ইভা ব্রাউনের অন্তরাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হিটলারের বিরহে জীবনে দু‘বার নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়ার অসফল চেষ্টা করেছিলেন ইভা ব্রাউন। অথচ জীবনে মাত্র ৪০ ঘন্টার জন্য হিটলারের স্ত্রী পরিচয়টি দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। বাকী সময়টা কাটিয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলারের একজন রক্ষিতা হিসেবে। তীব্র বিষপানে মৃত্যু হয়েছিলো ইভার; সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনের সকল গোপনীয়তারও। বেঁচে থাকলে পৃথিবীকে কী জানাতেন ইভা ব্রাউন? উন্মাদ, স্বৈরাচারী আর রক্তপিপাসু নাজি শাসকের প্রেমকথা? হিটলারের সঙ্গে নিষ্ঠুরতা আর বিভ্রমের ভেতর দিয়ে যাওয়া এক উচ্ছন্নতার গল্প? এ ছাড়া সঞ্চয়ে বোধ হয় খুব বেশি কিছু ছিলো না সেই জার্মান রমণীর।

বেশ কয়েকটা বই লেখা হয়েছে এই ইভা ব্রাউনকে নিয়ে। ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়ের পৃষ্ঠা থেকে তাকে খুঁজে বের করে আনার চেষ্টা করেছেন ইতিহাসের গবেষকরা। কিন্তু মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকে হিটলারের নিছক এক পার্শ্বচরিত্র, শয্যাবন্ধু হয়ে হয়ে ওঠা এই নারীর জীবনের অনেক কথাই হয়তো রয়ে গেছে অনাবিষ্কৃত।

সেই ইভা ব্রাউনকে নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘ইভা ব্রাউনের অন্তরাল’।

সময়টা ছিলো ১৯৩০ সাল। তখনই প্রথম ইভা ব্রাউন দৃষ্টি আকর্ষণ করেন হিটলারের। ইভা তখন মিউনিখে একটি ছোট্ট স্টুডিওতে সহকারীর কাজ করতেন। হিটলার তার সচিব মার্টিন বোরম্যানকে দায়িত্ব দেন ইভার অন্ধিসন্ধি জানার। বিশেষ করে জানতে বলেছিলেন, এই কিশোরীর শরীরে ইহুদী রক্তের ছিটেফোঁটা আছে কি না। খবর এনেছিলো বোরম্যান। ললুপ প্রভুকে জানিয়েছিলো, ইভার শরীরে বইছে একেবারে নীল রক্ত। সেই থেকে শুরু। হিটলার তখন নিয়মিত সেই অখ্যাত স্টুডিওতে যেতো ইভার সাক্ষাৎ লাভের আশায়। কিশোরীকে নিয়ে তার সময় কাটতো কখনো কফিপানে অথবা প্রেক্ষাগৃহের নিভৃতিতে।এই বিখ্যাত প্রেমকথার সূচনা তখন থেকেই।

গবেষকরা জানাচ্ছেন, হিটলারের সঙ্গে বিছানায় যেতে ইভার সময় লেগেছিলো আরও দুই বছর। ১৯৩২ সালের দিকে এই নারী উঠে আসেন হিটলারের বিছানায়। প্রকৃত স্বর্ণকেশী ইভা গতানুগতিক জার্মান নারীদের মতো ছিলেন না। নিয়মিত ধূমপান করতেন, নিয়ম করে পড়তেন আমেরিকান ফ্যাশন ম্যাগাজিন। প্রসাধনের ব্যাপারেও ছিলো তার বিশেষ দূর্বলতা।  ইভা ব্রাউনের একটা বিষয়ে কোনো আগ্রহই ছিলো না আর তা হচ্ছে রাজনীতি। তবে ইতিহাসবিদরা বলেন, এক ধরণের তীব্র অনুগত্য ছিলো তার হিটলারের প্রতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষ দিকে এসে হিটলারের মন্তব্য ছিলো এরকম,‘আমার জীবনে সবচাইতে বিশ্বস্ত দুটি প্রাণী হচ্ছে আমার কুকুর আর ইভা। সবাই আমাকে ছেড়ে গেলেও ওরা কখনোই আমাকে পরিত্যাগ করবে না।’

