ইছামতি থেকে সুবর্ণা নদী

রবিশঙ্কর মৈত্রী, কবি,আবৃ্ত্তি শিল্পী

(আলেস, ফ্রান্স থেকে): আমি ছিলাম এডয়ার্ড কলেজের ছাত্র। ছিলাম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমে। আশির দশকের শেষ দিকে পাবনা থেকে আমার নতুন জীবন চলার শুরু। তখন অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরিতে আর বনমালী ইন্সস্টিটিউটে আমাদের আড্ডা হতো নিয়মিত।
সেই সময় আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক ড. রবীন্দ্রনাথ সরকার এবং এডয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জাহেদী ছিলেন আমার সংস্কৃতির গুরু।
আমরা ক’জন পৈলানপুরে রফিকদের বাড়িতে মিলিত হয়ে শালগাড়িয়া থেকে সাজু আর মিতাকে নিয়ে মাঝে মাঝেই বেড়াতে যেতাম। তখন আমাদের বিশেষ গন্তব্য ছিল এডরুক ওষুধ কোম্পানির সবুজ চত্বর। তখন মৃতপ্রায় এডরুকের পাশেই নিহত একটি নদীর শরীরকে দেখতাম আর কতো কি ভাবতাম।
সেই আমাদের প্রথম দুঃখনদী; নদীর নামটি ইছামতি। ছিন্নপত্রে এই নদীর কথা বহুবার লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ।

একদিন অনন্ত সিনেমা হলের পাশ দিয়ে; শীর্ণ ইছামতির পাড় দিয়ে পদ্মা পর্যন্ত গিয়েছিলাম সাইকেল চালিয়ে। পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে তখন শিলাইদহকে দেখে রবিকবিকে মনে করতাম আর কবিতা বলতাম।

কোনো এক আড্ডায় তখন জেনেছিলাম পাবনা শহরের মাঝখান দিয়ে বয়েযাওয়া ইছামতি আসলে নদী নয়, খাল। বাংলার নবাব ইসলাম খাঁ ১৬০৮ থেকে ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে সেনাদের যাতায়াতের জন্য পদ্মা আর যমুনা নদীকে সংযুক্ত করতে এই খাল কেটেছিলেন। পরবর্তীতে সেই খালটির নাম হয়ে যায় ইছামতি।

শোনা যায়, এই ইছামতি দিয়ে বড়ো বড়ো গয়নার নৌকা এবং ছোটো ছোটো জাহাজ চলাচল করতো। রবীন্দ্রনাথ এই নদীপথে শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুরে বহুবার যাতায়াত করেছেন তাঁর নিজের বোটে।

আমরা ইছামতির যৌবনভরা গল্পই শুনেছি। দেখেছি তার মৃত পরিত্যক্ত নর্দমার দশাদৃশ্য।

আমরা যখন পাবনায় সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করেছি তখন এরশাদ ছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যাঁরা ছিলেন তাঁরা আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরেই ছিলেন। আমরা তখন তরুণ তুর্কিদল বেশ ভালো ছিলাম। তখন খাল নদী বৃক্ষকে হত্যা করা হলেও মানুষ হত্যা খুব কমই হতো। তখন যে-কোনো হত্যায় দেশের সকল মানুষ কেঁদে উঠতো, প্রতিবাদী হতো। মানুষ তখন বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়াতে ভয় পেতো না, রুখে দাঁড়াতো।

আমাদের ভালোবাসার শহর পাবনায় ২৮ আগস্ট রাতে আরেকটি নদীকে হত্যা করা হয়েছে। নদীটির নাম সুবর্ণা।
শোনা গেলো, সুবর্ণা আসলে নদী নয়, মানুষের প্রতিনিধি।

ইছামতির জন্য আজও কিছু মানুষ দুঃখ করে। সুবর্ণার জন্যও আমরা কজন কদিনের জন্য দুঃখিত হলাম।

ছবিঃ সজল, টুটুল নেছার