ইঁদুর, ইঁদুর…

এপ্রিল ১৬। ডাক্তার বার্নার্ড রিয়ু তাঁর অপারেশন থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়েছেন। এমন সময় পায়ের নিচে ঠেকলো নরম মাংসের পিণ্ড। একটা মরা ইঁদুর! রিয়ু কিছু ক্ষণ থমকালেন। পাত্তা না দিয়ে এক লাথি মেরে সেটাকে সরিয়ে চলে গেলেন নিজের কাজে। লাইনগুলি লিখেছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আলবের কামু, তাঁর ‘লা পেস্তে’ উপন্যাসে। ইংরেজিতে ‘দ্য প্লেগ’। রিয়ু ওরান শহরে কর্মরত চিকিৎসক, যে শহরকে গ্রাস করবে ভয়ানক প্লেগ। এই মহামারির সূত্রপাত একটা লাথি। মৃত ইঁদুরটাকে পরীক্ষা না করে লাথি মেরে সরিয়ে দেওয়া।

১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কামুর কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’। ব্রিটেনের এক পত্রিকার সমীক্ষার মতে, ৭৩ বছর পরে সেই উপন্যাস ফের বেস্টসেলার।

কোভিড-১৯ অতিমারির ছোবলে পৃথিবীর মানুষের এখন নাজেহাল অবস্থা। করোনার ডেল্টা ভাইরাসের পর এবার আক্রমণ করেছে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্রুত সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম ওমিক্রন ভাইরাসটি এসেছে ইঁদুরেরে শরীর থেকে।

কামুর উপন্যাসের প্রধান একটি চরিত্র ইঁদুর। সোমেন চন্দও বাংলা সাহিত্যে অসাধাণ এক গল্প উপহার দিয়েছেন ‘ইঁদুর’ নামে। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপকে কয়েক দফায় লণ্ডভণ্ড করেছিলো যে প্লেগ রোগ তার নায়কও ছিলো এই ইঁদুর। ইঁদুরের আক্রমণে সেই রূপকথার শহর হ্যামিলন তছনছ হয়ে গিয়েছিলো। পরে অবশ্য ইতিহাসবিদরা তথ্য ঘেঁটে দেখিয়েছেন হ্যামিলন নামে জার্মানীর ছোট্ট শহরে ইঁদুরের আক্রমণের ঘটনাটার সত্যতা আছে।

স্তন্যপায়ী প্রাণী ইঁদুর মানুষের নৈমিত্তিক জীবনের নানান চরিত্রের একটি। নোংরা আবর্জনার স্তুপে, ময়লা পানি নিকাশের ড্রেনের অন্ধকারে গা মিশিয়ে, ঘরের আলমারির আড়ালের আশ্রয়ে, কৃষকের ধানের গোলায় ইঁদুর তার সংসার ছড়ায়। নিজের ধারালো দাঁত বসিয়ে ছত্রখান করে প্রয়োজনীয় সঞ্চয়। ময়লা জায়গায় বেড়ে ওঠা ইঁদুরের সঙ্গে অসুখের সম্পর্ক আছে। বহুকিছু নষ্ট করার দায় মাথায় নিয়ে তাই হয়তো ইঁদুর দেশী অথবা বিদেশী সাহিত্যেও একটি  চরিত্র হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই ইঁদুর নিয়ে ‘ইঁদুর ইঁদুর’।

ওয়াল্ট ডিজনির তুলিতে ইঁদুর চরিত্রটি হয়ে উঠেছে এক মহা চরিত্র-মিকি মাউজ। বাংলা কবিতায় ইঁদুরকে অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ। ছোট অথবা বড় দৈহিক আকৃতির ইঁদুরের কুতকুতে চোখ, নিঃশব্দ চলাফেরা আর নরম অথচ গা ঘিন ঘিন করা শরীর কেমন এক রহস্যময়তা, ভয় আর অস্বস্তিকর দূরত্বে সরিয়ে রেখেছে প্রাণীটিকে। অনেক বছর পর সেই ইঁদুর আবার উঠে এসেছে সংবাদ ‍শিরোনামে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে একটি ইঁদুর করোনায় আক্রান্ত হলে ওমিক্রনের উৎপত্তি হয়। বিজ্ঞানীদের চালানো গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে, অনেক জীবের মধ্যে মিউটেশনের পর, করোনা ভাইরাসের এই নতুন পরিবর্তিত রূপটি হয়তো মানুষকে সংক্রমিত করেছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় বিপরীত জুনোসিস।ওমিক্রনের ৩২টির মধ্যে ৭টি মিউটেশন রয়েছে যা ইঁদুরকে সংক্রমিত করতে পারে।

ইতিহাস ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল এতকাল আমাদের জানিয়ে আসছিলো, সেই মধ্য যুগে ইউরোপে যে বিউবনিক প্লেগ ছড়িয়েছিলো তার সূচনা ঘটেছিলো এশিয়ায়। এশিয়া থেকেই সেই ভয়াবহ রোগের জীবাণূ পৌঁছে গিয়েছিলো উইরোপের কয়েকটি দেশে। কিন্তু সম্প্রতি ইংল্যান্ডের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ইভা প্যানাগুইটাপুলু ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানাচ্ছেন, বিউবনিক প্লেগের মূল হোতা ছিলো আসলে মিশরের ‘নাইল র‌্যাট’। অর্থাৎ মিশরের নীল নদ এলাকায় যে ইঁদুরগুলি ঘুরে বেড়াতো তারাই প্লেগ রোগের জনক। পরে ব্যবসায়ীদের জাহাজে চেপে এই ইঁদুরগুলোর চলে আসে ভারতে। সেখানে তাদের দেহ থেকে স্থানীয় কালো ইঁদুরের শরীরে সংক্রমিত হয় প্লেগের জীবাণু। তারপর এই কালো ইঁদুরের দল ইংরেজ বণিকদের জাহাজে পাড়ি জমায় ইংল্যান্ডে। ব্যাস, সেখানে দেখা দেয় মহামারি।

১৮৯৭ সালে পল ডুমার নামক এক স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ইন্দোচীনের গভর্নর-জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ইন্দোচীন তখন ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক সরকারের দখলে চলে গিয়েছে। আধুনিক সময়ে যে দেশগুলো কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম নামে পরিচিত– এগুলো একসময় ‘ইন্দোচীন’ নামে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে শাসিত হয়েছিলো। ইন্দোচীনে ডুমার বেশ কিছু সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কাজ করেছিলেন। তার একটি ছিলো পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ভূগর্ভস্থ পাইপের মাধ্যমে পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা স্থাপন করার আগেই হ্যানয় শহরে ইঁদুরের উৎপাত ছিলো পরিচিত বিষয়। কিন্তু ইঁদুর তখনও সেখানকার অধিবাসীদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলেনি। ডুমার হ্যানয় শহর সতের কিলোমিটারব্যাপী ভূগর্ভস্থ পাইপ স্থাপন করেছিলেন। ইঁদুরের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিই ছিলো মূল কারণ। ভূগর্ভস্থ পাইপগুলোতে মানববর্জ্য ও অন্যান্য ময়লা থাকার কারণে ইঁদুরেরা হ্যানয়ের ঘরবাড়ি ছেড়ে সেই পাইপে আশ্রয় নেয়, যেহেতু সেখানে খাবারের কোনো অভাব ছিলো না তাদের। ভূগর্ভস্থ পাইপগুলোর সঙ্গে ফরাসি কর্মকর্তাদের বাসভবনের ছিলো প্রত্যক্ষ সংযোগ। প্রতিটি ফরাসি ভবনের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ লাইনের সংযোগ ছিলো পাইপের মাধ্যমে এবং সেই পাইপ দিয়েই শত শত ইঁদুর বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ফরাসি বাসভবনগুলোতে টয়লেটের কমোড দিয়ে এসে শত শত ইঁদুর পুরো বাসায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়েন ফরাসি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ আকার ধারণ করে যে, ফরাসি ঔপনিবেশিক সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। ইঁদুরের তান্ডবে ঘরবাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যায়, খাবারের সংকট দেখা দেয় এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা তথা মহামারী দেখা দেয়। হ্যানয়ে ফরাসিরা একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেখানকার একজন গবেষক প্রমাণ করেন যে, ভূগর্ভস্থ পাইপ থেকে উঠে আসা ইঁদুর থেকেই মানুষের শরীরে বিউবনিক প্লেগের ভাইরাস প্রবেশ করেছে।

ফরাসিরা ইঁদুর হননের জন্য পুরস্কার ঘোষলা করেও রেহাই পায়নি। লক্ষ লক্ষ ইঁদুর দখল করে নেয় হ্যানয় শহর। ইতিহাসে এই ঘটনা স্থান পেয়েছে ‘দ্য গ্রেট হ্যানয় র‍্যাট হান্ট’ হিসেবে। প্রায় একশো বছর পৃথিবীর মানুষের কাছে এই ঘটনা অজানা ছিলো। একজন গবেষকের কাছে সেই সময়ের কিছু সরকারি ফাইল আসার পরই তিনি এই ভয়াবহ ঘটনাটা প্রকাশ করেন।

হ্যামিলনের বংশীবাদকের গল্পটা রূপকথার। কিন্তু সবটাই কী রূপকথা? ইতিহাসবিদরা তো গবেষণা করে বহু আগেই জার্মানীতে এই শহরের অস্তিত্ব খুঁজে বের করেছেন। গল্পে ইঁদুরই সূচনা করেছিলো একটি শহরের সর্বনাশের।ইঁদুরের বিনাশ আর মানুষের চিরাচরিত অন্যকে ঠকানোর প্রবৃত্তিই গল্পে শহরের সব শিশুদের বংশিবাদকের বাঁশির টানে হারিয়ে যেতে সাহায্য করে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডয়েচে ভেলে, আনন্দবাজার পত্রিকা, রোর মিডিয়া
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box