আসুক #MeToo ঝড়

বাংলাদেশেও কি উঠবে #MeToo আন্দোলনের ঝড়? আজ এই ২০১৮ সালে বসে ভাবতে হচ্ছে এই সমাজ কি মেনে নেবে নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের কাহিনির উন্মোচন? কিন্তু পৃথিবী জুড়ে নির্যাতিত নারী যে ভাবে একাই লড়াই করতে, প্রতিবাদ জানাতে উঠে দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হয় #MeToo আন্দোলন হয়তো এ দেশেও আছড়ে পড়বে ঝড় হয়ে। নারী তার মর্যাদার যুদ্ধে প্রকাশ্যে আঘাত হানবে আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য পুরুষের ওপর।  এই #MeToo আন্দোলন নিয়ে প্রাণের বাংলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে লেখা পাঠিয়েছেন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছেন এমন অধিকার কর্মী, সাংবাদিক, লেখক।

#MeToo আন্দোলন – বাংলাদেশে সম্ভব ?

রীতা নাহার

( সাংবাদিক ) #MeToo আন্দোলন ফেসবুক আর টুইটারে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এর শুরুটা হয়েছিল অন্যতম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘মাই স্পেস’ এ। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকর্মী তারানা র্বাক ২০০৬ সালে মাই স্পেস এ যৌন হয়রানির শিকার নারীদের অব্যক্ত বেদনার ভাষা তুলে ধরতে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন দুটি শব্দ- #MeToo । পরে তা অনেকটা প্রবচনের মত হয়ে যায়। তারানা র্বাক যৌন হয়রানির শিকার নারীদের নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন যার নামও ছিল #MeToo । আর এই তথ্য চিত্রে তারানা #MeToo ব্যবহারের নেপথ্যের ঘটনাটাও বর্ণনা করেন। ১৩ বছর বয়সী এক নারীর যৌন নিগ্রহের বর্ণনা দেন তার কাছে। এর উত্তরে তারানা র্বাক নিজেও তার ব্যথায় সমব্যথী, এটা জানাতেই বলেছিলেন #MeToo

তবে আজকের যে #MeToo আন্দোলন তার শুরুটা ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেনতা সৃষ্টির আহ্বান জানাতেই ফেসবুক এবং টুইটারে #MeToo ব্যবহার শুরু  করেন এদিন থেকে। প্রথম পোস্টে না জানালেও পরবর্তী একটি পোস্টে অ্যালিসা মিলানোও স্বীকার করেন, #MeToo ব্যবহারে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তারানা র্বাকরে অনুপ্রেরণাতেই।

অ্যালিসা মিলানোর #MeToo এক বছরের মাথায় এসে হয়ে উঠেছে বড় বিস্ফোরণের নাম। বিশ্বজুড়ে নানা শ্রেণী পেশার নারীরাই #MeToo তে যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন নিগ্রহ, হয়রানি এবং ধর্ষনের শিকার হওয়ার পাথরচাপা অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। বিশেষ করে হলিউড, বলিউডের বড় বড় শিল্পীরা যেভাবে পুরুষ পরিচালক থেকে সহ-অভিনেতাদের কাছে যৌন নিগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন, সেটা পুরো সভ্য সমাজকেই থমকে দিয়েছে। যদিও এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো কারও কারও জন্য এক ধরনের বিকৃত বিনোদনের খোরাকও হচ্ছে। সবচে বড়কথা- সত্য উদ্ঘাটনে, মুখোশ উন্মোচনে #MeToo এখন যৌন নির্যাতক, ধর্ষকদের কাছে বড় আতংকের নাম।

বাংলাদেশেও যদি #MeToo শুরু হয় তাহলে কি হবে? কিংবা এই প্রশ্নের আগে আরও একটা প্রশ্ন জোরালো ভাবেই তোলা যায়, ভারত কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে #MeToo আন্দোলন কি আদৌ সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তরে এক বাক্যে বলা যায়- ‘না’। এর বড় কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থায় যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে কিংবা ঘটনার স্বীকারে নারীকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় না। বরং নির্যাতনের শিকার নারীর পক্ষে নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও সোচ্চার হতে দেখা যায়। ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা থাকলেও মধ্যবিত্ত এবং এলিট শ্রেনীর দৃষ্টিভঙ্গী তুলনামূলক উদার। ভারতীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এখন এটা বোঝে যে কোনটা অপরাধ, কোনটা অপরাধ নয় এবং অপরাধের শিকার হলে প্রতিবাদ জানানোটা অপরাধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে?

