ঋত্বিকের সুচিত্রা সেন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একদিন দুপুর। তখনও ঋত্বিক ঘটক হাসপাতালে ভর্তি হননি। একজন মহিলা প্রায় নিঃশব্দে তাঁর ভবানীপুরের বাড়ির বসার ঘরে ঢুকে আস্তে জড়িয়ে ধরলেন ঋত্বিক ঘটককে। ঋত্বিক ঘটক তাকে দেখে বললেন,রমা আয়, বোস৷সেই মহিলা হচ্ছেন অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। দৃশ্যটা দেখে সেদিন খুব অবাক হয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটকের কন্যা সংহিতা ঘটক। তাঁর স্মৃতিচারণে তিনি জানিয়েছেন, সেদিন নতুন ছবির ব্যাপারে কথা বলবেন বলে উনি এসেছিলেন৷ সুচিত্রা বললেন, ‘তুমি যদি তোমার নতুন ছবিতে আমায় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতে বলো তা হলে আমার কিছু শর্ত আছে৷’ বাবা বললেন, ‘ছাড়ান দে, ছেলেমানুষী করিস না৷ তুই তো এখন স্টার৷ ভেবে নে আগে ব্যাপারটা আমিও ভাবছি৷’

তখন ঋত্বিক ঘটক অভিনয় দর্পণ নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করতেন৷ সেদিন সুচিত্রা সেন আরও কিছুটা সময় বসে থেকে চলে গেলেও পরে আরও কয়েকবার সেই বাড়িতে গিয়েছিলেন। মেয়ে মুনমুনকে নিয়েও সুচিত্রা সেন ঋত্বিক ঘটকের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। সেখানেই এক দুপুরে কথা বলতে বলতে ঋত্বিক তাকে বলেছিলেন, ‘ওরে হিরোয়িন ছেড়ে অন্য হ, ভালো লাগবে৷’

বাংলা সিনেমার এই হিরোইনের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের সেইসব সাক্ষাৎ নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো, ‘ঋত্বিকের সুচিত্রা সেন’

ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় ‘রঙের গোলা ‘ ছবিতে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সূচিত্রা সেন। শুটিং শুরু ভবানীপুরের বাড়ির দোতলায়। অনিল চ্যাটার্জি, জহর রায়, মনি শ্রীমানী, সীতা মুখার্জি ও সর্বাণীকে নিয়ে শুটিং শুরু হয়েছিলো। ক্যামেরায় ছিলেন মহেন্দ্র কুমার৷ কিন্তু তাকে নিয়েই আপত্তি তোলেন সুচিত্রা সেন। তিনি তাঁর নিজস্ব আলোকচিত্র শিল্পীকে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন ক্যামেরা চালনায়।চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন সেদিন ঋত্বিক ঘটক। একজন স্থিরচিত্র গ্রাহককে দিয়ে কী ভাবে কাজ হবে সেটা তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্যামেরা নিজেই চালনা করতেন ঋত্বিক ঘটক। কখনো ক্যামেরায় নিজে না-থাকতে পারলে লুক থ্রু করে দিতেন৷ সংহিতা ঘটক জানান, এই দু’জন মানুষের মধ্যে তাদের ছেলেবেলা থেকেই একটা সম্পর্ক ছিলো৷ কলকাতার বালিগঞ্জ প্লেসে সুচিত্রা সেনের শ্বশুর বাড়িতে ঘটক পরিবার ভাড়া থাকতেন আর সেখান থেকেই তাদের পরিচয়৷ তাছাড়া সুচিত্রা সেন পাবনার মেয়ে, ঋত্বিক ঘটকও পাবনার মানুষ। সেই সূত্রেও একটা সংযোগ ছিলো৷ মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দু’জন মানুষ একে অপরকে তুই করেও সম্বোধন করতেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণরেখা’- এই ছবিগুলো মুক্তি পাবার পর হয়তো সুচিত্রা সেনও আগ্রহী হন একটা অন্য রকম চরিত্রে অভিনয় করতে। তাঁর ভেতরে একটা উৎসাহ কাজ করেছিলো ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় অভিনয় করার। কিন্তু এই গোলযোগে এই সিনেমার শুটিং বন্ধ হয়ে যায়৷

