আয়না অনেক গল্প জানে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কী গল্প জানে আয়না? একখন্ড কাচ নানা মাপে নির্দিষ্ট করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা, তাতে প্রতিবিম্ব তৈরি করার সক্ষমতা গুঁজে দেয়া-মানুষই সম্ভব করেছে নিজেকে অবলোকন করার এই গুঢ় কৌশল। আয়নায় কাকে দেখে মানুষ? উত্তরটা সহজ-নিজেকে। কিন্তু আসলেই কি তাই? শরীর এবং আত্মা্য় বিভাজিত মানবের সব রহস্য কি একখণ্ড আয়না ধারণ করতে পারে? নিজেকে দেখতে পাবার তীব্র আগ্রহ থেকেই আয়নার জন্ম, সভ্যতার প্রায় সমান বয়সী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মানব-মানবীরা খুটিয়ে খুটিয়ে নিজেকে দেখেছে। খুঁজে নিয়েছে নিজের মুখাবয়বের খুঁত, দেখতে চেয়েছে শরীরের নানান অসঙ্গতি, রূপ-অরূপ আর আত্মার কুৎসিত বিকাশ।

উপকথায় আছে, বহু বহু বছর আগে হিমালয়ের কাছে কোথাও এক নারী প্রথম কোনো এক সরোবরে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে চমকে উঠেছিলো। সেটাই ছিলো নাকি আয়নার প্রাচীন ধারণা। তারপর একটু একটু করে আয়নার ধারণা সংহত হয়েছে।

পৃথিবীর সবচাইতে পুরনো আয়নাটি পাওয়া গেছে আনাতোলিয়ার ধ্বংসাবশেষ থেকে। এই জায়গাটি এখনকার তুরস্ক হিসেবে চিহ্নিত। মিশর অথবা মেসোপটেমিয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার বছর আগের চীনেও পাওয়া যায় আদি আয়নার উৎপত্তির চিহ্ন।

আমাদের প্রতিফলনের গল্প লিখে রাখে আয়না। আর এই প্রতিফলনের গল্পই ধীরে ধীরে মানুষকে নিয়ে গেছে আত্মসচেতনতার দিকে।যেখানে আমরা নিজেদেরকে দেখতে পেয়ে আনন্দিত হই কখনো, কখনো চমকে উঠি।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো আয়না নিয়ে ‘আয়না অনেক গল্প জানে’।

হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘স্নো কুইন’ রূপকথার গল্পে এক স্কুলের প্রধান শিক্ষকরূপী শয়তান এক অদ্ভুত আয়না তৈরি করেছিলো, যা মানুষ যাবতীয় ভালো এবং সুন্দরকে কখনোই প্রতিফলিত করতে পারতো না। সেই আয়নায় মানুষের খারাপ এবং অমঙ্গলকর দিকটাই প্রতিফলিত হতো সবসময়।সেই শিক্ষক তার আয়না নিয়ে পৃথিবীর নানান জায়গা ঘুরে বেড়াতে মনস্থির করলো। এক পর্যায়ে সে আয়নাটা নিয়ে যেতে চাইলো স্বর্গে যেখানে ঈশ্বর আর দেবতাদের বাস। শয়তান চাইলো ভুল প্রতিফলনের মাধ্যমে তাদেরকেও বোকা বানাতে। কিন্তু স্বর্গে যাবার পথে সেই আয়না হাত থেকে পড়ে গেলো এবং পৃথিবীতে পড়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হলো। সেই আয়নার টুকরোগুলো বাতাসে উড়ে ছড়িয়ে পড়লো এবং মানুষের মনে আর চোখে গিয়ে আটকে গেলো। আর তাতেই মানুষ সব ভালো আর সুন্দরকে দেখতে ভুলে গেলো। রূপকথার কাহিনি,  কিন্তু তাতে মানুষের আত্মার বিবর্ণ রূপ সহজে ফুটে উঠেছে!

একজন মানুষ কতবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়, একজন অপরূপ সুন্দরী নারী কতবার নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আয়নায়? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে দাঁড়ায় রমণী। বিকেলের অবসরে কারো খোলা চুল চিনে রাখে আয়না। পারদ নামের এক রাসায়নিক বস্তু দিয়ে তৈরি আয়না মুখোমুখি মানুষকে দাঁড় করাবেই। প্রতিফলনের নিয়ম মেনে আয়না মানুষের সুন্দর থাকার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলেছে, সচেতন করেছে নিজেকে আরও আকর্ষ’ণীয় করে তোলার কৌশল বিষয়ে। একজন নারী বা পুরুষ দিনের মধ্যে অনেকবার আয়নায় নিজেকে দেখে। কেউ গালের ওপর আচমকা গজিয়ে ওঠা ছোট্ট একটি ব্রন দেখে, কেউ দেখে নিজের শরীরের সৌন্দর্য। নার্সিসাস কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে নিজেকে অবলোকন করার এই নিঃশব্দ প্রক্রিয়া থেকেই।