হিটলারের মতো নৃসংশ মানুষের প্রেমে জড়িয়েছিলেন ইভা। এক ধরণের আবেগ ছাড়া আর কিছুই সম্বল ছিলো না তার। সেই তীব্র আবেগের বশে  ১৯৩২-এ পিস্তল দিয়ে নিজেই নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কারণ হিটলারকে ঠিকমতো কাছে পাচ্ছিলেন না তিনি। অভিমানে সুইসাইড নোট লিখে গুলি চালিয়েছিলেন ইভা। গুলি একটুর জন্য গলার একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। সেদিন রক্তাক্ত ইভা কোনোরকমে ডাক্তারকে ফোন করেছিলেন। আর তাতেই বেঁচে যান তিনি। এই ঘটনা শুনে হিটলারের কষ্ট হয়েছিলো। আর তাতেই প্রেমিকার কাছে তার যাতায়েত বেড়ে গিয়েছিলো কিছুদিনের জন্য। অবশ্য সেই রোমান্টিক সময়ের আয়ু ইভার জন্য বেশি দীর্ঘ ছিলো না। আবার তার প্রেমিকপ্রবর হিটলার ডুব দিলে হতাশা ফিরে আসে। ১৯৩৫ সালে আরেকবার কয়েক ঘন্টার জন্য দেখা হয় দু’জনের। হিটলার তখন মহাব্যস্ত। আর তাতেই ইভা ওই বছরের মে মাসে আবার অতিমাত্রায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে বসেন। তবে সেবারও সময়মতো ইভার ছোট বোন দিদিকে নিয়ে ছুট দিতে পারে হাসপাতালে। ওই ঘটনার পর হিটলার ইভার সঙ্গে তার প্রণয়ের গল্প প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

অরাজনৈতিক, সৌন্দর্য় সচেতন আর অবেগপ্রবণ ইভা ব্রাউন হিটলার নামের এক দানবের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন জীবনের লম্বা একটা সময়; বলা যায় শেষ সময়। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিমে পরাজয়ের নির্মম পরিণতি মেনে না নিতে পেরে হিটলারের সঙ্গে তাকেও আত্মহত্যা করতে হয়েছিলো। কিন্তু ইভা তখনই খুব দ্রুত উঠে এসেছিলেন নাজি শাসিত জার্মানীর রক্তাক্ত অধ্যায়ের সোঁপানে। হিটলার তাকে এনে বসিয়েছিলো একেবারে সামনের সারিতে। চমকে উঠেছিলো তার অন্য খুনে পারিষদরা। ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছিলো হিটলারের মোহমুগ্ধ অন্য নারীদের। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হিটলারের মিথ্যা প্রচারযন্ত্রের মাথা গোয়েবলসের স্ত্রী মেগডা গোয়েবলস। শোনা যায় হিটলারের জাল থেকে এই নারীটিও মুক্তি পাননি। তাই ইভার উত্থানে ঈর্ষার পারদ তার মাথায় চড়ে বসেছিলো। সে সময়ে ইভা বিষয়ে দু একটা বাঁকা মন্তব্য করে বিপদেও পড়েছিলেন মেগডা। হিটলার টানা ছয় মাস তার সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ করে দিয়েছিলো। ইভা ব্রাউনের সঙ্গে ঠোকাঠুকিও হয়েছিলো মেগডার। একবার প্রেগনেন্ট অবস্থায় ইভাকে নিজের জুতার ফিতা বেঁধে দিতে বলেছিলেন মেগডা। ইভা খুব ঠাণ্ডা গলায় বাড়ির পরিচারিকাকে ডেকে কাজটা করে দিতে বলেছিলেন।

