আয়নায় একা উত্তম…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

উত্তম কুমারের বাড়িতে একটা বিশাল আকৃতির আয়না ছিলো। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় অনুশীলন করতেন তিনি। সেই আয়নার প্রতিবিম্বে একা থাকতেন উত্তম কুমার। সেই উত্তম লার্জার দ্যান লাইফ উত্তম নন, হয়তো মুখোশ আর মুখোশের অন্তরালে হারিয়ে গিয়ে নিজের মুখশ্রী খুঁজে ফেরা এক মানুষ। অথচ বাস্তবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির মহানায়ক।

উত্তম কুমার যদি অভিনেতা না-হতেন তাহলে কী হতেন? ফুটবলার? কবি? ঔপন্যাসিক? নাকি সিনেমা হলের টিকেট ব্ল্যাকার? সফলতাহীন, আলোর উজ্জ্বল বৃত্তের বাইরে একজন মানুষ। এসবের কিছুই হতে হয়নি তাঁকে। চেনা, খুব পরিচিত বৃত্তের বাইরে গিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সফল অভিনেতা, বাঙালির স্বপ্নেদেখা নায়ক। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৯৫। কিন্তু আজও তিনি সেই ৫৪ তেই আটকে রইলেন। মৃত্যুর চল্লিশ বছর পরেও বাঙালির হৃদয়ে উত্তম কুমারের রাজ্যপাট অটুট রইলো। সেই ভুবন ভোলানো হাসি, ঘাড় বাঁকা করে তাকানো, সিগারেট ধরানোর মোহনীয় ভঙ্গি-উত্তম কুমার অথবা অরুণ কুমার চ্যাটার্জি রয়ে গেলেন নায়ক হয়ে। জনপ্রিয়তার কাঁধে তার আসন অথবা তাঁর কাঁধেই চেপে বসা জনপ্রিয়তা রইলো অমলিন।

আজ উত্তম কুমারের জন্মদিনে প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘আয়নায় একা উত্তম ’।

উত্তম কুমার কী একা বোধ করতেন কখনো কখনো? এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। হয়তো স্বয়ং মহানায়কের কাছেও কঠিন হতো এ প্রশ্নের উত্তর দিতে। তিনি তো উত্তম কুমার, যার কাঁধে সওয়ার হয়েছিলো এবং এখনো চেপে বসে আছে বাঙালির স্বপ্ন, ভালোবাসা আর এক ধরণের প্রেম। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত নায়ক সিনেমার শেষ দৃশ্যটি মনে করা যায়। শর্মিলা ঠাকুর চলে যাচ্ছেন। উত্তম প্ল্যাটফর্মে ভক্তকুলে ঘেরাও। কালো চশমায় ঢাকা তার চোখ খুঁজছে কিন্তু শর্মিলাকে। তখন মিড লং শটে তাঁর মুখের রেখায় ফুটে উঠেছিলো একা হয়ে যাওয়ার ব্যথা। ভিড়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নায়কের মুখে বেদনার পোড়া দাগ খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু ভিড়ের ভেতরে থেকেও একা হয়ে থাকার যন্ত্রণা বুকের মধ্যে না থাকলে শটটা হয়তো সেদিন ওকে হতো না। কলকাতার এক সিনে কাগজের সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে উত্তম কুমার বলেছিলেন, ‘এই ইন্ডাস্ট্রি, ইন্ডাস্ট্রির মানুষ আমার ওপর নির্ভর করছে। আমি চাইলেই কি সবকিছু করতে পারি? পারি না।’