পথের পাশে ছাপড়া সেলুনের ঢেউখেলা বাঁকাচোরা আয়নায় নিজের মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে কেউ।মফস্বলে বৃষ্টি নেমেছে। কোথাও যাবার নেই তার আজ। তাই আর্শীর আত্মার কাছে নিবেদিত হয়ে সে জানতে চায় হয়তো নিজেকেই। ভাবতে চায় আর কাউকে তার পাশে।কিন্তু আর্শী কী উত্তর পাঠায় তাকে? ক্লিওপ্যাট্রা সেই হাজার বছর আগে কোন আয়নায় তাকিয়ে পুনর্বার খুঁজে নিতে চেয়েছিলো নিজের রূপ আর যৌবনকে? রোমান সেনাপতি মার্ক অ্যান্টনির প্রেমে উজাড় হয়ে যাওয়া চোখের দৃষ্টি কি তাকে সে উত্তর দিতে পেরেছিলো? আয়না অনেক কথা জানে। আর জানে বলেই ভুবনমোহিনী মেরিলিন মনরো আয়নার সামনে বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বাল্ব তার উদ্দেশে জ্বলে ওঠে জেনেও চোখ রাখতেন আয়নায়; হয়তো খুঁজতেন নিজেকে অত আলোর মাঝেও। মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের ওপর একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, কোনো একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে কেউ যদি আয়না থেকে ১০ ইঞ্চি দূরে নিজের মুখ স্থাপন করে একটানা ৩০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে পারে তাহলে অস্বস্তি তৈরি হয় মনে। মানুষের মন যা তার ধারণাকে প্রতিফলিত করে আর আয়নার সামনে দাঁড়ানো শরীরের মাঝে একটি বিভাজন রেখা তৈরি হয়। তৈরি হতে থাকে দু’টি পৃথক সত্তা। তখন মানুষ আয়নায় চোখ রেখে শরীর থেকে বের হয়ে ভিন্ন কথা ভাবতে থাকে।

কবি সিলভিয়া প্লাথ আয়নায় নিজের কিশোরী রূপকে মরে যেতে দেখতে পেতেন। দেখতেন তার বদলে জেগে উঠছে নিজের জীর্ণ, বৃদ্ধ অবয়ব। লুইস ক্যারলের ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস’ উপন্যাসের এলিস এই আয়নাকে নরম এক বস্তুতে পরিণত হতে বলেছিলো যাতে সে আয়নার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

কবি আবুল হাসান তাঁর কবিতায় লিখেছেন, ‘নতুন নির্মিত একটি সাঁকোর সামনে দেখলাম তিরতির করছে জল,

আমাদের সবার মুখ সেখানে প্রতিফলিত হলো,

হঠাৎ জলের নিচে পরস্পর আমরা দেখলাম

আমাদের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের অপরিসীম ঘৃণা ও বিদ্বেষ।’

আয়নার কাছে মানুষের শরীর নয়, রূপ অথবা যৌবনে উপচে পড়া শরীর নয়, রুগ্ন অন্দরমহলও প্রতিফলিত হয় কখনো কখনো। কিন্তু এখন যে আয়নায় আমরা  নিজেদের অবয়ব দেখতে পাই, উৎপত্তির শুরুতে সেই আয়নার আদল এমনটা ছিলো না। স্বচ্ছ কাঁচের আয়নার ধারণা এসেছে আরও অনেক পরে। কাঁচের বদলে তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও রূপার চকচকে পৃষ্ঠদেশকেই আয়না হিসেবে ব্যবহারের চল ছিলো। তবে এই ধাতুগুলো ভীষণ ভারী হওয়ায় আয়নার আকার ছোট হতো এবং তাতে মুখ দেখা যেতো না ভালো ভাবে। প্রাচীন সময়ে অভিজাত পরিবারগুলোতে আভিজাত্যের প্রতীক ছিলো এই আয়না।

প্রাচীন রোমানরা মনে করতো, মানুষের সাতটা করে জন্ম থাকে। আর কেউ যদি কোনো জন্মে একটা আয়না ভেঙে ফেলে তবে আয়নার ভাঙা টুকরোগুলোর ভেতরে সেই ব্যক্তির আত্মা আটকা পড়ে যায়। আবার পুনর্জন্ম না হওয়া পর্যন্ত সেই ব্যক্তির মুক্তি ঘটে না। কোনো কোনো প্রাচীন সংস্কৃতিতে এমন বিশ্বাসও ছিলো যে, জীবন্ত মানুষের আত্মার ছায়া আয়নার গভীরে থেকে যায়। রাক্ষসদের আত্মা নেই, তাই তাদের ছায়া আয়নায় পড়ে না।

আয়না মানুষের শরীর অথবা মনের অদ্ভুত প্রকৃতিকে ধারণ করে একসঙ্গে। নারীর সৌন্দরয সচেতনতার গল্প যেমন আয়না জানে, তেমনি জানে কোনো নিভৃতিতে তার না-পাওয়ার অশ্রুসজল দৃষ্টিকেও। আয়নায় দাড়ি কাটার আগে প্রতিদিন জমা হয় পুরুষের সাবানের ফেনাযুক্ত গালের অসংখ্য প্রতিবিম্ব।আবার সেই আয়নার সামনে বসে সেই পুরুষটিই হয়তো বৃষ্টি পড়তে থাকা মফস্বলের অলস দুপুরে খুঁজে ফেরে নিজেকে অথবা অন্য কাউকে। আয়না এই সব গল্পও জানে।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ এম্পায়ার স্টেট ট্রিবিউন, দ্য গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া
ছবিঃ গুগল        


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box