আশা নয়, আকুতি রাখলাম কেবল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে): গ্রামবাংলা জুড়ে নবান্ন উৎসব হচ্ছে এখন। গন্ধে-বর্ণে-ছন্দে মেতে উঠেছে মানুষ। এ পার্বণ যে নিজের চোখে দেখেনি, সে বুঝবে না, কেবলমাত্র ফসলের সঙ্গে কত আবেগ, কত লোকাচার, কত আনন্দ জড়িয়ে রয়েছে।
আমি আদ্যোপান্ত শহরের মেয়ে। দক্ষিণ কলকাতার ট্যাঁশ জীবন, প্রিভিলেজড যাপন। বোতাম টিপে খাবার আনাতে পারি ইচ্ছে হলেই। তবু কোনও এক অজানা উপায়ে শরীরে মনে আলপথের মাটি মাখিয়ে বড় করা হয়েছে আমায়। মস্তিষ্কে আর হৃদয়ে সবুজ গেঁথে দেওয়া হয়েছে সন্তর্পণে।

ধান দেখলেই মন দ্রব হয়ে আসে আমার। ধানের গন্ধে বেঁচে থাকা অনুভব করি। চরাচরবিস্তৃত মাঠের শরীর জুড়ে কমনীয় সবুজ রঙের নমনীয় ধানের জমাটবাঁধা সারি নরম বাতাসের দোলায় বিনবিনে ঢেউ তুলছে, এ দৃশ্য আমায় ভাসিয়ে দেয় কোন সুদূর সেই স্বপ্নপুরে…।ভেতরের ছবির বাঁ দিকের লোকটা আমার বাবা। তিনি আর মা ভ্রমরকোল গিয়েছেন নবান্ন দেখতে। বীরভূমের আমোদপুরের কাছে ভ্রমরকোল গ্রামে আমার মামাবাড়ি। সেখানে এখন লবান উৎসবের উজ্জ্বল সবুজ ছেয়ে আছে রাত্রিদিন। সেই উজ্জ্বলতার স্রোতে গা ভাসিয়েছেন তাঁরা।

সেদিন রাতে মাঠের ধারে ‘আলকাটার কাপ’ বসেছিলো। যাঁরা জানেন, তাঁরাই বুঝবেন এটা কী। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি গল্পের একটা অংশ উদ্ধৃত করছি।

“অম্বুবাচী উপলক্ষে চাষীদের যে সর্বজনীন কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়, তাহাতে উভয় পক্ষের চাষীরাই যোগদান করে। হিন্দুর আখড়ায় মুসলমান লড়িতে আসে, মুসলমানের আখড়ায় হিন্দুরা যায়। তবে আজকাল একটু সাবধানে দল বাঁধিয়া যায়। মারামারি হইবার ভয়টা যেন ইদানীং বাড়িয়াছে। উভয় পক্ষের গানের প্রতিযোগিতা এখনও হয়। হিন্দুরা গায় ঘেটুগান, মুসলমানদের আছে আলকাটার কাপ, মেরাচিনের দল। মনসার ভাসানের গান দুই দলেই গায়।”

অর্থাৎ লোকজ শিল্পের একটা আঙ্গিক এই আলকাটার কাপ। তো সেদিন রাতে মাঠের ধারে এই আলকাটার কাপ বসেছিলো। গ্রাম উজিয়ে, মাথায় কাপড় ঢেকে, সকলে মিলে দলবেঁধে গিয়েছিলেন দেখতে। রাত করে ফিরে ঘুম ভাঙতে দেরি। তার পরেই আবার আজ সকাল থেকে উঠোনে ভিড় করছেন বহুরূপীরা। স্থানীয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা লোকরঞ্জনের এই পেশায় যুক্ত আজও। তাঁরা এসে অনাবিল আনন্দে নানাবিধ ভূমিজ নাচ-গান দেখিয়ে, নতুন ধান, মুড়ি, মিষ্টি, টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে কাভারের ছবিটা তখনকারই। বাবা কী করছিলো বা করতে চাইছিলো আমি জানি না। তবে যেটাই চাক, তাতে নির্মল আনন্দ ছাড়া কিছু ছিলো না। এই ছবিটা দেখে প্রথমটায় খুব হাসলেও, খানিক পরে কান্না এসে গেলো আমার।