একবার ভাবুন তো! যদি ঢালিউডের কোন নায়িকা বলিউডের তনুশ্রী দত্তের মত কোন বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করে বসেন! তাহলে এই সমাজ ব্যবস্থা সেটাকে কিভাবে দেখবে? এর উত্তরটা বছরখানেক আগে পাওয়া গিয়েছিল যখন নায়িকা অপু বিশ্বাস নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে তার গোপন বিয়ের খবরটা প্রকাশ করেছিলেন। খবরটা প্রকাশ করার পর অনেক বেশী সমালোচনার মুখে পড়েছেন অপু বিশ্বাসই। এমনকি শাকিব খানের নারী ভক্তদেরও কেউ কেউ অপু বিশ্বাসের বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনলেন শাকিব খানকে অসম্মানিত করার। কিন্তু এই প্রশ্নটা কেউ সামনে আনলেন না, সন্তান হওয়ার পরও শাকিব খান নিজেই কেন বিয়ের খবরটা দেননি? তার কি কোনো দায়িত্ব ছিল না? এরপর শাবিক খান অপুর কাছে প্রথমে গেলেন, স্ত্রী-সন্তানরে সঙ্গে থাকার ঘোষণাও দিলেন। কিছুদিন পর আলোচনা থেমে যেতেই শাকিব খান অপু বিশ্বাসকে ডিভোর্স করলেন। বিয়ে করে শাকিব খানের ক্যারিয়ার, খ্যাতি কিছুই হারাতে হয়নি। কিন্তু ভালবেসে বিয়ে করে অপু বিশ্বাসকে তার ক্যারিয়ার অনেকটাই হারাতেই হয়েছে। পড়তে হয়েছে প্রচন্ড সমালোচনার মুখে। বিয়ের মত বৈধ সম্পর্ক প্রকাশের কারণে একজন নারীর যদি এই অবস্থা দাঁড়ায় তাহলে যৌন নিগ্রহের কথা প্রকাশ করলে এই সমাজে তার অবস্থা কি হতে পারে? বোঝা যায়, এই সমাজ তাকে নষ্টা মেয়ে বলে তিরস্কার করবে, নির্যাতকের কিছুই হবে না। আর তাই এখনও পর্যন্ত #MeToo আমাদের দেশে শুরু হওয়াটাই অনেকটা অসম্ভব।

আবার এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটাও সামনে আছে। একজন নারী যখন #MeToo দিয়ে একজন নির্যাতকের চেহারা উন্মোচন করবে তখন ওই নির্যাতক প্রথমেই সম্মানহানি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিকৃত তথ্য প্রচারের অভিযোগে এই আইনে মামলা করে দিতে পারে। যদি অভিযোগ পরে সত্য প্রমাণিতও হয়, সত্য প্রকাশের দায়ে নারীকে শুরুতইে আর এক আইনী নিগ্রহের মুখে পড়তে হবে।  সমাজের নেতিবাচক চোখ তো আছেই। এখন নিজের অব্যক্ত বেদনার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে ডিজিটাল আইনের ফাঁদে পড়ার সমূহ আশংকাও আছে। কিছুদিন আগের একটা ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলে বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে। নামী একজন অভিনেতা, পরিচালকের বিরুদ্ধে নতুন একজন নায়িকা অভিযোগ তুললেন, সেই খ্যাতনামা অভিনেতা মেসেঞ্জারে কিছু বিকৃত রুচির বার্তা পাঠিয়েছেন যেগুলো যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। বার্তাটি সেই তরুণীর এক বান্ধবী ফেসবুক টাইমলাইনে প্রকাশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই নারীর বিরুদ্ধে পুরনো তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করে দিলেন সেই নামী অভিনেতা, পরিচালক। প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী তরুণীও পরে পর্ণোগ্রাফি আইনে সেই পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একবার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার শিকার নারী কি নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে আরও একবার আইনী নিগ্রহের শিকার হওয়ার ঝুঁকি নেবেন? তারওপর এখানে অধিকংশ কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এখনও নারীবান্ধব নয়। মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই নারীকর্মী নিয়োগেও আগ্রহী হয়না। এমন বহুমুখী লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের নারী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রে প্রায়শই যৌন নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে মেয়েদের। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ধর্ষণের ঘটনাও। এখনও এসব অপরাধের জন্য দায়ী করা হয় নারীকে। দৃষ্টিভঙ্গী আর মানসিকতার পরিবর্তন জরি।

এখনও বাংলাদেশে #MeToo আন্দোলনের মতো সমাজে ভদ্রবেশে ঘাপটি মেরে থাকা ধর্ষক, যৌন নির্যাতকের মুখোশ উন্মোচনের আন্দোলন শুরুর সম্ভাবনা খুব একটা দেখি না। তবু সময়ের দাবি কিংবা প্রয়োজন বলে একটা কথা আছে। সময়ই ঠিক করে দেবে আমাদের দেশে #MeToo এর ভবিষ্যতটা কি হবে?

