আলোচিত শব্দ লকডাউন

রুদ্রাক্ষ রহমান
(লেখক, সাংবাদিক)

১৯৭১ সালে বাঙালি পরিচিত হয়েছিলো ‘ক্র্যাকডাউন’ শব্দের সঙ্গে। ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানী সেনাদের আক্রমণকে বিদেশী গণমাধ্যমগুলো চিহ্নিত করেছিলো ক্র্যাকডাউন বলে। আর এত বছর পরে আমাদের চর্চায় এলো ‘লকডাউন’ শব্দটি।

লকডাউন শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ভয়ানক এক ভাইরাসের নাম। আচমকা দুনিয়াটাকে ভয়ের খাঁচায় বন্দি করে নিলো সেই ভাইরাস। প্রেম যেমন একটা অন্ধকার ঘরে কালো বেড়াল খোঁজার মতো, ঠিক অনেকটা তেমনি। ধরা যায় না, দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। কেবল আক্রান্ত হওয়া যায়। তারপর ভুগতে ভুগতে শীতল মৃত্যু। প্রথম দিকে তো এমনি ছিলো। রোগের নাম কোভিড-১৯। ২০১৯ সালে প্রথম ধরা পড়লো চীনে। তাই নাম ঊনিশের সঙ্গে মিলিয়ে। বাংলাদেশে ছড়াতে ছড়াতে ২০২০ সাল। সেই থেকে দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রূপ বদলানো করোনাভাইরাস। শুরুতে মৃত্যুর সঙ্গে ছিলো আতঙ্ক। দিন যতো গেছে আতঙ্ক কমেছে, তবে মানুষ এখনো ঠিক বুঝতে পারছে না করোনার ধাক্কা কোথায় নিয়ে যাবে পৃথিবী নামের এই গ্রহটিকে। মানুষ লড়ছে। ভালো থাকার জন্য স্বেচ্ছায় মুখোশ নিয়েছে। আর দেশে দেশে ভাইরাসরোধী টিকা আবিষ্কার হয়েছে। এক ডোজ, দুই ডোজ। এখন চলছে বুস্টার ডোজের পালা। এই স্বাস্থ্যদৌড় থেকে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। এতো কিছু করেও রক্ষা হচ্ছে না পুরোপুরি। পণ্ডিতজন বলছেন আরো অনেক অনেক দিন এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে হবে জগৎবাসীকে। সেই শুরু থেকে ভাইরাস আটকাতে দুনিয়া জুড়ে মানুষ দেখেছে ‘লক ডাউন’। একটি ইংরেজি শব্দ গোটা পৃথিবীতে মানুষের জীবন যাপনের অংশ হয়ে উঠলো। পরিণত হলো প্রতিদিনের চর্চিত একটি বিষয়।

বাংলাদেশ এর বাইরে ছিলো না। দফায় দফায় ’কঠোর বিধিনিষেধ’ কোথাও কোথাও লক ডাউনের কালে কেমন এক বিষণ্ন নীরবতা এসে ভর করেছিলো এই ঢাকা শহরেও। কল কারখানা বন্ধ। বন্ধ রাস্তায় গাড়ি। বন্ধ চিড়িয়াখানা। অনেক অনেক কাল পর অবসর পেয়ে পশুরা কেমন নিজেদের সময় ফিরে পেয়েছিলো। রোদ-বৃষ্টি মেখে শহরের গাছেরা সেজেছিলো নতুন রূপে। ছুটি পেয়ে শহরের সব কিছু কেমন জিরিয়ে নিচ্ছিলো। গাছের পাতায় ছিলো না ধুলার আস্তরণ। শহরের বায়ুর মান গিয়েছিলো বেড়ে! কেবল, অনেকটা টান পড়েছিলো সাধারণ মানুষের ট্যাকশালে। অনেকের ভাতের হাড়ি শূন্য হয়ে গিয়েছিলো। অনেকে কাজ হারিয়ে বেকারত্বের অনিশ্চয়তায় ডুবে গিয়েছিলো। সময়টা এমনি যে নিজের হাত দুটোকেও অবিশ্বাস হতে থাকে। ঘরবন্দি মানুষ তখন ভেবেছিলো তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় আরাধ্য মুক্ত হাওয়ায় বাইরে যাওয়া। একা মানুষ নিজের সঙ্গে তখন কথা বলে। কিছু দিনের জন্য দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে যায় হিংসাহিংসী। খুনোখুনি। মানুষ একটা নতুন পৃথিবী, নতুন সময়ের আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। দুঃসময়ে ভর করে মানুষ নতুন নতুন পথ খুঁজে নিতে থাকে। অনলাইন নির্ভর নানামাত্রিক উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে বিদেশ থেকে দেশে। সৃষ্টিশীলতায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন অনেকে। আর সব কিছু ছাপিয়ে এমন মহামারিকালে মানুষের সবচেয়ে ভরসার জায়গা হয়ে উঠেন চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা। আর সংবাদকর্মীদেরও অবতীর্ণ হতে হয় নতুন এক যুদ্ধে। ঘরে বাইরে করোনার আতঙ্ক, নিজে এবং পরিবারের সদস্যরা যে কোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে। সেই ভয় পাশে সরিয়ে রেখে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা।

এই পথে শুরু থেকে প্রাণও গেছে অনেকের। সেই আতঙ্কের শুরু থেকে, এখন পর্যন্ত কাজে ছেদ পড়েনি আমার। রাতে যার সঙ্গে কাজ করেছি পাশপাশি, সকালে খবর পেয়েছি তিনি পজেটিভ। ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন। একটু যে চিন্তা হয়নি তা হলফ করে বলতে পারবো না। তারপরও। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ। অফিসের গাড়িই ভরসা। আর রাজধানীর পথ যেন মসৃণ রানওয়ে। শহরের এ মাথা থেকে ওপ্রান্ত যেতে কোথাও থামতে হয় না। মহাখালী থেকে উত্তরা যেতে কখনো-সখনো যেখানে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগতো কথিত ‘স্বাভাবিক’ সময়ে; সেখানে লক ডাউনকালে মাত্র ২০ মিনিট। তখন শহরে একটু রাত বাড়লেই পথে নেমে আসতো কুকুররা দল বেঁধে। এক রাত। তখন ২টা বেজে আরো কিছুক্ষণ। সন্ধ্যায় বৃষ্টি হয়েছে। পানি জমে আছে এখানে, ওখানে। রেল লাইন পেরিয়ে একটা অল্প প্রশস্ত সড়ক। সেই সড়ক আটকে দিয়ে গেছেন থানার বড় কর্তা। তাই গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে গিয়ে গুণে গুণে ৮৩টা কুকুরের সঙ্গে দেখা হয়। হয় চোখাচোখি। মোটামুটি সব ক’টার ভঙ্গি এমন যে, এখনি ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু না। তেমনটি হয়নি। বিপদগ্রস্ত মানুষের ভেতরটা বোধ হয় পড়তে পারে পথের তেজি কুকুরও! লক ডাউন সময়টা আমার কাছে এখনো একটা আতঙ্ককাল হয়েই ফিরে আসে।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box