসায় থাকলে চা-কফি বানিয়ে খাওয়ানোর দায়িত্ব আলী ভাই নিজের অধীনেই নিয়ে নেন।তারপর আমাদের আড্ডা চলতো। গান থেকে রাজনীতি কোনো বিষয়ই বাদ পড়তো না।কখনও কখনও ভর দুপুরেও আলী ভাই, শম্পা’পার ডাক পেতাম। ফোন করে বলতেন, নতুন গান তুলেছি, বা শম্পা’পা বলতো, আলী নতুন ক’টা গান তুলেছে তোরা চলে আয়, একসঙ্গে শুনবো।এই আহবান আমরা ফেলতে পারতাম না।আলী ভাইয়ে গান শোনার লোভে। তখনই চলে যেতাম।আলী ভাই হারমোনিয়াম বাজিয়ে চোখ বন্ধ করে গান গেয়ে যেতেন। আমরা মুগ্ধ হতাম।তখন যেনো ঈশ্বর ভর করতো আলী ভাইয়ের উপর।কখনো বাসায় গিয়ে দেখতাম ক্লোজআপ ওয়ানের শিল্পীদের নিয়ে আসর জমিয়ে গান শেখাচ্ছেন আলী ভাই।আমরা তখন পাশের রুমে বসে শম্পা’পার সঙ্গে  নিচু গলায় কথা বলতাম।আলী ভাই আমাদের উপস্থিতি টের পেলে মাঝে মাঝে এসে কথা বলে যেতেন।আমাদের জন্য অবাধ প্রশ্রয় ছিলো আলী ভাইয়ের কাছে।

রান্নাতেও আলী ভাইর ছিলো প্রচন্ড মনোযোগ।রান্নাটাকেও একেবারে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতেন।কতোকিছু যে রান্না করতে পারতেন বলে শেষ করা যাবে না।খাওয়াতেও প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি, গরুর মাংস রান্না করে আমাদের খাওয়াতেন।শম্পা’পাও স্বীকার করতেন যে,‘রান্নাটা আমি আলীর কাছেই শিখেছি।’ তবে এটাও ঠিক যে, আলী ভাই যে কাজই করতেন সেটা চুড়ান্ত মনোযোগের সঙ্গেই করতেন।সঠিক না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়তেন না।

বড়ো সন্তান জন্মের পর

বেশ পেছনের মডেলের একটা কালো মার্ক-টু গাড়ি ছিলো আলী ভাইয়ের।ওটা প্রায় সময়ই গ্যারাজে থাকতো।রাস্তায় বের করতেন কম। গাড়িটা আমার খুব পছন্দের ছিলো।আমি সব সময় তাঁকে বলতাম,‘গাড়িটা যখন ফেলে দেয়ার মতো হবে তখন আমাকে দিয়ে দেবেন।আলী ভাই সব সময় আমার কথায় হাসতেন।এমন সম্পর্কে ভিতরেই আমরা অনেকদিন ছিলাম।

হঠাৎ আলী ভাই উত্তরাবাস উঠিয়ে নিলেন। যোগাযোগটা তখন ক্ষীণ হয়ে পড়ে।এক সময় আলী ভাইয়ের অসুস্থ্যতার কথা জানতে পারি।মনটা বড়ো বিষন্ন হয়। তবুও মানুষটার সঙ্গে দেখা করা থেকে বিরত হই।কারণ তাঁর রোগাক্লান্ত অবয়বটা আমি দেখতে চাই নাই।সজীব-সতেজ মুখটাই আমি আমার স্মৃতিতে ধরে রাখতে চেয়েছি।

মৃত্যুর হুলিয়া মাথায় নিয়েই আমরা পৃথিবীতে আসি।তাই প্রকৃতির নিয়মেই একদিন চলে যেতে হয়। আলী ভাইও  আমাদের অন্তরাল হয়েছেন।  আলী ভাইয়ের মতো মানুষরা চলে যান না। শুধু জায়গা বদল করেন। আমাদের সুরের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আলী ভাই থেকে যাবেন চিরটাকাল।

ছবি:গুগল

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]