আসামের অসুখী সময়

ঊর্মি রহমান

প্রাণের বাংলায় ‘দূরের হাওয়া’ কলামে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন উর্মি রহমান। একদা বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কর্মরত উর্মি রহমান ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। এখন বসবাস করেন কলকাতায়। যুক্ত রয়েছেন নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মোর্চায়। দূরের হাওয়া মানেই তো দূর পৃথিবীর গন্ধ। অন্য দেশ, অন্য মানুষ, অন্য সংস্কৃতি। কিন্তু মানুষ তো একই সেই রক্তমাংসে। সমাজ, মানুষ, আন্দোলন আর জীবনের কথাই তিনি লিখবেন প্রাণের বাংলার পৃষ্ঠায়।

কলকাতায় গত বছর থেকে কিছু মানুষ, তাদের মধ্যে তরুণরা যেমন আছে, অ-তরুণও অনেকে আছে, বাংলা নববর্ষে মঙ্গলশোভাযাত্রা শুরু করেছে। যেহেতু অনুপ্রেরণা বাংলাদেশ। সেজন্য ওদের পরিচিত কলকাতায় বসবাসরত বাংলাদেশী হিসেবে আমাকে ডেকেছে আর এভাবে আমি ওদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। পরিচিত হয়েছি বেশ কিছু চমৎকার মানুষের সঙ্গে, বন্ধু পেয়েছি অনেক – সম ও অসমবয়সী। এবছরও মঙ্গলশোভাযাত্রা বেরিয়েছে। তবে শুধু এতেই আটকে নেই এই গ্রুপটি, সারা বছরই নানা রকম অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি প্রতিফলিত হবে। তার উত্তরণে সহায়তা করবে। এর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে আসামের বরাক উপত্যকার ভাষা দিবস। ১৯শে মে’তে স্মরণ করা হয়েছে সেখানকার ১১জন ভাষা শহীদকে। কবি বেলাল চৌধুরী ও অর্থনীতিবিদ-প্রাবন্ধিক অশোক মিত্রের প্রয়াণের পর তাঁদের স্মরণ করা হয়েছে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। কলকাতা সফররত সাহিত্যিক শাহীন আখতারের সঙ্গে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস ‘অসুখী দিন’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এবার আবার আসাম এসেছে আলোচনায়। সেখানে নতুন করে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তালিকা তৈরী করা হচ্ছে যা থেকে বাদ পড়েছেন অনেক বাংলাভাষী অসমীয়া। সেই পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা। সঙ্গীতশিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার আসামের শিলচরের মানুষ, এবং তিনি শুধু যে অসাধারণ গান করেন, তাই নয়, চমৎকার বলেনও। এ বিষয়ে বলার জন্য তাঁর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে? তিনি প্রথমে বললেন, তাঁর পিতামহ, বাবা ও তাঁর জন্মের সময় এই আসাম ছিল না। তাঁর বাবা যেখানে জন্মেছিলেন, সেটি এখন বাংলাদেশে পড়েছে আর তিনি যেখানে জন্মেছিলেন, সেটা পড়েছে বর্তমান মেঘালয় রাজ্যে। আসাম ভেঙ্গে তৈরী হয়েছে মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড নামে তিনটি ভিন্ন রাজ্য। শুভপ্রসাদ বলেন, আসামের পরিচিতি বার বার বদলেছে। আসামে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলেছে বার বার। প্রাক-ব্রিটিশ ও আজকের আসাম সাংস্কৃতিক বা জনসংখ্যা বিষয়ক দিক থেকে আর আগের মত নেই। সেখানে পরে বাংলা ভাষার আন্দোলন যেমন হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন জনজাতির আন্দোলনও হয়েছে। ব্রিটিশরা আসার আগে আহম রাজারাই আসাম শাসন করতেন। ব্রিটিশরা ১৮২৬ সালে আসাম শাসন করতে আসে, বাংলা দখলের ৭০ বছর পরে। সেই সময় আসাম রাজ্যে রাজম্ব ঘাটতি ছিল। সেটা পূরণের জন্যই আসামের অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলা ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ শাসিত আসাম প্রদেশ গঠিত হবার   পূর্বে তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে কেটে এনে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আসামে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার পর প্রথম বঙ্গদেশ থেকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কাছে এবং তারই অনুষঙ্গে প্রথম বাঙালি প্রব্রজন হয়। ১৮৩৭ সালে সেখানে বাংলা ভাষা প্রবর্তন করা হয়। ব্রিটিশরা মনে করতো, অসমীয়া বাংলার একটি উপভাষা। শুভপ্রসাদ জানান, এর ফলেই বাঙালিরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়। আসামে তো বাংলা কারো মাতৃভাষা ছিল না, এটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বাংলা চালু করার ব্যাপারে ব্রিটিশ মিশনারিদের ভূমিকাও কম ছিল না। অসমীয়ারা জলাজমিতে চাষ করতে জানতো না। পূর্ব বঙ্গের ময়মনসিংহ থেকে বাঙালি মুসলমান চাষীদের এনে সেটা শুরু করা হয়। তাদের সংখ্যা ৫৪ হাজার থেকে বেড়ে পাঁচ লাখ হয়ে যায়।