#MeToo সমাজ ও রাষ্ট্রের মুখে নারীর দেয়া চড়

শারমিন শামস্

 ( লেখক, সাংবাদিক) পিতৃতন্ত্রের মুখে লাথি কষানোর কাজটি শুরু হয়ে গেছে বেশ আগেই। পৃথিবীর নানা কোনে নারীবাদি আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠবার সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসতে শুরু করে পিতৃতন্ত্রের আদিম কাঠামোটি। পুরুষের আধিপত্য আর শোষন নারীর অস্তিত্বকে চিরকাল দমনের অভিপ্রায়ে পরিচালিত হয়ে এসেছে। এই দমনটুকু না করতে পারলে পুরুষতন্ত্র টিকবেনা। পুরুষতন্ত্র তার ক্ষমতার গদিটি ধরে রাখতে মরিয়া। এ সমাজে পিতৃতান্ত্রিকতার ভিত্তি প্রস্তর এমন ভাবে গেড়ে বসেছে যে, পুরুষের শোষক রূপটি সমাজের কাছে অতিস্বাভাবিক ও চিরন্তন। এটি মেনে নেয়াই নারীর ভবিতব্য। যে নারী এই শোষন অস্বীকার করে, নিজের শক্তিতে মাথা তুলতে চায়, সমাজ তার সাহসী মাথাটি মুড়ে দিতে লম্ফ দিয়ে ওঠে। নারীর সত্য কথন ও সাহস পিতৃতান্ত্রিক সমাজের দু’চোখের বিষ।

তবু নারীর বোধোদয় হয়েছে। এ সমাজে বোধোদয় ঘটাটাই একটি বড় সংগ্রামী অর্জন। কিন্তু এরপরের রাস্তাটি রক্তে রাঙা। যখন নারী তার বোধের রাস্তাটি ধরে হেঁটে যায়, অধিকার আদায়ের যুদ্ধে নামে, তখন লাখো শ্বাপদ ধেয়ে আসে। নারীর পুরো অস্তিত্ব আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে সমাজ। নারীর এ যুদ্ধে শুধু অধিকার নয়, তার বিরুদ্ধ ঘটা নানা অন্যায়ের প্রতিবাদ, প্রতিকার, বিচার ও ক্ষতিপূরণ আদায়ও যুক্ত হয়। তখন পথ হয়ে ওঠে দ্বিগুন আঁধারে পরিপূর্ণ। নারীর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যায় পুরো সমাজও রাষ্ট্র। বিগত কয়েক দশকে নারীবাদ আন্দোলন শুরু ও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ক্রমাগত রক্তপাতের, আঘাতের ধারাবাহিকতাও অব্যাহত রয়েছে। এ লড়াইয়ে নারী একা। নারীবাদ বড়ই নিঃসঙ্গ।

এরকম একটি অবস্থায় #MeToo আন্দোলন শুরু। নিঃসন্দেহে নারীবাদ আন্দোলনে #MeToo একটি বড় মাইল ফলক।গত বছর, মানে ২০১৭ সালের এই অক্টোবরেই #MeToo আন্দোলনের শুরু। আমেরিকান অভিনেত্রী আলিশা মিলানো টুইটারে এর সূচনা করেন। তিনি যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার মেয়েদের উৎসাহিত করেন যেন তারা নিজেদের ওপর ঘটা সহিংসতার কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। এতে সমাজে যৌন হয়রানির ব্যাপকতা সম্পর্কে সচেতনতা ও এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি। পরে এই #MeToo এর সূত্র ধরে সমাজের রাঘব বোয়ালদের মুখোশটি খুলে যেতে শুরু করে এবং এক সময় তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। যার সর্বশেষ ঢেউটি গিয়ে আছড়ে পড়েছে ভারতে। প্রথমে বলিউডে পরে সেটি সাংবাদিকতার জগৎ ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। এখন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরের বিরুদ্ধে মিটু নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। সাংবাদিক থেকে রাজনৈতিক বনে যাওয়া আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন তারই সাবেক সহকর্মীরা। মূলত অল্প বয়সী ও চাকরিতে নতুন আসা নারীরাই তার হয়রানির শিকার হত। দ্য টেলিগ্রাফ এবং এশিয়ান এজে কাজ করার সময় চাকরির ইন্টারভিউ নিতে তিনি হোটেল রুমে মেয়েদের ডাকতেন বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তার অফিসের দরজা বন্ধ করে নারীদের হয়রানি করতেন আকবর।প্রিয়া রামানি একাই নন, তার টুইটের পরে আরও একাধিক নারী সাংবাদিক আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, প্রেরণা সিংহ বিন্দ্রা, গাজালা ওয়াহাব, সুতপা পাল, অঞ্জু ভারতী, সুপর্ণা শর্মা, সুমা রাহা, মালিনি ভুপতা, কণিকা গেহলট, কাদম্বরী এম ওয়াড়ে, মাজলি ডি পুই কাম্প ও রুথ ডেভিড।এদিকে প্রিয়া রামানির বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও দায়ের করেছেন আকবর।বলছেন, রাজনীতিতে তার বিরোধীপক্ষ প্রিয়াকে ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনছে।

এদিকে নানা পাটেকর আর অভিতাভ বচ্চনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। অভিনেত্রী তনুশ্রী ও স্বপ্নার #MeToo

ঝড় বইয়ে দিচ্ছে এবং বরাবরের মত স্লাটশেইমিংও চলছে। এও বলা হচ্ছে এসব অভিযোগ মিথ্যা। যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে এটি বলাই সবচেয়ে সহজ কারণ এধরণের কাজ গোপনেই করা হয় এবং তার কোন প্রমাণও সাধারণত থাকেনা।