কবি, চলচ্চিত্র পরিচালক পুর্নেন্দু পত্রী ষাটের দশকের মাঝামাঝি উত্তম কুমারকে তার একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প অবলম্বনে সিনেমায়। উত্তম কুমার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পত্রীর প্রস্তাব।পুর্নেন্দু পত্রী এই ঘটনার অনেক পরে, সম্ভবত উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর দীর্ঘ একটি লেখা লিখেছিলেন। লেখার অন্তিমে তিনি মন্তব্য করেছেন-‘নায়ক-এর পর আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন যে, যে-আগুন মশালে জ্বলার কথা, তাকে কত দীর্ঘদিন আপনি ভরে রেখেছিলেন দেশলাইয়ের কাঠিতে? শুনতে পান বা না পান, তবু বলছি, প্রতিভার অপব্যবহারেও আপনি ছিলেন অসম্ভব এক প্রতিভাধর’। সত্যিই কী নিজের অভিনয় ক্ষমতাকে অপচয় করেছিলেন উত্তম কুমার? জনপ্রিয় ধারায় নিজেকে আরও উজ্জ্বল করে তুলতে, নিজের অবস্থানকে বাংলা সিনেমায় এক এবং অদ্বিতীয় করে রাখতে কোনো ধরণের ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি? কবি ও গদ্যকার সুবিমল মিশ্র একটি লেখায় একবার লিখেছিলেন, ‘উত্তমকুমার। বাংলার হিরো, বাঙালির হিরো। সে চা খায়, সিগারেট খায়, হুইস্কিও খায়, কখনো কখনো নায়িকাকে জড়িয়েও ধরে কিন্তু কখনও চুমু খায় না।’ যত দিন পার হচ্ছে মহানায়কের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, হচ্ছে। পর্দায় নায়িকাকে চুমু খেলে কি উত্তমকুমার বাঙালির কাছে এরকম সর্বকালের নায়ক হতে থাকতেন? এই বিষয়টা হয়তো বুঝতেন তিনি। আর তাই উত্তম কুমার কখনো ক্যাসানোভা নন, রিচার্ড বার্টন নন, জ্যাক দ্য রিপার নন। তিনি তাই দেবদাস, সন্ন্যাসী রাজা, উদাসী বাউল, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি-এবং চিরন্তন নায়ক। তার নায়িকা যারা ছিলেন তাঁরা কেউ-ই কিন্তু শেষ পর্য্ন্ত চিরন্তন নায়িকা হয়ে ওঠেননি। উত্তম কুমারের আজকের অবস্থানের বিচারে সে আসনটি সুচিত্রা সেনও পাননি। একমাত্র উত্তম কুমার বাংলা সিনেমায় রয়ে গেছেন চিরযুবা ও চিরজীবী, ম্যাটিনি আইডল হয়ে।

উত্তমের আত্মজীবনী ‘আমার আমি’। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সবার উপরে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য মনোনীত হয়েছি। যথারীতি ছবির শ্যুটিং শুরু হয়ে গিয়েছে। সেদিন শ্যুটিং ছিলো কৃষ্ণনগরে আউটডোরে। সদলবলে শ্যুটিং শেষ করে ফিরছি। বেশ মনে পড়ে সেদিনটা ছিলো বৃহস্পতিবার। স্টারে চলছিলো ‘শ্যামলী’ নাটক। আমাকে সময়মতো হাজির হতে হবে। তাই গাড়ি যতোটা সম্ভব দ্রুত চালিয়ে হাজির হলাম স্টারে। অভিনয় শেষ হয়ে গেলো। মেকআপ তুলছি। এমন সময় একজন এসে খবর দিলো, একজন ভদ্রমহিলা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। বাধ্য হয়েই দেখা করলাম। বিবাহিত এক ভদ্রমহিলা। অভিজাত কোনো পরিবারের কুলবধূ। ভদ্রমহিলা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না-করে নির্ভয়ে বলেছিলেন, আমরা যখন কৃষ্ণনগর থেকে ফিরছিলাম, তখন তিনি আমাদের গাড়ি ফলো করে সোজা সেখান থেকে স্টারে এসেছেন। টিকেট কেটে আমার অভিনয় দেখেছেন। তার পরের কথাটা আরও বিষ্ময়কর।এমনকী অবিশ্বাস্যও বটে। সে-কথা শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম। ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, আমি আর বাড়ি ফিরবো না।

কথাটা কানে যেতেই আমি ভীষণ অস্বস্তিবোধ করতে লাগলাম। তারপর অনেক বুঝিয়ে, মিনতি জানিয়ে, অনেক কষ্টে ভদ্রমহিলাকে শান্ত করলাম এবং তাঁর ফিরে যাবার ব্যবস্থাও করা হলো।’

