আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলছে নতুন কুঁড়ি

স্মৃতি সাহা

নগরী’র শীতঘুম ভাঙছে। বাসন্তিক আলাপনের কলতান প্রকৃতিজুড়ে। আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলছে নতুন কুঁড়ি। বসন্তের প্রথমার্ধ যদিও শীতের আবরণে আচ্ছাদিত হয়ে প্রায়ই ফাঁকি দিয়ে যায় তবুও যেতে যেতে বসন্তের আবির ছড়িয়ে যায় অকুণ্ঠভাবে। সেই আবিরের ছোঁয়ায় প্রকৃতির লাস্য যেন বিমুগ্ধতার সমার্থক হয়ে রয়। রঙহীন শীত ফুরিয়ে বসন্তের আগমনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পাতাহীন গাছগুলোতে রঙের আসর বসে। রুক্ষ প্রকৃতিকে রাঙিয়ে দিয়ে প্রাণ জাগানিয়া গান গেয়ে ওঠে হরেক রঙের চেরি বা সাকুরা। চেরি আদতে জাপানের ফুল। আমেরিকায় চেরি বা সাকুরা’র আগমনের ইতিহাসটা খুব চমকপ্রদ। ১৯১২ সালের ২৭শে মার্চ জাপানের টোকিও সিটি’র মেয়র ইউকিও ওজাকি ওয়াশিংটন ডিসিকে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ ৩০২০ টি চেরি গাছ উপহার দেন। এই উপহার থেকে দু’টি চেরিগাছ তৎকালীন আমেরিকান ফার্স্ট লেডি হেলেন হেরন এবং জাপানের প্রতিনিধি ভিস্কাউন্টেস চিন্ডা টাইডাল বেসিনের উত্তর পাশে পশ্চিম পটোম্যাক পার্কে রোপন করেন। আর এই পার্কেই পরবর্তীতে আমেরিকার “ন্যাশনাল চেরি ব্লোসম” উৎসবের সুত্রপাত হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের বিরতিতে জাপান থেকে আরোও কয়েক দফা চেরি গাছ আসে আমেরিকায়। এসব জাপানিজ চেরি গাছ আস্তে আস্তে সারা আমেরিকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর এখন আমেরিকার বসন্তের আগমন হয় জাপানিজ চেরি বা সাকুরার হাত ধরে। পাতাহীন গাছগুলোতে যখন চেরিফুল পূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত হয় তার সৌন্দর্য বয়ান করা আসলে ভাষার অতীত। শীতের রুক্ষতাকে যেন ফুঁৎকারে উড়িয়ে চারপাশে লাবণ্য ছড়াতে শুরু করে চেরিফুল তুড়ি মেরে। চেরিফুলের স্বকীয়তা কিন্তু তার রঙে। হালকা গোলাপি, গাঢ় গোলাপি, মুক্তোরঙা সাদা, হলুদ, আর খুব দূর্লভ সবুজ রঙা চেরি দেখা যায়। আবার কলি থেকে পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে ঝরে যাবার আগ পর্যন্ত চেরিফুলের রঙে ভিন্নতা আসে, আসে কয়েকটি রূপ। প্রথম বসন্তের একদিন সকালে হয়ত আপনি দেখবেন আভরণহীন চেরি গাছগুলো যেন কোন জাদুর পরশে গাঢ় গোলাপি হয়ে আছে ; মানে গাছজুড়ে কলি এসেছে। এরপর চোখের পলকে সেই গাঢ় গোলাপি গাছটি হালকা গোলাপি ফুলে বসন্তের বাতাসে ঈষৎ মাথা নাড়িয়ে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবে; মানে পূর্ণ প্রস্ফুটিত চেরিফুল। এরপর বসন্তের এক বেয়াড়া বৃষ্টিদিন শেষে চেরিগাছ আর চেরিতলা আবার গাঢ় গোলাপি রঙের ছটায় রঙিন; মানে অধিকাংশ ফুল ঝরে গাছের তলায় আসর বসিয়েছে আর চেরিগাছ আস্তে আস্তে পাতায় ভরে উঠছে। এরপর মধ্যবসন্ত থেকে সারা গ্রীষ্মকাল চেরি বা সাকুরা গাছ সবুজ পাতার অধিকারে চলে যায় পুরোপুরিভাবে। আবার অপেক্ষা শুরু হয় পরের বসন্তের…।

ছবিঃ লেখক