নারীবাদ নিঃসঙ্গ সে কথা আগেই বলেছি। নারীর লড়াই ততোধিক নিঃসঙ্গ।নারীবাদের যুদ্ধে যুক্ত হওয়া নতুন কৌশল #MeToo ও নারীকে একাই লড়তে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #MeToo দিয়ে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির বীভৎস বর্ননা লিখবার পর পুরোসমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নারীর ওপর, তাতে এটুকুই বলা যায়, পথ এখনও অনেকটা বাকি। লড়াই আছে আরো। রক্ত ঝরবে আরো অনেক। কারণ পিতৃতন্ত্র নারীর সত্যকথন নিতে প্রস্তুত নয়। যৌন হয়রানিকে নানাভাবে পুরুষের পক্ষে নিয়ে আসবার কৌশল এখনও বর্তমান। হয় বলা হবে যে অভিযোগকারিনী মিথ্যে বলছেন, অথবা বলা হবে কোন একটি সুবিধা নিতে অথবা কোন উদ্দেশ্য পূরণে তিনি মিথ্যেকথা বলছেন। এবং সবশেষে তার দিকে ছুঁড়ে দেয়া হবে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রটি, তা হলো স্লাটশেইমিং।এতো মেয়ে থাকতে তার সঙ্গেই কেন হলো?সে কী এমন সুন্দরী যে ওর সঙ্গে হলো? সে নিশ্চয়ই অশ্লীল পোশাক পরেছিলো। মেয়েটি নিশ্চয়ই পুরুষটিকে প্রভোক করেছিলো। মেয়েটি নিশ্চয়ই পুরুষের কাছ থেকে কোন সুবিধা নিতে চেয়ে না পেরে এখন সব বলে দিচ্ছে, ইত্যাদি।

ঘটনা যে ভাবেই আগাক, তাতে নতুনত্ব কিছু নেই। সমাজও নতুনত্ব কিছু চায়না। পুরোনো বস্তা পচা চিন্তা, বক্তব্য ও কৌশলেই দিব্যি তার কাজ চলে যাচ্ছে। কারণ সমাজ এখনো সেই মধ্যযুগীয় চিন্তার খোলসে আটকে আছে। ফলে পুরো সিস্টেমকে নারীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে খুব বেগ পেতে হয় না। নারী তাই যতই #MeToo বলে টুইট করবে, পিতৃতন্ত্র ততোই তার শানানো ছুরি হাতে পিছু ধাওয়া করবে।

আনন্দের বিষয় হলো, ধাওয়া চলছে বটে, মুখ কিন্তু বন্ধ হচ্ছেনা। তুমি যখন বিশাল নদীতে বাঁধ দিয়ে তার শক্তিটুকু রুখে দাও তখন নদী একাকীই ফুঁসতে থাকে। কিন্তু বাঁধের বিপরীতে তার পাল্টা আঘাতও বাঁধ ভাঙ্গার চেষ্টা থেমে থাকে না। এই ক্রমাগত চেষ্টা তাকে আরো অপ্রতিরোধ্য আর জেদি করে তোলে। আরো শক্তিময় আর আত্মবিশ্বাসী করে। এবং একদিন বাঁধে ফাটল ধরে। ফাটল থেকে একদিন ভাঙন আসে।বাঁধ ধসে পড়ে।

#MeToo  এই সমাজব্যবস্থার প্রতি নারীর অনাস্থা ও বিচারহীনতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই সমাজ পুরুষের অন্যায়কে অন্যায় মনে করে না। একের পর এক অপকর্ম করেও পুরুষ পার পেয়ে যায়, তা সে যত বড় শিক্ষিত, বিখ্যাত, সৃষ্টিশীল পুরুষই হোক না কেন। বরং যে যত বড় পুরুষ যে ততো বেশি তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নারীর ওপর দমন পীড়ন চালায়। #MeToo প্রমাণ করে, নারীর বিচার চাইবার কোন জায়গা নেই। রাষ্ট্র নারী নিরাপত্তা দিতে পারে না এবং পীড়নের পর বিচার করে অপরাধীকে শাস্তিও দেয় না। তাই নারীকে বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয়েছে নিজের কৌশল।

#MeToo এই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখে নারীর দেয়া চড়। এই চড় দেয়ার কারণে তাকে অবশ্যই অনেক ঝড়ঝাপটা পোহাতে হবে। তাতে কি থেমে যাবে সব?

