আলো-আঁধারির আলেখ্য

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

‘আমাকে তুমি অন্ধকারের মধ্যে রে-খে দি-য়ে-ছি-লে’। নাকী সুরে টানা টানা কণ্ঠে কান্নাজড়িত স্বরে একটি শিশুর ক্রমান্বয় অনুযোগ ভেসে আসছিলো। বলছিলো সে ইংরেজীতেই, কিন্তু থামছিলো না সে এক লহমার তরেও।মনে মনে ভাবলাম, শিশুদের এ জাতীয় ঘ্যান্ ঘ্যানে পৌণ:পুনিক অনুযোগের কেন্দ্রবিন্দু মা না’ হয়েই যায় না? তাই কৌতুহলবশে ফিরে তাকালাম নাকি কান্নার উৎসের দিকে। যা ভেবেছিলাম, তাই। সোনাভ কেশের দেবশিশুসদৃশ একটি পাঁচ-ছ বছরের বালক – বসে আছে তার শিশু ঠেলুনীতে। ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বেজেই যাচ্ছিলো সে আর সেই সঙ্গে আছড়াচ্ছিলো সে তার পদযুগল। তরুনী মা’টি চেয়ারে উপবিষ্ট – আমার দিকে পেছন ফেরা। বেশ নীচু হয়ে সে শিশুটিকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু ‘ভবি ভুলিবার নয়’ – শিশুটির মুখে ‘কানু ছাড়া গীত নেই’ এর মত কথা একটিই ‘, আমাকে তুমি অন্ধকারের মধ্যে রেখে দিয়েছিলে’।

রোববারের সকাল বিধায় প্রাত:রাশ সারতে আমাদের রুজভেল্ট দ্বীপের একমাত্র ক্যাফেটাতে এসেছিলাম। রৌদ্দুর-ভাসা শীতের নরম একটি সকাল। বড়দিন দরজায় টোকা দিচ্ছে। চারদিকে একটা চনমনে খুশী খুশী ভাব। রাস্তায় দেখেছি, বহু তরুনযুগল শিশু এসেছে দ্বীপে মা-বাবার সঙ্গে বড়দিন উদযাপন করতে ও ছুটি কাটাতে। আমি এ দ্বীপের ২৬ বছরের বাসিন্দা – এসব তরুনযুগলের অনেককেই আমি শিশু-কিশোর অবস্থায় দেখেছি। পথে আসতে আসতে এদের অনেকেই প্রাত:সম্ভাষন জানিয়েছে, কুশল জিজ্ঞাসা করেছে, নিজেদের খবরও জানিয়েছে। ক্যাফের ভেতরেও বেশ ভীড়। অনেকেই সপরিবারে এসেছে সকালের খাবার খেতে। কাপ-পিরিচ-চামচের টুং টাং শব্দ, গাল-গল্প আর হাসি-তামাশায় সরগরম ক্যাফের চারদিক। কেন জানি হঠাৎ করে শিশুটির অনুযোগের সুর একটু চড়ে গেলো, এবং সবার দৃষ্টি চলে গেলো সে দিকেই। তরুনী মা’টি শিশুটিকে সামলাতে না পেরে বিব্রতভাবে এদিক ওদিক তাকাতেই আমার চোখে চোখ পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওদের টেবিলের দিকে এগুলাম।

আমাকে দেখে তরুনীটির সারা মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে গেলো। হবে না কেন? – এ তো আমাদের পাশের বিশতল দালানের জুলি। ওকে যখন বছর পঁচিশেক আগে আমি প্রথম দেখি, তখন ওর শিশুটিরই বয়সী ছিলো সে। বেশ ভালো জানাশোনা ছিলো ওর মা-বাবার সঙ্গে। দ্বীপের অন্যান্য বাচ্চাদের মতো জুলিও বেড়ে উঠেছে আমাদের চোখের সামনে। ওর বিয়েতেও গিয়েছিলাম বছর দশেক আগে। ওর বাচ্চা হবার খবরও জানিয়েছিলেন আমাদেরকে বছর পাঁচেক আগে।

