আহারে বিহারে পাহাড়ে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রভাতী দাস

‘মিলিয়ন ডলার ভিউ’- নামটি দেখে হেসেছিলাম খুব, সে কেমন ভিউ রে বাবা, এক্কেবারে এমন নাম দিতে হলো! টেনেসি যাবো, গ্রেট স্মোকি মাউন্টেইন ন্যাশনাল পার্ক দেখতে। সেখানে গিয়ে থাকার জন্য কেবিন বুক করবো বলে এয়ার বিএনবি’র লিষ্টিং দেখছিলাম। তখনই এই নামের কেবিনটি নজরে পড়েছিলো। এবার হোটেল বাদ দিয়ে কাঠের কেবিনে বা আমেরিকায় যাকে বলে ‘লগ কেবিন’ তাতে থাকবো বলে পরিকল্পনা করেছিলাম। মানে, অরণ্য-পাহাড়েই যখন যাবো, তখন তার পুরো আমেজটুকুই যাতে পাওয়া যায় সেই চেষ্টাই করছিলাম। আর করোনার পাল্লায় পড়ে আইসোলেশন, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং-এর জন্যও হোটেলের থেকে পার্সোনাল কেবিন-ই বেশী নিরাপদ মনে হচ্ছিলো। মিলিয়ন ডলার ভিউ নাম শুনে আর রিভিউ পড়ে একে বাদ দিয়ে অন্য কোন কেবিন-ই তেমন মনে লাগলো না। আর এই কেবিনটি গেটলিনবার্গ নামে টেনেসির ছোট্ট যেই শহরে, সেটিও খুব ছিমছাম, সুন্দর…তাই ভাড়া একটু বেশী হলেও মা এবং মেয়ে(দেবী) মিলে এটি-ই বুক করা ফেললাম। আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে বর মিটিমিটি হাসছিলো, আর সতর্ক করে দিচ্ছিলো বেশি আশা করে আশাহত না হতে।

কাঠের বাড়িতে আগেও থেকেছি । বরিশালের অনেক বাড়ি-ই কাঠের ছিলো একসময়। বরিশালে জীবনের বেশ কয়েকটি বছর কাটিয়েছি বলে কাঠের বাড়ি আমার কাছে নতুন কিছু নয়। কাঠের বাড়ি আর লগ কেবিন এক হলেও, ‘লগ কেবিন’ শব্দটি যেনো অনেক বেশী রোমাঞ্চকর। বুদ্ধদেব গুহ আর সমরেশ মজুমদারের উপন্যাসে পড়া আসামের চা বাগান, জঙ্গল, বুনো হাতি সমস্ত কিছু মনে পড়ে যায়, কিশোরী বেলার সেই ঘোরলাগা দিনগুলো ফিরে আসে যেন…।

‘মিলিয়ন ডলার ভিউ’ তে পৌঁছুতে পৌঁছুতে বিকেল হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সূর্য তখনও অস্তে যায়নি। ছোট্ট যে পাহাড়ি শহরের গা ঘেঁষে ড্রাইভ করে উঁচুতে উঠছিলাম, সেটি বই-এ পড়া দার্জিলিং-এর মতো। আমি কখনও দার্জিলিং যাইনি, তবু এই সরু পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে উপড়ে উঠতে উঠতে নিচের দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই ছোট্ট টুরিস্ট শহরটি হয়তো দার্জিলিং এর মতই হবে। পাহাড়ের ধার ঘেঁষে ঘেঁষে ঝুলে থাকা কাঠের বাড়ি বা লগ কেবিন সব। কেবিনের সামনে অনেক খুঁজে, অনেক চেষ্টায় বানানো কার পার্কিং এর জায়গা। বাড়ির সামনের গারবেজ বিনগুলোকে লোহার জালি দেয়া শক্ত বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে খুব কায়দা করে আটকে রাখা দেখে বোঝা যাচ্ছিলো, এই পথে ভালুকের চলাচল নিয়মিত। কেবিনগুলোর কত যে নাম, বোঝা যায় এই এলাকার এইসব লগ কেবিনগুলোর সবই মোটামুটি পর্যটকদের দখলে। বেশ অনেকটা পাহাড়ি পথ ভেঙে, পাহাড়ের প্রায় চুড়ায় উঠে তবেই আমাদের কেবিনের দেখা পাওয়া গেলো। যেমনটি দেখেছিলাম ছবিতে, পাহাড়ের একদম ধার ঘেঁষে ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়ানো, ‘মিলিয়ন ডলার ভিউ’। আমাদের দরজার বাইরে থেকে কেবিনটি দেখেই অনেক ভালো লেগে গেলো, আর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে সেই ভালোলাগা আরো বাড়লো। মেয়েরা দু’জন দৌড় ঝাপ করে উপর নিচের সবঘরগুলো কেমন, কী কী আছে দেখায় যখন ব্যস্ত, আমি ভেতরের দরজা খুলে পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি…অরণ্যের এতোটা একান্তে…পাহাড়ের বুকটি ঘেঁষে এমন করে বাস করিনি আগে কখনো… আমি মুগ্ধ। যদিও বুঝলাম, সূর্যাস্তের পাহাড় বা অরণ্য দেখবার জন্য এই পূবমুখো বারান্দাটি তৈরি হয়নি, এর সব আয়োজন সূর্যোদয়ের জন্য। তবুও পাহাড়ের গা বেয়ে ধীরে নেমে আসা সন্ধ্যা দেখতেই অসাধারণ লাগছিলো, আমি আবিষ্ট মুগ্ধতায়।

রাতের অনেকটা সময়ও কেটেছে বারান্দাতেই। হাজারো মেঘের ঘুরাঘুরি অথবা উড়াউড়ি চাঁদকে আড়াল করেই রেখেছিলো, লক্ষ লক্ষ ঝিঁঝিঁ পোকার অক্লান্ত আওয়াজ পাহাড় আর অরণ্য্যের মৌনতা ভেঙে দিচ্ছিলো। আবারও বুদ্ধদেব গুহ, আবারও সমরেশ মজুমদার…অরণ্যের দিনরাত্রি… আহা!