কারণ এই বাংলাকে, এই আনন্দকে, এই সমন্বয়ের ফ্রেমকে ছারখার করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কাল মধ্যরাতে গৃহীত হয়েছে মসনদের একটা স্তরে। এই দেশ, এই বাংলা যে দিকে এগোচ্ছে, তাতে আর কয়েক বছর পরে এই ছবি আমরা পাব কিনা আমি জানি না। জানি না, দেশের মাটি জুড়ে ছেয়ে থাকা অজস্র বর্ণ, ভাষা, শিল্প, পদবি, ধর্মের সমাহারে শাসকের দমন-বুট ঠিক কতটা জোরে আঘাত করবে।
এই এত এত এত রকম মানুষের শত রকমের নথির হিসেব কষে ভূমির অধিকার ঠিক করার স্পর্ধা কার কোথা থেকে আসে, আমি জানি না। জীবনের চেয়ে কাগজের টুকরো বড় হয়ে ওঠা এই অচেনা দেশের ব্যর্থ নাগরিক হিসেবে আমি ভয়ে, দুঃখে, লজ্জায়, কষ্টে কুঁকড়ে আছি।…

সেই যন্ত্রণা থেকেই, তারাশঙ্করের যে গল্পটার অংশ ওপরে উল্লেখ করলাম, ‘পঞ্চগ্রাম’, তারই আরও একটা অংশ ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে সব শেষে। আগে পড়া এ গল্প নতুন করে ধরা দিল আজ।

“পৃথিবীর রূপ পাল্টাইয়া গিয়াছে। সে জানিয়াছে, এদেশের মানুষ মরিবে না। মহামঙ্গলময় মূর্তিতে নবজীবন লাভ করিবে। চার হাজার বৎসর ধরিয়া বার বার সংকট আসিয়াছে—ধ্বংসের সম্মুখীন হইয়াছে—সে সংকট সে ধ্বংস সম্ভাবনা সে উত্তীর্ণ হইয়া আসিয়াছে। নবজীবনে জাগ্রত হইয়াছে। সে সমস্ত কথাগুলি স্মরণ করিয়া কথাগুলির মধ্যে শুধু পিতৃ-পিতামহের নয়—যুগযুগান্তরের অতীতকালে মানুষের এই ইতিহাসের সঙ্গে তাহার নূতন মনের কল্প-কামনার অদ্ভুত মিল প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করিল। শুধু তাই নয়, মানুষের জীবনীশক্তির মধ্যে অমরত্বের সন্ধান পাইয়াছে সে। অমর বৈকি! দিন দিন মানুষের বুকের উপর মানুষের অন্যায়ের বোঝা চাপিতেছে। অন্যায়ের বোঝা বাড়িয়া চলিয়াছে বিন্ধ্যগিরির মত মানুষের প্রায় নাভিশ্বাস উঠিতেছে। কিন্তু কি অদ্ভুত মানুষ, অদ্ভুত তাহার সহনশক্তি, নাভিশ্বাস ফেলিয়াও সেই বোঝা নীরবে বহিয়া চলিয়াছে; অদ্ভুত তাহার আশা—অদ্ভুত তাহার বিশ্বাস! সে আজও সেই কথা বলিতেছে, সে দিন-গণনা করিতেছে-কবে সে দিন আসিবে। মানুষ এই দেশের মানুষ মরিবে না। সে থাকিবে। থাকিবে যাবচ্চন্দ্ৰদিবাকরং।”

মানুষ, জীবন, যাপন— বেঁচে থাকুক, খুব ভাল থাকুক দেশ জুড়ে, যাবচ্চন্দ্ৰদিবাকরং। আকুতি রাখলাম কেবল, আশা নয়।…

কাভার ছবি:আনসার উদ্দিন খান পাঠান। ভেতরের ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]