উত্তম কুমারকে ঘিরে প্রেমের হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষ তখন ছিলেন ঘরে ঘরে। কিন্তু কেনো ছিলেন এমন মানুষ?কেনো উত্তম কুমারের জন্য তাদের পরিণামহীন ভালোবাসা এমন ভাবে প্রবাহিত হতো? আসলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম কুমার বাঙালি নারীর কাছেও নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন ভালোবাসার চিরকালের এক আইকন হিসেবে। তাঁর অভিনয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাই তার প্রেমে পড়ে যাওয়া নারীদের ভাবতে বাধ্য করতো উত্তম কুমার হয়তো এরকম-ই। তাই উত্তম কুমারকে ছাড়া অন্য সব পুরুষকেই তাদের মনে হতো অসম্পূর্ণ। তাঁর যুগে বাঙালি পুরুষরা তার মতো করে চুল কাটতেন, তাঁর মতো করে হাঁটার চেষ্টা করতেন। একজন মানুষ অভিনয় দিয়ে একটি সময়ের সংস্কৃতিকেই পাল্টে দিয়েছিলেন। এমনটা আর কোনো বাঙালি অভিনেতার পক্ষে সম্ভব হয়নি।কিন্তু এমনি একটি অবস্থানে থেকেও সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর প্রেমপর্ব কিন্তু কোথাও পৌঁছায়নি। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, তাদের দুজনের কেবলই বন্ধুত্ব ছিলো, অন্যকিছু নয়। কিন্তু পরবর্র্তী সময়ে এ বিষয় নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করেছেন, প্রমাণ নির্ভর যে তথ্য তুলে এনেছেন তাতে অনেকটাই প্রমাণিত হয়েছে এই দুটি মানুষের মধ্যে সেতু হয়তো ছিলো না কিন্তু স্রোতস্বিনী ছিলো। উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেনের মাঝে প্রণয়ের বাঘ যদি হেমন্তের অরণ্যে বের হয়ে পড়তো তাহলে কী ঘটতো বাংলা ছবির ভবিষ্যতের কপালে সে কথা এখন সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এই যে ভালোবাসার আড়াল সেটুকু রয়ে গিয়েছিলো দুজনের সম্পর্কের মাঝে। তাই উত্তমের মৃত্যুর পর নিথর দেহ দেখতে এসে সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, ‘ওর বুকে মালা দিতে পারবো না। ওখানে বড্ড কষ্ট’।

কী কষ্ট ছিলো উত্তম কুমারের? বেদনার কোন গোপন আগুন তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিলো? চারপাশে হাজার হাজার ভক্ত, স্তাবক, এত আলো, এত সমাগমের মাঝে কোথায় ঠিক একা এক উত্তম কুমার বসে থাকতেন নিজের গভীরে?

অভিনয় দিয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রায় দু’শো সিনেমায় অভিনয় করেছেন নায়কের ভূমিকায়। অসংখ্য হিট ছবির নাম তার সঞ্চয়ে। হয়তো বলা যায় সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমাতেই চরিত্রটি ছিলো আসল উত্তমের মতো অসহায়, মানবিক, বা্উন্ডুলে, আশ্রয়প্রার্থী এবং উদাসীন।নিজের অফস্ক্রিন জীবনেও যেন তিনি সিনেমার গল্পের মতো পরপর বিপর্য্য় সইতে পারলেন না। চলে যাওয়ার সময় বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন তাঁর অভিনয়ের মধ্যে কতখানি সত্য ছিলো এবং তিনি নিজেকে লুকিয়ে রেখে কখনোই অভিনয় করতে পারেননি।

আয়নায় তাঁর একা প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে। পারদের কৌশলের মাঝে ছায়া পড়ে অন্য এক উত্তমের। সেখানে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকানো প্র্যাকটিস করতেন, সিগারেট খাওয়ার ভঙ্গিতে অনন্যতা আনার চেষ্টা করতেন, নিজের হাসিকে নিজেই দেখতেন বারবার। কিন্তু কেনো যেন তার জন্মদিনে দাঁড়িয়ে মনে হয় এই সবকিছুর মাঝে কোথায় যেনো এক অভিমানী মানুষের ছায়াটাও রয়ে গেলো। আর সেখানেই তিনি হয়ে থাকলেন রহস্যময় নায়ক উত্তম কুমার।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ তেহাই লিটলম্যাগে মুদ্রিত বিভিন্ন লেখা
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]