সূর্যোদয় দেখবো বলে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কফি বানিয়ে বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। ভালো শীত শীত, ভেজাভেজা অন্ধকারে প্রথম সকালের সূর্যোদয় হলো, পূবের আকাশে কিছুটা লালিমা লাগতে লাগতে গুচ্ছগুচ্ছ ধোঁয়ার মতো সাদা মেঘ এসে প্রথমে আকাশ ঢেকে দিলো, তারপর পাহাড়টি এবং সবশেষে মেঘেরা ভেসে এসে ঢেকে দিলো আমাদের। সোফা, কার্পেট, বারান্দা, চুল, জামা সব ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, সব ভেজা ভেজা। মেঘের উড়াউড়ি ঘুরাঘুরি শেষ হতে হতে সূর্য্যি বাবু কখন মাঝ আকাশে উঠে গেছেন টের পাইনি। ঠিক যেমন সূর্যোদয় দেখবো ভেবেছিলাম তেমন হয়নি, কিন্তু মেঘে ভেসে যেতে যেতে অরণ্য আর পাহাড়ে এমন সকালও দেখিনি আগে কখনো। আমি তখনই ‘মিলিয়ন ডলার ভিউ’ পেয়ে গেছি বলে দাবী করলেও, বর ওর ক্যামেরায় ধরা পড়া সকালের ছবি দেখতে দেখতে, বড়জোর ‘হাজার ডলার’ হলেও হতে পারে বলে জানালো।

এর পর দ্বিতীয় সকাল, আবারও খুব ভোরে উঠে কফি হাতে সকালের প্রতীক্ষা। সেদিন একদম ভিন্ন আকাশের ল্যান্ডস্কেপ( এটি বোধহয় অক্সিমোরন হয়ে গেলো, আকাশের কি আর ল্যান্ডস্কেপ হয়! স্কাইস্কেপ বলে কোন শব্দ আছে বলে ও তো জানিনা। কী যে বলে প্রকাশ করি! ধূরর… যাক গে…।) বা আকাশ চিত্র। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম সারাটা সময়। সেই সকালে মেঘেরা আমাদের থেকে বেশ দূরে দূরে রইলেও, সূর্যোদয়ের আভাস প্রকট ভাবে পেলেও সূর্যোদয় দেখা হলো না। দূরের মেঘেরা পাহাড়ের পেছন থেকে উড়ে এসে সূর্যটাকে একদম ঢেকে দিলো উদয়ের ঠিক আগে আগে। আমি আজও মুগ্ধ, পাহাড় ছোঁয়া আকাশের গায়ে সকালের এমন লালিমা কোনোদিন দেখিনি…এর মূল্য টাকায় হয়! আগেরদিনের মতোই ক্যামেরা গোছাতে গোছাতে বর বললো, এমন দৃশ্যের মূল্য অনেক, হয়তো শত হাজার ডলার, কিন্তু মিলিয়ন ডলার নয়। আবার প্রতীক্ষা…আরো একটি সকাল তখনও বাকী আছে। দ্বিতীয় সকালটি যদিও আরেকটু বিশেষ হয়ে উঠেছিলো হঠাৎ আঙিনায় কালো এক ভালুক মহাশয়ের আগমনে। আমি মেয়েদের ডাকাডাকি করে তুলে এনে তাঁকে দেখালাম…… এতো কাছ থেকে মুক্ত স্বাধীন ভালুক দেখা…। মজার ব্যাপার হলো, স্মোকি মাউন্টেইন কালো ভালুকের জন্য বিখ্যাত হলেও সেই সকাল ছাড়া আর কোথাও আমরা ভালুক মহাশয়দের দেখা পাইনি।

তৃতীয় বা শেষ সকাল। আমি সে সকালের সবটুকুই চাই, এতটুকুও অনুভবের ঝুলি থেকে বাদ পড়তে দেবো না…। কফি হাতে দু’জনেই আঁধার কাটার আগে আগে উঠে পাহাড় ঘেঁষা বারান্দায়…। সেদিনও আকাশে মেঘ ছিলো, পাহাড়টা অন্যদিনের মতোনই মেঘের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, মেঘ এসে সূর্যটাকে আবার ঢেকে দেবার তীব্র ভয় ছিলো আমাদের মনে। কিন্তু সেদিন আকাশ, মেঘ, পাহাড়, সূর্য- সবাই বুঝি জেনে গিয়েছিলো, মিলিয়ন ডলার ভিউ তে সেটি-ই আমাদের শেষ সকাল…। তাই মেঘের ধোঁয়ায় ঝাপসা পাহাড়ের কোল থেকে বেরিয়ে সূর্যটা এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো বাউন্ডুলে মেঘ গুলোকে একটুও গায়ে না মেখে কী আশ্চর্য উদিত হলো… আমি নির্বাক এবং নিঃশব্দ… নাহ সে বর্ণনা আমি নাই বা দেই, উপযুক্ত শব্দ নেই সংগ্রহে…। বর সেদিন মিটিমিটি হাসি ভরা মুখে ক্যামেরা গুছাতে গুছাতে বললো, কেবিনের নামটি যিনি ঠিক করেছেন, তিনি খুব ভুল কিছু করেননি।

ছবি: লেখক

 

 

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments