উৎসবের আনন্দ এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

মুসলিম ঐতিহ্য ,ইতিহাস,কৃষ্টি,সংস্কৃতির মিলনমেলা হিসেবে মরক্কোর পরিচিতি বিশ্বজোড়া ।খোলাফায়ে রাশেদিনে ইসলামের জয়জয়কারের যুগে যে সব মুসলিম  দেশ সাহিত্য্‌  , রসায়ন,চিকিৎসা বিজ্ঞান , জ্যোতির্বিজ্ঞান , অর্থনীতিসহ সুসভ্য রাষ্ট্রের প্রায় সব মানদণ্ডে ইউরোপকে পিছনে ফেলে দিয়েছিলো মরক্কো তাদেরই অন্যতম ।

জাতিসংঘ মিশনে শান্তিরক্ষী হিসেবে ২০১৫-১৬ সালে মরক্কোর ওয়েস্টার্ন সাহারাতে কাজ করবার সৌভাগ্য হয় ।একজন পরিব্রাজকের অনুসন্ধিৎসা নিয়ে ছুটির অবকাশে ক্যাসাব্লাঙ্কাসহ মরক্কোর প্রত্যন্ত অঞ্চল ইঞ্চি ইঞ্চি করে চষে ফেলি ।বছরে দুই ঈদসহ ,’মারাকেশ’ নামক বহুজাতির বসবাসকারী নগরীতে ক্রিসমাসের উৎসব পালন সরজমিনে দেখতে পাই ।মারাকেশ নগরীর পরিচিতি পর্বে বলতে চাই ২০১৬ সালে বাংলাদেশের সরকার প্রধান ধরিত্রি পরিবেশ সন্মেলনে এই নগরীতে আসেন ।

 উৎসব মানেই আনন্দ ।আর আনন্দের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রিয়জনকে কাপড়চোপড় ,পছন্দনীয় উপহার সামগ্রী দেয়ার প্রচলন বিশ্বজোড়া ।নিজ নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী বাসায় পরিবারের সদস্যসহ অতিথি আপ্যায়নে ভালমন্দ রান্নাও সারা বিশ্বেরই উৎসবের অনুষঙ্গ ।যারা সচ্ছল তারা প্রিয়জনকে নিয়ে নানা টুরিষ্ট স্পটে বেড়াতে যায় । ঘর সাজানোর পর্ব , আলোকসজ্জাও থাকে ক্ষেত্র বিশেষে ।

বাংলাদেশীরা ঐতিহ্যগতভাবে উৎসবপ্রিয় জাতি ।‘বারো মাস, তের পাবনের দেশে’ রোগে শোকে ভুগে ,ট্র্যাফিক জ্যামে নাকাল হয়ে,যাপিত জীবনে নানা স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় আমরা প্রায়ই বিমর্ষ থাকি ।তাই বিকশিত আনন্দময়  জীবনের জন্য  উৎসবের দরকার যে আছে সেটি সর্বজনবিদিত ।আমাদের শৈশবে উৎসবের আনন্দ বলতে দুই ঈদের আনন্দকেই বুঝতাম । প্রতিবেশীদের পূজা –পাবনে সহজিয়া নিমন্ত্রণ থাকতো ।আমরাও যেতাম ।পহেলা বৈশাখের উৎসবের আনন্দও ছিল সার্বজনীন ।ব্যক্তি পর্যায়ে জন্মদিন বা বিয়ের উৎসবের ঘাটতিও দেখা যায় নি ।সম্প্রতি ভ্যালেন্টাইন দিবস ,মা-বাবা দিবসে দয়িতা অথবা বাবা –মার প্রতি কতটা ভালবাসার প্রকাশ পায় সেটি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এলিট সমাজে এই দিবসগুলি নিয়েও মাতামাতি আছে ।

আমাদের দেশের  বেশীর ভাগ পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একজনই ।স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে উন্নত খাবার ,উপহার সামগ্রীর  আকশচুম্বী দাম ইত্যাদির কারণে উৎসব যেন মূর্তিমান আতংক ।ঈদুল ফিতরের আগে থাকে রমজান মাস। সংযমের মাস হলেও দোকানীরা সেহেরী- ইফতারের উপকরণ ছোলা ,পিঁয়াজ্‌, বেগুন ,শসা ,তেল ইত্যাদির দাম আকাশে তুলে ফেলে ।নাভিশ্বাস উঠে সাধারণ ক্রেতাদের।আসন্ন বোনাসে কি কি ধরণের পোশাক কেনা যায় যখন পরিবারের সদস্যরা সেই স্বপ্নে বিভোর থাকেন তখন একমাত্র রোজগেরের শ্রমলব্ধ বোনাস আগেই শেষ হয়ে যায়।অনেককে দরিদ্র  মা-বাবা –ভাই –বোন – খালা –চাচা –মামাসহ অনেক নিকট আত্মীয়কে অন্তত ঈদে কাপড়চোপড় কিনে দিতে হয় ।দরিদ্র প্রতিবেশী ‘যাকাতের কাপড়চোপড় ‘ এর জন্য আগাম নোটিশ পাঠান ।

 বিপনী বিতানগুলিতে ব্যাপক সাজসজ্জা আর হাঁকডাকে ক্রেতাকে আকর্ষণ করবার প্রতিযোগিতা শুরু হয় ।দোকানগুলির সাজসজ্জার বাড়তি খরচ দোকানীরা কাষ্টমারের কাছ থেকে উশুল করে নেয় ।অনেক দোকানী ‘বিশাল মূল্যহ্রাসের ‘ ব্যানার লাগিয়ে ফেলে ।মধ্যম রোজগেরে মানুষ সেই দ্রব্যটির পূর্বমূল্য এবং মুল্যহ্রাসের পরের মূল্যের পার্থক্যে প্রীত হয়ে দ্রব্যটি কিনে ঘরে ফিরে বুঝতে পারেন প্রকৃত মূল্যকে বাড়িয়ে মূল্যহ্রাস দেখিয়ে ‘কুমির ছানার’ গল্পের মত দোকানীর চাতুর্যের কাছে তিনি  পরাজিত হয়েছেন ।উৎসবের ধাক্কা হকার্স মার্কেটে ,ফুটপাতে লাগে ।নগর পুড়লে দেবালয়ও এড়ায় না ।

প্রিয় পাঠক ,এবার আসা যাক মরক্কোর উৎসব নিয়ে কিছু পাঁচালি ।পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে উৎসব প্রকাশের ভাষা নিয়ে সাযুজ্য আছে । ঘরবাড়ি অফিস আদালতের সাজসজ্জা ,নতুন  কাপড় চোপড় কেনা , ভালমন্দ খাবারের আয়োজন ইত্যাদি ইত্যাদি ।রমজানের সময় মরক্কোবাসী নানা পদ দিয়ে ইফতারের  ব্যঞ্জনা সাজায় । ‘কুচকুচ’ এদের প্রিয় খাবার ।এটা অনেকটা পোলাওয়ের মত ।বড় থালাতে বেশি খাবার নিয়ে  একসঙ্গে বেশ কজন মিলে খাবারের চল আছে ।তাঁদের ধারণা এতে সৌহার্দ ও প্রীতি বাড়ে ।‘রুটি কাবাব’ও  এদের প্রিয় খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে  ।অত্যন্ত সচেতনভাবে এরা দ্রব্যমূল্যের ব্যাপারে সংযম পালন করে ।বিশেষত খেজুরসহ সেহেরী ও ইফতারের খাদ্য তালিকায় রাখা মেনুর দাম যেন ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে সে বিষয়ে এরা সবাই সচেতন ।এদের বিপনন ব্যবস্থায় মধ্যসত্ত্বভোগীদের খামচা –খামচি নেই বললেই চলে ।ফলে ক্রেতা বা বিক্রেতা কেউই সিস্টেম লসের শিকার হয় না । বিক্রেতা সরাসরি ক্রেতাদেরই কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারে ।ফলে বিক্রেতা মোটামুটি লভ্যাংশ যেমন রাখতে পারে তেমনই ক্রেতা সহনশীল মূল্যে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনতে পারে ।সেখানেও ‘বিশাল মূল্যহ্রাসের’ ব্যানার ঝুলিয়ে দ্রব্যসামগ্রী বিক্রির প্রচলন আছে ।সেই মূল্যহ্রাস বাস্তবিকই মূল্যহ্রাস ।‘কি ভাবে এই মূল্যহ্রাস দিয়ে ব্যবসা চালান সম্ভব ?’এই প্রশ্নের জবাবে তারা আমায় জানিয়েছিল মূল্যহ্রাস করে লাভ আপাতভাবে কম করলেও ক্রেতার সংখ্যাও যেমন বাড়ে তেমনই ক্রেতাও বেশী পণ্য কেনে ফলে তাদের পুষিয়ে যায় ।

খাদ্যে ভেজাল মেশানো আমাদের বিপণন সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে ।শুধু ভেজালই নয় , প্রাণ সংহারী ফরমালিন, কার্বাইড, কাপড়ের রঞ্জকসহ নানা বিষে মেশা খাবার আমরা নিত্যই খাচ্ছি ।এই ধরণের প্রবণতা তো দূরেই থাক ,এই জাতীয় ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের নামও মরক্কোবাসী শোনে নাই । খাবার কিনবার সময় আমরা স্বভাবসুলভ কন্ঠে জিজ্ঞেস করি ‘খাবার খাঁটি তো ?’ এই প্রশ্ন তাঁদের করে ভয়ানক অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছি ।তাঁরা বলেছেন ‘ স্বয়ং নবীকরিম (সা:)ব্যবসা করতেন ।আমরা তাঁরই অনুসারী ।তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন খাবারে যেন কোনক্রমেই ভেজাল মেশানো না হয় ।আমরা কি ভাবে ভেজাল মেশানোর কথা ভাবতে পারি ?”

আমরাও ধর্মপরায়ণ জাতি ।মরক্কোবাসীদের নিজেদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করে শান্তি স্থাপনের জন্য জাতিসংঘের অধীনে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরদের দরকার হয় ।আমাদের দলমতের ভিন্নতা সত্বেও মরক্কান ,বিদেশী বা জাতিসংঘের কোন শক্তিকে ডেকে আনতে হয় না ।সেই বিচারে আমরা অন্তত  তাদের চেয়ে উন্নত জাতি ।আমরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী প্রেরণের দেশের তালিকায় প্রায় শীর্ষে আছি ।আমরা অন্তত চল্লিশটি দেশে শান্তি রক্ষী পাঠিয়েছি ।আমরা এত কিছু পারি ।অন্তত উৎসবের সময় দ্রব্যমূল্যের দাম আসমানে না তুলে সবাই মিলে কি উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারি না ???

লেখক: উপ অধিনায়ক ,আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরী জাতিসংঘের প্রাক্তন শান্তিরক্ষী, ওয়েস্টার্ন সাহারা, মরক্কো

ছবি: গুগল