হিটলার ইভার ঘনিষ্ট দিন কেটে যাচ্ছিলো বেরগফের বাড়িতে। বিকেলে চা, সিনেমা দেখা আর হিটলারের বকবক শোনা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিলো না ইভার। তাদের দু’জনের শরীরের রসায়নের বিষয়টাও বেশ রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন কোনো কোনো লেখক-গবেষক। হিটলারের আলপাইন রিট্রিটে যে সব কাজের লোকেরা নিয়োজিত ছিলো তাদের জবানীতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জানা গেছে, হিটলার আর ইভা এক বিছানায় রাত কাটানোর পর সকালে তারা সেই বিছানায় তল্লাসী চালিয়েও এই যুগলের যৌন সম্পর্কের কোনো চিহ্ন খুঁজে পায়নি।

হিটলার বিশ্বাস করতে ভালোবাসতো তার জন্য নারীরা উন্মাদ হয়ে আছে। কিন্তু ইভার সঙ্গে তার প্রেমকাহিনিকে সব সময়ই জনচক্ষুর আড়ালে রাখার পক্ষপাতি ছিলো হিটলার। হয়তো নিজের ইমেজ সংকটের কথা ভাবতো সেই খলনায়ক।

ইভা ব্রাউনের জীবনের গতিপথ খুঁজতে গিয়ে অনেক ইতিহাসবিদ এই নারীর গোটা জীবনটাকে বেশ একটু উদভ্রান্ত আর পাগলামিতে ঠাসা বলেই মন্তব্য করেছেন। হিটলারের উন্মাতাল জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন ইভা। মদ আর সিগারেট ছিলো তার প্রিয় খাবার। তাহলে কী হিটলারের মতো এক ঘোর উন্মাদের সঙ্গে বসবাস করতে করতে তার জীবনও হয়ে উঠেছিলো উৎক্ষিপ্ত আর উদভ্রান্ত? উদভ্রান্ত না হলে ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের ২০ তারিখে যখন রুশ কামানের গোলা তছনছ করছে বার্লিনকে তখন হিটলারের জন্মদিনে আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে কেউ ধ্বংস হয়ে যাওয়া থার্ড রাইখের চ্যান্সারি ভবনের ছাদে ওঠে, শ্যাম্পেনের বন্যা বইয়ে দেয়? তাই কিন্তু করেছিলেন ইভা ব্রাউন।

শুধু এসব করেই ক্ষান্ত হননি ইভা। পরাজয়ের মুখে বিদ্ধস্ত বার্লিন শহরটাকে শেষবারের মতো ঘুরে দেখতে চেয়েছিলেন। ঘুরেওছিলেন। গবেষকরা বলেন, শেষ পর্যন্ত হিটলারের সঙ্গে বাংকারে থেকে যাওয়া, তাকে বিয়ে করা এবং বিষপান করে মরে যাওয়ার ভেতর দিয়ে ইভা ব্রাউনের চরিত্রের এক ধরণের কমিটমেন্ট আর দৃঢ়তাই ফুটে উঠেছে। কমিটমেন্টটা সম্ভবত ছিলো ভালোবাসার প্রতি। তখন মিউনিখে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ইভা ব্রাউনের জীবনের আয়ু হয়তো আরেকটু বাড়তো।

এই ভালোবাসার জন্য ইভা নিজের পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। একমাত্র ছোট বোন ছাড়া কারো সঙ্গেই তার সেই সময়ে যোগাযোগ ছিলো না।

হিটলার আর ইভা ব্রাউনের বিয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৪৫ সালের ২৯ এপ্রিল। জীবনের শেষ চিঠিতে হিটলার এই নারীকে তার একান্ত বিশ্বস্ত সঙ্গী বলে উল্লেখ করেছে। জার্মিানীর বেরকটেসগার্ডেন শহরের আদালতের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে ইভা ব্রাউনের মৃত্যু হয় ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল দুপুর ৩টা ২৮ মিনিটে। মৃত্যুর ৭৫ বছর পরেও আজকের পৃথিবীতে ইভা ব্রাউনের ব্যবহৃত প্যান্টি নিলামে বিক্রি হয় সাড়ে তিন হাজার পাউন্ডে। কিছু কিছু মানুষ বোধ করি আজও উন্মাদদের অনুগামী হয়!

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দ্য ডেইলি মেইল, নিউ ইয়র্কার, দ্য লোকাল
ছবিঃ দ্য ডেইলি মেইল, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]