ইচ্ছেগাঁও এর গল্প

অর্ণব সরকার

মন টা ঠিক কারোরই ভালো নেই! না আমার, না আমার সঙ্গীর(সঙ্গী বলতে আমার বাইক)। কত দিন হলো কোথাও যাওয়া হয়নি প্রায় দুই মাস হয়ে গেল। দম টা যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে. তার মধ্যে গরম টাও বেশ পড়েছে কিছুদিন।  উত্তরবঙ্গে আছি বলে অনেকে ভাবে এখানে গরম তেমন পড়ে না তবে তাহাদের জ্ঞাতার্থে বলি আমরাও গরমে full boiled না হলেও মাঝে মাঝে half Boiled হই। গতবছরের কথা, বসে বসে আগামী ছুটি ছাটা গুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়লো এক সপ্তাহ পরেই ১লা মে ২০১৭ পড়েছে সোমবার। মনের মধ্যে কয়েকটা লাড্ডু ফুটতে শুরু করলো। কারন পরপর ৩দিন ছুটি। আর কি যেমন ভাবা তেমন কাজ। এর পর শুরু হলো কোথায় যাবো তার বাছাই পর্ব। কোথায় যাই কোথায় যাই করতে করতে খোঁজ পেলাম কালিম্পঙ হয়ে রামধুরা থেকে ২ কিমি দূরে ইচ্ছেগাঁও নামে একটি পাহাড়ি গ্রাম। আর বেশি বাছাবাছি না করে ইচ্ছেগাঁও টাই ফাইনাল করলাম। এর পর শুরু হলো প্রতীক্ষার পালা। কিন্তু ঘুরতে যাবার আনন্দে এক সপ্তাহ যেন এক বছর মনে হচ্ছিলো। সময় যেন কাটছেই না। ব্যাগ-বোচকা বেঁধে নিয়েছি ৩-৪দিন বাকি থাকতেই। হঠাৎ সঙ্গীর দিকে চোখ পড়লো সেও যেন আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। তাকেও ১দিন বাকি থাকতে স্নান করিয়ে ডাক্তার(বাইক মেকানিক) দেখিয়ে একদম ফিট করে নিয়েছি।

গ্রামের মাঠ থেকে সামনের দৃশ্য

শেষ পর্যন্ত এলো সেই দিন। আগামী ৩ দিনের কথা ভেবে ভেবেই সারাটা রাত্রি ঘুমই আসেনি। সকাল ৯-৯:৩০ নাগাদ রওনা হলাম আর পেছন থেকে কানে আসলো সেই চিরাচরিত সাবধানবাণী, ‘সাবধানে বাইক চালাবি, পৌঁছে ফোন করবি’ আমিও হাত নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার পেটপুজো হয়ে গেলেও সঙ্গীর পেট ছিল খালি কিছুদূর যাবার পর তাকেও একটা ভালো রেস্ট্রুরেন্ট(পেট্রল পাম্প) থেকে পেট ভরে খাইয়ে নিলাম না জানি এর পর বেচারা কোথায় খেতে পাবে না পাবে শুরু হলো আমাদের পথ চলা। শিলিগুড়ির নরক যন্ত্রণাসম যানজট অতিক্রম করে আমরা শালুগাড়া পৌঁছতেই মনটা এক অজানা খুশিতে ভোরে উঠলো।এই রাস্তাটি বহুবার আসা কখনো সিকিম কখনো ডুয়ার্স কখনো বা কালিম্পঙ কিন্তু এবার যে নতুন কোথাও যাচ্ছি তাই এই জায়গাগুলোকেও যেন নতুন লাগছিলো ..শালুগাড়া আর্মি এরিয়া তারপর ফরেস্ট এরিয়া র বুক চিরে ছুটতে থাকলাম। চলতে চলতে আড়চোখে একবার দেখেনিলাম উত্তরবঙ্গের নতুন আকর্ষণ বেঙ্গল সাফারির প্রবেশপথ। আমাদের বাইক প্রেমীদের জন্য এই রাস্তা সর্গ। কিন্তু মন চাইলেও স্পিড লিমিট টা normal এ রেখেই চললাম। কারণ সত্যিই তো safe drive save life. যাই হোক চলতে থাকলাম। চলতে চলতে মনে হবে, রাস্তার দুই পাশের গাছ গুলো যেন আপনার মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জঙ্গল শেষ হতেই সেবক বাজার পৌঁছলাম, মনে মনে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম যেন সেবক এর রেল গেট টা ওঠানো থাকে কারণ ওই গেট অনেক বার ভুগিয়েছে আমায়। সেবকখোলার ওপর ব্রিজটা পার করতেই দেখলাম রেলগেটের কালো-হলুদ লোহাস্তম্ভটা সোজা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আমিও সেটির দিক নির্দেশে ওপরওয়ালাকে ধন্যবাদ জানালাম। গেট পার করেই সেবক থানা ডানহাতে রেখে এগিয়ে চললাম।