‘কি আশ্চর্য্য, জুলি! কবে এসেছো?’, ওর কাঁধে হাত রেখে সহাস্যে জিজ্ঞেস করি আমি। ততক্ষনে সেও উঠে দাঁড়িয়েছে। হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরেছে। ‘এই তো দু’দিন আগে’, মিষ্টি হেসে জবাব দেয় সে। ‘তা, ঝামেলা কি এখানে’?, শিশুটির চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করি আমি তার মা’কে। আমার মতো আগন্তুকের হঠাৎ আবির্ভাবে খুশী হয় না সে, বরং একটু সন্দিহান চোখেই তাকায় সে আমার দিকে।

‘আর বলবেন না!’ শ্রান্ত হতাশ গলায় বলে জুলি। ‘ক’দিন আগে স্যামের জন্মদিন গেছে’ – বুঝলাম, জুলির ছেলের নাম স্যাম। ‘ তখন থেকেই বায়না ধরেছে জানতে যে সে জন্মের আগে সে কোথায় ছিলো ।’ কথা চালিয়ে যায় জুলি। ‘কিন্তু কোন জবাবই তার পছন্দ হয় না। শেষে অনেক ভেবে-চিন্তে বললাম যে আমার পেটের মধ্যে ছিলে তুমি’, গল্প বলে যায় মেয়েটি। ‘জবাব পেয়ে কিছুক্ষন ভেবে আমাকে জিজ্ঞেস করল স্যাম যে পেটের ভেতরে অন্ধকার কি না’? জুলি জানায় আমাকে। তারপরে তো দেখলেনই – সত্যিকারে জবাব পেয়ে কি অনুযোগ শুরু করলো সে’ – পুরোটা বলে দম নেয় জুলি। ততক্ষনে স্যাম আবার ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছে।

হেসে ফেললাম আমি -বুঝলাম এ অবস্হা সামাল দেয়া জুলির কম্মো নয়। অভিজ্ঞ মানুষের দরকার আছে এখানে। হাঁটু গেড়ে বসলাম আমি স্যামের শিশু-ঠেলুনীর পাশে। স্মিতহাস্যে বললাম, ‘চোখ বন্ধ কর তো লক্ষ্মী স্যাম’। মজার খেলা ভেবে চোখ বন্ধ করে শিশুটি। ‘কি দেখছো?’, শুধোই তাকে। ‘অন্ধকার’, সপ্রতিভ জবাব তার। ‘চোখ খোল তো’, আদর করে বলি তাকে। কথা শোনে সে। ‘কি দেখছো?’ ‘আলো’ চটজলদি উত্তর পাওয়া যায়।

এইবার আমি আমার মোক্ষম তূন ছুঁড়ি। ‘মায়ের পেটের মধ্যেও আলো ছিলো। তুমি সেখানে চোখ বন্ধ করে ছিলে বলেই অন্ধকার দেখেছো? চোখ খুললেই তো আলো দেখতে পেতে। চোখ খোল নি কেন, বোকা ছেলে? তোমার মা’তো তার পেটে তোমাকে আলোর মধ্যেই রেখেছিলো’। স্যাম অপ্রতিভ হাসি হাসে – বোধহয় নিজের বোকামিতে লজ্জা পেয়ে যায়। আমি জুলির স্বস্তির নি:শ্বাস শুনি। স্যাম হঠাৎ করে মা’র গলা জড়িয়ে চুমু দেয় – মা সে চুম্বন ছেলেক ফিরিয়ে দেয়।

আমি তৃপ্তমুখে উঠে দাঁড়াই। জুলি আমার গালে ঠোঁট ছোঁয়ায় পরম মমতায় – ফিস ফিস করে বলে, ‘কি বাঁচা যে বাঁচালেন আজকে’। আমি হেসে উঠি।আর তখনই কচি হাতের মুঠো খুলে স্যাম হাতটা বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে – সেখানে ছোট্ট একটা দলা পাকানো চকলেট। আমি চকলেটটির মোড়ক খুলে মুখের মধ্যে ফেলে দিলাম। তারপর স্যামের গালে আলতো আদর করে ক্যাফের বাইরে পা বাড়ালাম। আহ্, পৃথিবীটা কি সুন্দর! জীবন কি মনোরম!

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box