১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারে আসামের কংগ্রেস নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল। তারা বাংলাভাষী অঞ্চল সিলেটকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ৬ই জুলাই এ ব্যাপারে গণভোট হয় এবং তাতে সিলেটের পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তির পক্ষে জয় হয়। করিমগঞ্জ ও কাছাড় নিয়ে নতুন জেলা তৈরী হয়। পরে অসমীয়াকে রাজভাষা করার বিরুদ্ধে সমস্ত জাতি প্রতিবাদমুখর হয়। এরপর বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয় এবং সেই আন্দোলনে একজন কিশোরীসহ ১১ জন শহীদ হন। ঘটনাটি ঘটে ১৯৬১ সালের ১৯শে মে।

১৯৪৬ সালের ফরেনারস্ অ্যাক্ট’এ  (Foreigner’s Act) কেউ অভিযোগ করলে অভিযোগকারীকে নয়, অভিযুক্তকে প্রমাণ দিতে হয় যে তিনি বহিরাগত নন। পরে শুধু আসামের জন্য ইল্লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট ডিটারমিনেশন অ্যাক্ট (Illegal Immigrant Determination Act) করা হয়, যা শুধু আসামের জন্যই ছিল। এখন যে এনআরসি (NRC) কঠোর হাতে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাতে ১৯৭১ সালের পর যেসব মানুষ আসাম এসেছে, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবার কথা বলা হয়েছে। আসামে যাঁরা আদি বাসিন্দা এবং যাঁরা আদি বাসিন্দা নন, সুপ্রীম কোর্টের রায় সত্ত্বেও তাদের মধ্যে বিভাজন রয়ে গেছে। অনেক মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে, সেখানে তাঁদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। শুভপ্রসাদ নন্দীমজুমদার বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে কখনো নাগরিকত্ব ঠিক করা যায় না। এরকম মীথ্ রয়েছে যে, বাংলা অসমীয়াকে গ্রাস করছে। অথচ অসমীয়া জনসংখ্যা কমছে, তার মূল কারণ বিভিন্ন জনজাতি তাদের নিজের ভাষার পরিচয় দিচ্ছে।

এখন এনআরসি (NRC) আসামের মানুষকে এক তীব্র সংকটে ফেলে দিয়েছে। এমন অনেক মানুষ নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন, যাঁরা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি এমনটা হতে পারে। কে বলে  দেবে এর সমাধান কোথায় লুকিয়ে আছে। শুভপ্রসাদের বলার গুণে বিষয়টা আমাদের অনেকের কাছে মোটামুটি স্পষ্ট হলো। বিশেষ করে আমার কাছে তো বটেই। সেদিন তাঁর বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর পর্বের পর গান না শুনে তো আসর শেষ করা যায় না। আমরা শুনলাম তাঁর ও তাঁর স্ত্রী জয়িতার গান। আষাঢ় সন্ধ্যা ভাল কাটল। আসামের সংকটাপণ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও আশাবাদ ছিল সবার মনে। সেই সঙ্গে শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদারের সাহচর্য্য উদ্দীপ্ত করল আমাদের।

ছবিঃ লেখক।