কাঞ্চনজঙ্গা

তিস্তার হাত ধরে এঁকেবেঁকে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম সেভকেশ্বরী কালীমন্দির। মায়ের কাছে যাত্রা সফল হওয়ার প্রার্থনা করে এগিয়ে চললাম। দেখলাম সেবকের বিখ্যাত চাটওয়ালা কেবল তার পসরা সাজাচ্ছেন তাই চাটের লোভ সামলে চলতে শুরু করলাম তবে আপনারা সেবক এলে একবার অন্তত এখানকার চাট চেখে দেখবেন যেমন মুখরোচক তেমনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তবে সেবকের বাঁদরবাহিনী থেকে সাবধান। এর পর করোনেশন ব্রিজ (বাগপুল) ডানহাতে রেখে সোজা সিকিমের দিকে এগিয়ে চললাম। এই সময় তিস্তা খুব শান্ত আর জলের রংটি ও সবুজে থাকে। একটু এগুতেই দেখা মিললো কালিঝোরা হাইড্র্যাল প্রজেক্ট এর। এই জায়গাটি মাছশিকারীদের কাছে খুব প্রিয়, তাই দিনের যেকোনো সময় এলেই এখানে দেখা মিলবে তাদের। কালিঝোরা হাইড্র্যাল প্রজেক্ট পার করার পর এলো কালিঝোরাবাজার। এখানথেকে বামদিকে উঠে যাবে লাটপাঞ্চার যাবার রাস্তা. আপাতত সেদিকে না গিয়ে সোজা NH10 ধরেই চলতে থাকলাম। সুন্দরী তিস্তার সঙ্গে চলতে চলতে একে একে বিরিকদাড়া, লোহাপুল পার করে পৌঁছলাম রম্ভি বাজার। প্রতিবার এর মতো দেখলাম রাস্তার দুই পাশে বসেছে মাশরুমের পসরা। দেখলাম অনেকেই গাড়ি থামিয়ে মাশরুম এর দরদাম করছেন। এরপর গেলিখোলা হয়ে তিস্তা বাজার পৌছালাম, এখানে তিস্তা পার করে তাকে বামদিকে রেখে এগিয়ে চললাম। কিছুটা এগোতেই চিত্রে থেকে NH10 ছেড়ে ডানদিকে ঋষি রোড ধরে এগিয়ে চললাম। ঋষি রোড ধরে একে একে চলতে চলতে পৌঁছলাম কালিম্পঙ শহরে। যত বারই কালিম্পঙ আসি প্রতিবারই শহর টাকে নতুন করে ঘুরে দেখতে ইচ্ছা করে তবে এবার সময় কম থাকায় সেই ইচ্ছেটা ফেরার সময়ের জন্য উঠিয়ে রাখলাম। শহর থেকে ৩-৪ কিমি যাবার পর থেকে ঋষি রোড দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। যেখান থেকে ঋষি রোড চলে যাচ্ছে ডানদিকে আলগার হয়ে রিশপ-লাভা-লোলেগাঁও, আর বামদিকে আর একটি রাস্তা “ভালু মার্গ” নাম নিয়ে চলে যাচ্ছে ডেলো…রামধুরা…রামিতে…মুনসাং হয়ে রংপো(পশ্চিমবঙ্গ)।

ডেলো পার্কে প্যারাগ্লাইডিং

আমি বামদিকের রাস্তাটি ধরে এগিয়ে চললাম। ডেলো পার্কের যাবার রাস্তাটিকে বামদিকে ছেড়ে সোজা ভালু মার্গ রাস্তাটি ধরে এগিয়ে চললাম. এখানথেকে প্রায় ৭-৮ কিমি রাস্তা যাবার পর এলো রামধুরা। এই জায়গাটিও খুব সুন্দর। এখানেও কিছু ভালো ভালো হোমস্টে আছে। রামধুরাতেই একটি দোকানে জিজ্ঞেস করতেই ইচ্ছেগাওঁ যাবার রাস্তা দেখিয়ে দিলো। একটু এগোতেই দেখলাম ডানদিকে সোজা উঠে যাচ্ছে একটা পাথুরে রাস্তা, এই রাস্তাটি চলে যাচ্ছে ইচ্ছেগাও। রাস্তার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। ২কিমি রাস্তা পুরোটাই বোল্ডার এর তৈরী এবরো খেবড়ো। তবে ইছগাঁও পৌঁছনোর আনন্দের কাছে সে সবকিছুই তুচ্ছ। আগে থেকেই খাওয়াস হোমস্টেতে বুকিং করে রেখেছিলাম, পৌঁছে ওনাদের কল করতে একজন নেপালি ভাই কে পাঠিয়ে দিলো। তার কথা মতো বাইকটিকে নিচে সাইড করে রেখে সিঁড়ি ধরে সোজা ওপরে উঠে পৌঁছলাম খাওয়াস হোমস্টে তে। D K Khawas -জির কথা মতো তাদের বাড়ির দোতালার কোনার রুমটি নিলাম কারণ এখন থেকে নাকি কাঞ্চনজঙ্গাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায় আর সব ঘর গুলোর তুলনায়। পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাওয়ায় গিয়ে চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম টি ঘুরে দেখতে। পাশেই একটা সুন্দর খেলার মাঠ। সেখানেই কেটে গেলো সে দিনের বিকেল টা। হোমস্টে তে ফিরতেই গরম গরম মোমো এসে হাজির। দেরি না করে শুভ কাজটা সারতে সারতে হোমস্টে এর খুদে একজন সদস্যর সঙ্গে গল্প জমলো বেশ। তার কিছু পর বেরোলাম রাতের পাহাড়ি গ্রাম দেখতে সেও এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সত্যি পাহাড়ের অন্যান্য জায়গার মতো এখানেও আতিথিয়তার কোনো অভাব নেই। ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়েই জমপেস একটা ঘুম দিলাম পরের দিন সকালের কাঞ্চনজঙ্গা দেখার অপেক্ষায়…।