না, থামবে না। বরং এর গতি অপ্রতিরোধ্য। এ ছোঁয়া এরই মধ্যে এসে লেগেছে আমাদের দেশেও। আশা করতে পারি এদেশের মেয়েরাও সাহসী হবে, অকপটে লিখে দেবে তার ওপরে ঘটা সকল অন্যোয়ের কথা। খুলে দেবে সব মুখোশ।সেদিনের অপেক্ষায় আছি।

লিখুন….#MeToo

চৈতি আহমেদ

( সম্পাদক নারী নিউজ) ভারতের নারীরা #MeToo তে সাড়া দিয়ে একের পর এক মুখোশ খুলে দিচ্ছে যৌন নিপীড়ক হোমড়া চোমড়া সব পুরুষদের। তনুশ্রী নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পর একে একে সরব হয়ে উঠছে আরো অনেকে। তনুশ্রীর অভিযোগটি ছিলো এমন –‘ দশ বছর আগে তনুশ্রী দত্ত ‘হর্ন ওকে প্লিস’ ছবির জন্য একটি আইটেম গানের শুটিং করেন। শুটিং করার সময় তার সঙ্গে পাটেকার অশোভন আচরণ করেছিলো।’

এই অভিযোগ ওঠার পরে অভিযোগ উঠেছে পরিচালক সাজিদ খানের বিরুদ্ধেও। এই কারণে ‘হাউজফুল’ সিনেমার পরিচালক সাজিদ খানের ছবির শুটিং বন্ধ করে দিয়েছেন অক্ষয় কুমার। যতদিন না সাজিদ খান নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছে ততোদিন অক্ষয় আর তার ছবিতে অভিনয় করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

তনুশ্রী প্রথম দিকে তার সহকর্মীদের নিজের পাশে না পেলেও এখন অনেকেই তার পাশে এসে তাকে সমর্থন ও সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন। বলিউডের অভিনেত্রী দিয়া মির্জাও #MeToo আন্দোলনকে জোরাদার করার আহ্বান জানিয়েছেন সকল নারীদের প্রতি।

প্রিয়া রামানি নামের একজন সাংবাদিক যৌন হয়রানীর অভিযোগ তুলেছেন তার আর্টিকেলে। মোদী সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর যিনি একজন সাবেক সম্পাদকও তার বিরুদ্ধেই উঠেছে এই অভিযোগ। একাধিক নারী সাংবাদিকও অভিযোগ করেছেন এই মন্ত্রীর নামে। প্রিয়া রামানি তার আর্টিকেলে লিখেন যে এম জে আকবর অশ্লীল ফোন কল, ম্যাসেজ এবং অসঙ্গত মন্তব্যে পারদর্শী ছিলেন।

বাংলাদেশের সাহসী নারীদের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি। #MeToo আন্দোলন এমন একটি আন্দোলন যা -নারীর ভেতর থেকে লোক লজ্জা, ভয়কে জয় করে নারীর আহত সত্তাকে মেলে ধরে, পুরুষতন্ত্রের দূর্লঙ্ঘনীয় অপরাধের গোপন অচলায়তকে ধ্বসিয়ে দিচ্ছে একে একে। এতোদিনে নারী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়কে প্রকাশ্যে নিয়ে এসে প্রতিকারের জন্য সরব হয়ে উঠছে। এতদিন একটা লোকলজ্জা নামের জুজুর ভয়ে তারা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নকে গোপনে নিজের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে বহন করে করে নিজেকেই তিল তিল করে ক্ষয়ে ফেলছিলো নারী। অথচ অপরাধী পুরুষ দিব্বি বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সময়কে। এই লোকলজ্জার জুজুও ওই পুরুষেরই বানানো। যেনো পুরুষের লোকলজ্জা থাকতে নেই, এ লজ্জা যেনো একা নারীরই। অথচ যে সব নারী আজ পর্যন্ত #MeToo আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তারা জানেন এই লজ্জা সমস্ত পৃথিবীর। যৌন নিপীড়নের শিকার নারীটির একার নয়।

পশ্চিমের নারীরা এই জুজুর ভয়ে কাটিয়েছে আরো আগেই। আমেরিকান অভিনেত্রী অ্যালিসা মেলিনোর- হলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতা হার্ভে ওয়েইনস্টেইনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে ২০১৭ সালে ১৩ অক্টোবর প্রথম তার টুইটারে লিখেন –‘আপনি যদি যৌন হয়রানীর শিকার হয়ে থাকেন তাহলে এই টুইটের প্রতি উত্তরে #MeToo লিখুন।’ অল্প সময়ের মধ্যেই এই অভিনেত্রীর টুইট পাঁচ লক্ষবার টুইট হয়। ক্রমেই তা ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।

বাংলাদেশের নারীরাও অচিরেই এই লোকলজ্জার জুজুর ভয় কাটিয়ে উঠে সরব হবেন, এটা প্রত্যাশা নয় বিশ্বাস। চলুন আমরাও ভেঙে ফেলি পুরুষতন্ত্রের জুজুর অচলায়তন। কি ভাবছেন? লিখুন….#MeToo

