উত্তমই আমার জীবন নষ্ট করেছে

গল্পটা সত্তরের দশকের। তিনি ছিলেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিক্ষক, হয়ে গেলেন বাংলা সিনেমার নায়িকা। তাকে হাত ধরে ক্যামেরা, লাইট আর অ্যাকশনের দুনিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। রুনু নামের সেই স্টাইলিশ কন্যা উত্তমকুমার অভিনীত ‘বিভাস’ ছবির নায়িকা।  
উত্তমকুমারের প্রতি মুগ্ধতাই তাকে টেনে এনেছিলো সিনেমার অন্য জগতে। আবার কুহকের ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনের সাজানো পথের ঠিকানাও ভুল করেছেন। কলকাতা থেকে মুম্বাই। আবার ব্যাক টু কলকাতা। লোলিতায় বদলে যাওয়া রুনুর জীবন ঝড়ের হাওয়ায় এলোমেলো হয়েছে। উত্তমকুমার চিরবিদায় নিয়েছেন। ক্যারিয়ারও মুখ থুবড়ে পড়েছে তার।
কিন্তু শুরুটা এরকম ছিলো না। ডাই হার্ড ফ্যান ছিলেন তিনি মহানায়কের। একদিন বাড়িফেরার পথে দেখেন অনেক মানুষের ভিড়। মানুষ সরিয়ে ভেতরে গিয়ে রুনু পাথর। তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের পুরুষ উত্তমকুমার। সেদিন তাকে কিছুই বলতে হয়নি। স্বয়ং মহানায়ক-ই তাকে সিনেমায় আসার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন।বলেছিলেন, ‘তোমার তো ক্যামেরার সামনে থাকা উচিত। এত রূপ নিয়ে ঘরে বসে কেনো? আমার নায়িকা হবে?’ জেগে-ঘুমিয়ে যে পুরুষের সান্নিধ্য কামনা করেছেন এতকাল তার আহ্বান উপেক্ষা করার সাধ্য রুনুর ছিলো না।মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই উত্তমকুমার দেখা করতে বলেছিলেন পরিচালক বিধু বর্ধনের সঙ্গে। আর তারপরেই ‘বিভাস’ ছবিতে গ্রামের মেয়ে পদ্ম হয়ে গেলেন রুনু।
বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর অফিসার। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ায় বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর জীবন ছিলো এই নায়িকার। কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অসাধারণ রেজাল্ট করে শিক্ষক হয়েছিলেন তিনি। বিয়েও করেছিলেন কলকাতাতেই। সেই সময়ে ফ্যাশনেবল এক নারী হিসেবেই পরিচিতি ছিলেন রুনুর।
সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে নিজের নামই পাল্টে ফেলেছিলেন এই অভিনেত্রী।একদিন সেটে বসে বই পড়ছিলেন। সাংবাদিক এসে নাম জানতে চাইলে উত্তর দিয়েছিলেন রুনু। সাংবাদিক অবাক হয়েছিলেন উত্তমকুমারের নায়িকার নাম রুনু শুনে। একটু ভেবে সেখানে বসেই তিনি হঠাৎ বলেছিলেনে ‘আজকে থেকে আমি লোলিতা’। সেদিন তার হাতে ধরা বইটা ছিলো ভ্লাদিমির নবোকভের উপন্যাস ‘লোলিতা’। সেই থেকে রুনু হয়ে উঠেছিলেন ললিতা চট্টোপাধ্যায়।
প্রথম ছবি ‘বিভাস’। সফল হয়েছিলেন লোলিতা। হয়ে উঠেছিলেন উত্তমকুমারের প্রিয় নায়িকা। আর তাতেই মহানায়কের সঙ্গে তাকে পরপর কয়েকটি সিনেমায় দেখা যায়। ‘মোমের আলো’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘মেমসাহেব’ ছবিতে অভিনয় করে সবার নজরে পড়েছিলেন নায়িকা।
উত্তমকুমার চোখ বুঁজতেই আসলে লোলিতা চট্টোপাধ্যায়ের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। কেউ আর সেভাবে ডাকেনি ছবির জন্য। ক্লান্তি আর বিরক্তি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন মুম্বাইতে। কিন্তু সেখানে জমেনি কাজ আর। উত্তমকুমার বেঁচে থাকতেও সিনেমা ছাড়তে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু উত্তমকুমারই ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। সেই আহ্বান উপেক্ষা করার সাধ্য লোলিতার ছিলো না।
একটা সময় গেছে যখন পেট চালাতে তাকে যাত্রায় অভিনয় করতে হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। একমাত্র ছেলেও চলে গেছে মাকে ছেড়ে। দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন যাত্রার অভিনেতা পাহাড়ি ভট্টাচার্যকে। কিন্তু তিনিও মারা যান।শেষ সময়টা ছিলো বেদনার। স্পোকেন ইংরেজির কোর্স করিয়ে আর টুকিটাকি কাজ দিয়ে চলতো তার সংসারের চাকা। ঘর চেয়ে ঘর পাননি। শেষ জীবনে অরিন্দম শীলের ছবি ‘আবার শবর’-এ কাজ করেছিলেন। তারপর আবার ফুরিয়ে যাওয়া। তাই মৃত্যুর আগে ক্ষোভ ঝরে পড়েছিলো অভিনেত্রীর গলায়, ‘উত্তমই আমার জীবন নষ্ট করেছে। ওর মোহে পড়ে সিনেমায় না এলে হয়তো ঘরে-বরে সুখে, নিরাপদে জীবন কাটাতাম।’

বিনোদন ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ বাংলালাইভ, কলকাতা
ছবিঃ বাংলালাইভ ও গুগল