ইচ্ছেগাঁও- এর সন্ধ্যা

ভোর হতেই মোরগের ডাকে ঘুম ভেঙে দেখি কাঞ্চনজঙ্গার ঘুম ভাঙছে। তার অপেক্ষায় ঘরের বারান্দায় এসে বসলাম। সত্যিই এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্গাকে খুব সুন্দর লাগছিলো। মনে মনে ভাবতে ভাবতেই একটু পরেই চাও চলে এলো। সোনায় সোহাগা আর কি। এর পর ব্রেকফাস্ট করে চারিদিকে হরেক রকমের ফুল আর এলাচ বাগান ঘুরে ঘুরে দেখলাম সঙ্গে পিচ ফলের গাছে। সারাদিন গ্রাম টা ঘুরে দেখে এখানকার মানুষজনদের সঙ্গে ঘুরে গল্প করতে করতেই সারাটা দিন কিভাবে কেটে যায় বোঝাই গেলো না। আগের দিনের প্ল্যান মতো বিকেল টা পাশের মাঠে ফুটবল খেলে কাটালাম। সেও এক দারুন অভিজ্ঞতা ছিল। অনেক বন্ধুও হলো। সন্ধ্যায় ফিরে এসে চা র পাকোড়া সহযোগে টিফিন সেরে বেরোলাম নিচের গ্রামটিতে। সেখানেই একটি carrom খেলার আড্ডায় সন্ধ্যা টা ভালোই কাটলো। পরের দিন ফিরে যাবার দুঃখ নিয়ে হোমস্টে তে ফিরে এলাম. D K Khawas -জির সঙ্গে আর ওনার ফ্যামিলির সঙ্গে গল্প করতে করতে রাতের খাবার টা সেরে নিলাম। সত্যিই মানুষগুলো খুব ভালো। শুধু উনারা কেন পুরো ইচ্ছেগাঁও এর প্রতিটা মানুষই খুব ভালো আর পরোপকারী। সবাই কে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার ফিরে আসার আশা নিয়ে সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম ঘরে ফেরার উদ্দেশে। ফেরার পথে ডেলো পার্ক আর ক্যাকটাস নার্সারী টা আর একবার ঘুরে নিলাম।

কিছু জরুরী তথ্য- শিলিগুড়ি থেকে ইচ্ছেগাঁও এর দূরত্ব- প্রায় ৮৭-৮৮কিমি ।
রাস্তার অবস্থা: শিলিগুড়ি থেকে রামধুরা পর্যন্ত ভালো, রামধুরা থেকে ইচ্ছেগাঁও পর্যন্ত ২কিমি রাস্তা খারাপ.
গাড়ী ভাড়া: শিলিগুড়ি থেকে ইচ্ছেগাঁও প্রায় ৩০০০/-, এছাড়াও শেয়ার গাড়ী তে অথবা বাস এ কালিম্পঙ সেখানথেকে ইচ্ছেগাওঁ রিজার্ভ গাড়ী( ভাড়া প্রায় ৫০০-৭০০ টাকা)।

 থাকার জায়গা: অনেক হোমস্টে আছে, নেট এই কন্টাক্ট নং পেয়ে যাবেন. { তবে সব হোমস্টেতেই পৌঁছতে গাড়ী থেকে নেমে কিছুটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয় যেটা বয়স্ক দের জন্য একটু কষ্ট সাপেক্ষ (এটা সম্পূর্ণ নিজস্ব অভিমত)}
থাকার খরচ: জন প্রতি থাকা খাওয়া সমেত ৮০০-১০০০ টাকা.( সব তথ্যই ২০১৭ মে মাস অনুযায়ী)

ছবি: লেখক