পাশ্চাত্যের সাথে তাল মিলিয়ে মর্যাদার লড়াই এ #MeToo

কাশফিয়া ফিরোজ

 (নারী উন্নয়ন কর্মী) #MeToo পুরুষের জন্য পুরো পৃথিবী, নারীর শুধু ধর্ম আর চরিত্র আবহাওয়া কিছুটা থমথমেই বটে। ঝড় আসার পূর্ব মুহূর্তে যে শুন্যতা বিরাজ করে , অনেকটা সেরকম। কোন এক অজ্ঞাত কারণে ঠাহর করা যাচ্ছেনা ঠিক কোন দিক থেকে ঘন্টায় কত কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসবে। তবে, আসছে এটা নিশ্চিত। মাত্র এক বছর আগেও কেউ আঁচ করতে পারেনি দূর্যোগের ঘনঘটা। চরম প্রতাপশালী মার্কিন প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনই কি কোনভাবে আঁচ করতে পেরেছিলো? কিংবা ভারতবাসীরাই কি ভেবেছিলো পশ্চিমা হাওয়ায় এতোদিনের চেনা চৌকাঠ অতিক্রম করবে রক্ষণশীল সমাজের নারীরা? এই উপমহাদেশ কি প্রস্তুত ছিলো প্রকাশ্যে নারীদের মুখ থেকে অবলীলায় প্রকাশ করা ‘যৌন নির্যাতনের’ অব্যক্ত অভিজ্ঞতা শোনার জন্য? ‘আমিও যৌন হয়রানীর শিকার’ – এই কথা প্রকাশের সাহস হঠাৎ করে নারীদের মাঝে এলো কোত্থেকে ? ২০০৬ সালে প্রথম যৌন নির্যাতন বিরোধী #MeToo আন্দোলনের সূচনা করেন কৃষ্ণাঙ্গ সমাজকর্মী টারানা বার্ক । অতটা সাড়া না জাগালেও ছোট পরিসরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে চলছিলো যৌন নির্যাতন বিরোধী প্রচারণা। তবে বড়সড় কাঁপুনি ওঠে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে হলিউডের প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের যৌন কেলেঙ্কারির খবর ফাঁসের সূত্র ধরে । মার্কিন অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানোর দায়ের করা অভিযোগের সূত্র ধরে পরবর্তীতে #MeToo এর মাধ্যমে যৌন নির্যাতন বিরোধী প্রচারণা আবারও প্রাণ ফিরে পায়। যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা প্রকাশ করতে এবং সর্বপরি নারীদের উৎসাহিত করতে এ প্রচারণা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে।অবাক করা ব্যাপার হলো, #MeToo শুধু নারীদের যৌন নিপীড়নের কথাইবলছেনা বরং পুরুষদের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। যে আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিলো রূপালী পর্দার তারকাদের চাপা কষ্ট নিয়ে তা আজ ঘুরে বেড়াচ্ছে সিনেট থেকে কেবিনেটে। কিসের প্রযোজক কিসের নায়ক; রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, কবি , শিল্পী , সাহিত্যিক কিংবা খেলোয়াড় , বাদ যাচ্ছেনা কেউই । অফিসের কর্তা ব্যক্তি কিংবা শিক্ষক, ধর্মযাজক কিংবা মাছ বিক্রেতা , ঘুরে ফিরে গল্পের শেষ এক জায়গায়। যতই গাই সাম্যের গান আর যতই করি সমতার অঙ্গীকার , এখনও কিন্তু ‘আমাদের’ সমাজ নারীর বন্দনা শুনতে প্রস্তুত নয়। প্রস্তুত নয় নারীর ‘ইচ্ছা’ কিংবা নারীর মুখ থেকে ‘যৌন’ শব্দটি শুনতে। সেক্ষেত্রে, একজন নারী যৌন ইচ্ছা/অভিব্যক্তি, যৌন চাহিদা, যৌন তুষ্টি, যৌন হয়রানী, যৌন নির্যাতন, যৌন সংক্রমণ ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়/শব্দ মুখে আনবে বলাই বাহুল্য।
একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একজন নারী তাই মন খারাপের বিকেলে পার্কে গিয়ে বসে না , পাছে লোকে যৌনকর্মী ভাবে; এখনও মানুষ বিশ্বাস করে যৌন-কর্মী বা বৈবাহিক সম্পর্ক আমাদের চাহিবা মাত্র যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার দেয় ; বিশ্বায়নের যুগে এখনও আমরা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে শিশু-বিবাহকে সর্মথন করি ; অবাধ তথ্য প্রযুক্তির যুগে এখনও নারীকে পরাস্ত করার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেই এসিড সন্ত্রাস কিংবা ধর্ষণের মতো পাশবিক ক্রিয়াকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বব্যাপী আমাদের অনেক অর্জন থাকা সত্ত্বেও , আজও আমরা নারীর প্রতি সহিংতা প্রতিরোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি নাই। আর পারিনি বলেই আজো আন্দোলন ঠিক সেখানেই অবস্থান করছে যেখান থেকে তসলীমা শুরু করেছিলেন সেই নব্বইয়ের দশকে। আর তাই এখনও আমরা বিশ্বাস করি, যৌন হয়রানী বা সহিংতার জন্য নারীর পোশাক দায়ী।মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র বলছে, ২০১৭ সাল জুড়ে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে যৌন সহিংসতায় নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা। হলিউডের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর গত অক্টোবর’১৮ মাসে বিবিসি‘র এক জরিপে উঠে এসেছে, ব্রিটেনে কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশুনার জায়গায় অর্ধেক নারীই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, এমনকি এক পঞ্চমাংশ পুরুষও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির শিকার প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী বিবিসিকে জানান, ঘটনার পর তারা এ বিষয়ে কোনো রিপোর্ট করেননি বা কাউকে জানান নি। একইভাবে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত গবেষণাণুযায়ী , ৮১ শতাংশ নারী প্রতিকার পাবে না বলে পুলিশের দ্বারস্থ হয় না এবং ৬২.৪ শতাংশ নারী সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকে।
২০১৬ সালে কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ সিএইচআরআই- এর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশের পুলিশে কর্মরত নারী কনস্টেবলদের ১০ ভাগের বেশি সদস্য যৌন হয়রানির শিকার হন। উপ-পরিদর্শক ও সহকারী উপ-পরিদর্শকদের শতকরা তিন ভাগ এ ধরনের ঘটনার শিকার হন। ক্যাডার পর্যায়ের নারী পুলিশরাও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বাইরে নন। দু:খজনক হলেও সত্যি যে অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানোর মতো সমর্থন তসরীমা সাসরীন অথবা টারানা বার্ক পাননি। সামাজিক মাধ্যমের সুবিধা থেকে তারা ছিলো বঞ্চিত। তবে তারাও আজ MeToo আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ব হয়েছেন। এতদসত্ত্বেও , বিশ্বজুড়ে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের অনেকেই #MeToo এর প্রচারণায় এগিয়ে আসেন এবং নিজের ওপর ঘটে যাওয়া হয়রানির ঘটনা প্রকাশ্যে আনেন।যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর সমর্থন জানিয়ে বেশ বড়সড় মিছিলও হয়েছে হলিউডে। সাম্প্রতিককালে ভারতের ১১ নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা চলমান #MeToo আন্দোলনের প্রতি সর্মথন জ্ঞাপন করে যাঁদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের সঙ্গে কাজ না করার বিষয়ে লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সরাসরি মুখ খুলতে দেখা যায়নি কাউকেই । রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, ধর্মগুরু, মিডিয়া কিংবা প্রশাসন, কোন অবস্থার পরিপ্রক্ষিতেই নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার উদ্বৃতি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে দেখা যায়নি এখন পর্যন্ত কোন নারীকে । সরকারি, বেসরকারি , আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, গণপরিবহন, পার্ক, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনপরিসরে যৌন সহিংসতার মাত্রা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি #MeToo ক্যাম্পেইন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো নারীকে সম্ভ্রম আর ধর্মের বেড়ীতে আবদ্ধ করে রেখেছে যুগের পর যুগ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর ধারাবাহিকতা এ জাতি বয়ে চলেছে বংশানুক্রমিক ভাবে।আর তাই আজও সহিংসতার শিকার নারী আড়াল খোঁজে আর ধর্ষক পুরুষত্বের উল্লাসে মাতে।পাশ্চাত্যের সাথে তাল মিলিয়ে মর্যাদার লড়াই এ #MeToo প্রবাহের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবার এইতো সময়।

#MeToo

রুম্পা সৈয়দা ফারজানা জামান

(লেখক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী) ঘটনার সুত্রপাত তখন যখন হলিউডের নামদার ব্যক্তি নারী কেলেঙ্কারীতে মুখোশ হারালেন। হার্ভে ওয়েনস্টেইনের এই কাহিনী সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় এবং ধীরে ধীরে  কেঁচো খুড়ে সাপ বের হবার মতই বের হয়ে আসতে থাকে নারীদের জমানো কথা! কে নেই সেই ধামাচাপা দেওয়া গল্পে! আছেন সালমা হায়েকের মত জাঁদরেল নায়িকা আবার আছেন এমন কেউ যে হয়তো কখনো আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সাহসই করতে পারেনি। শুরু হলো #MeToo আন্দোলন! বেড়িয়ে পড়লো থলের বিড়াল।

কেলেঙ্কারির এই কালো জল গড়িয়ে এসে পৌছেছে পশ্চিম থেকে দক্ষিণে। ভারতে জোড়ে শোরে চলছে #MeToo এর জোয়ার। তাতে ভাসছেন কঙ্গনা রানাউতসহ আরও অনেক নারী, যারা মুখ খুলেছেন। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য অনেক হাতি ঘোড়াসম তারকা এই ব্যাপারে নিশ্চুপ! একেবারে স্পিকটি নট! যখন প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে নিয়ে ট্রল করা হয়েছিল তখনও বড় বড় তারকারা এ ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিলেন। মৌনতা ভাঙেননি অমিতাভ বচ্চনের মত তারকাও। কিন্তু কেন! সেটা ট্রল হোক বা #MeToo এর- দায়িত্ব কি তারা এড়িয়ে যেতে পারেন?উল্লেখ্য #MeToo  এর অনেক আগে থেকেই মিডিয়ার লোক “কাস্টিং কাউচ” বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত। আমরা সরাসরি ভাবে বলতে পারি কাজ পাওয়ার আগে সমঝোতার অন্যরূপ। যে বিষয়টা নিয়ে বলতে এত নারাজ দক্ষিণ এশিয়া – সে বিষয় নিয়ে অন্তত ভারতেই একাধিকবার একাধিক সিনেমায় প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। পেইজথ্রি, বালাকী বাই চান্স সিনেমাগুলোর মাধ্যমে এই সকল সমঝোতার কথা এসেছে বার বার। তবুও যখন ভিকটিম এটা নিয়ে কথা বলে আমাদের চর্চা হয় তাদেরই চরিত্র নিয়ে। তার কতবার প্রেম হয়েছিল- সেই ভিকটিমই বহুগামী কিনা বা তার প্রেমটি বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে কিনা। আমরা ভুলে যাই- ভিকটিম যাই হোক- তার অপর প্রান্তে আছে এমন কেউ যে ভিকটিমকে ব্যবহার করেছে।

অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে ফারিয়া ফাহরিন নামের একজন পারফরমার নিজের কাজ না পাওয়া ও সমঝোতা না করার প্রেক্ষিতে ডিজিটাল প্লাটফর্মে কিছু বললে তাকেও এভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তার কোন শব্দ ঠিক ছিলো বা ঠিক ছিলোনা- তার উচ্চারিত নামে ভুলছিলো কিনা- এসব কথায় না মেতে তার তুলে ধরা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলে হয়তো বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যেত!কেউ কি হলফ করে বলতে পারবেন এদেশে #MeToo এর উদাহরণ নেই?বা কাস্টিং কাউচ নেই? কেউ কী শত ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারবেন এদেশের বিভিন্ন সেক্টরে কোনও মেয়ে বা ছেলেকে কখনো সমঝোতা করতে হয়নি?

বলতে পারবেন না! অতএব এটাকে লুকিয়ে নয় এ নিয়ে আলাপ করাটাই শ্রেয় ছিলো! অনেকটা মুখ বুজে বেঁচে থাকার মতন! যা আমাদের মা-খালারা শিখিয়েছিলেন,- কেউ গায়ে হাত দিলে তাকে কিছু না বলে নিজে লুকিয়ে যাও! খুব বেশি হলে ওই লোকটার সঙ্গে মিশবে না। বাসে কখনো বাড়িতে আসবেনা! তাতে কি ঘর-সীমানায় এই হ্যারেজমেন্ট কমেছে! বরং ঘরের বাইরে যেখানে সেখানে বাড়ছে ভিকটিমের উপর সুবিধাভোগীর উৎপাত। এমনকী আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে যা জেনেছি- ভিকটিমকেই তার পোশাক বা আচরণ দিয়ে দোষারূপ করা  হয়! কিন্তু আমরা ভুলে যাই তনুর মত ধর্মীয় পোশাকে আবৃত নারীও ধর্ষনের শিকার হয়! মৃত্যুবরণ করে।

আলাপে যখন #MeToo আমি আবারও বলবো, ফারিয়া সত্য বলছে না মিথ্যা বলছে সেটা বিচার করাই শ্রেয় ছিলো। তাকে ধমকে ধামকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়। আরেক পরিচালকের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ তুললে একই ঘটনা ঘটেছে। যেন মেয়েটারই দোষ! দোষ কার তা বের করবে আইন! আপনার বা আমার বিশ্বাস না। কারন জানেন তো- মায়েদের কাছে কখনই নিজের সন্তান দোষী হয় না। ড. মেহেরুনেন্সার ছেলে মুনীর খুন করার পরেও জল কম ঘোলা হয়নি। কিন্তু মা বিশ্বাস করুক বা না করুক- সত্য হলো- মুনীর একজন খুনি।

কেন এই ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা? কোনো ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচানোর জন্য? কাউকে লোক দেখানি সম্মান প্রদর্শনের জন্য না কী মিথ্যার স্বর্গে বাস করার জন্য? কেউ কি বুকের ভেতরে আগ্নেয়গিরি পুষে বেঁচে থাকতে পারে?পারে না! কম বয়সীর মৃত্যু, আত্মহত্যা অতিরিক্ত মাদক সেবন দিয়ে কি আজও আমরা বুঝতে পারছিনা যে কত শত মানুষ কথা  না বলতে পারার দায় নিজের জীবনের বিনিময়ে মেনে নিচ্ছে?

আমাদের দেশেও #MeToo হওয়া প্রয়োজন এবং দেশের সব সেক্টরে হওয়া প্রয়োজন! কেন আমাদের সমঝোতার বলি হতে হবে? কেন একটি মেয়ে বা ছেলে নিজের মেধা দিয়ে এগিয়ে যেতে ভয় পাবে শুধুমাত্র শরীরি ছলনার জালকে ভয় পেয়ে?কেন আমরা আদ্যিকালের অভিভাবক হয়ে নির্যাতনের শিকারকেই ধমকে চাপা দিয়ে রাখবো! আমরা কি চাই আমাদের সন্তানও #MeToo দিয়েই শুধু বসে থাকুক? নাকী যুদ্ধে ফিরুক। তাদের বিপক্ষে যারা নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহারে হয়েছে বাদশাহ নামদার!

অলংকরণ: প্রাণের বাংলা