কলকাতা শহরের ভবানীপুরে ঋত্বিক ঘটকের বাড়িটা ছিলো বেশ নির্জন আর আলাদা। প্রধান সড়কের পাশে থাকলেও জায়গাটা ছিলো নির্জন। আরেকদিন দুপুরে ওই বাড়িতে সুচিত্রা সেনের আগমন ঘটে। সেদিন নায়িকাসুলভ সাজগোজ ছিলো না তাঁর। পরনেও ছিলো সাধারণ পোশাক। সেদিন সঙ্গে ছিলো কন্যা মুনমুনও। সেই দিনটা ছিলো একটু অন্যরকম। সুচিত্রা সেন ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে অনেক ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেন। বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিলো বাংলা সিনেমার এই অসাধারণ অভিনয় শিল্পী সুচিত্রা সেনকে। বার বার বলছেন, ‘আমাকে কেউ দেখেনি তো? গাড়িটা সামনে রাখা৷’ ঋত্বিক ঘটক তাকে আস্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, এখানে কেউ আসবে না৷’

সেদিন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে এসেছিলেন কলকাতার ছায়াবাণী পিকচার্সের কর্ণধার অসিত চৌধুরী। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ উপন্যাস অবলম্বনে একটা সিনেমা তৈরির। সুচিত্রা সেনও আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন উপন্যাসের দামিনী চরিত্রে অভিনয় করার। ঋত্বিক ঘটক রাজি হওয়ায় এই ছবি তৈরির বিষয়ে কথাবার্তাও অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। ওই সময়ে ঋত্বিক ঘটক সুচিত্রা সেনের কলকাতা শহরের বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে যেতেন। সংহিতা ঘটক তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘এক দিন আমিও বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম৷ মনে আছে বাবা তাঁকে ফ্রেম বোঝানোর চেষ্টা করছেন আর উনি তাঁর সেই নায়িকাসুলভ মেজাজে, বাবা মজা করে বললেন ‘ওরে হিরোয়িন ছেড়ে অন্য হ, ভালো লাগবে৷’শুনে রমা সেন তাঁর সেই বিখ্যাত হাসিটি হেসেছিলেন৷ তার পর ছবিটা কেন হয়নি, জানি না ’

কিন্তু ‘রঙের গোলাম’ ছবিটি অসমাপ্ত থেকে যাওয়া, কথা এগিয়েও চতুরঙ্গ উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাটার অকালমৃত্যু কিন্তু এই দু’জন মানুষের মাঝে সম্পর্কের সেতুটিকে ভেঙে দেয়নি কখনোই। ঋত্বিক ঘটক যখন মানসিক হাসপাতালে ভর্তি তখন সুচিত্রা সেন বাড়ি থেকে নিজের হাতে রান্না করে খাবার নিয়ে যেতেন হাসপাতালে। সেই অসামান্য চলচ্চিত্র পরিচালকের চিকিৎসার ব্যয়ও তুলে নিয়েছিলেন নিজের হাতে।

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের প্রথম কাজ হিন্দি সিনেমা ‘মুসাফির’-এ। এই ছবির পরিচালক হৃষীকেশ মুখার্জী হলেও কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন স্বয়ং ঋত্বিক কুমার ঘটক।শোনা যায়, ‘সুবর্ণ রেখা’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়কে কয়েকবার হুমকির সুরে বলেছেন, ‘ছেড়ে দে মাধু। তোর সঙ্গে আমার পোষাবে না। আমি রমাকে (সুচিত্রা সেন) দিয়ে করিয়ে নেবো।’

‘রঙের গোলাম’ সিনেমাটির সামান্য কয়েকদিন শুটিং হয়েছিলো। অনেক বছর আগে কলকাতায় কোনো একটি চলচ্চিত্র উৎসবে ঋত্বিক ঘটকের রেট্রোস্পেকটিভে ওই সিনেমার সামান্য কিছু অংশ প্রদর্শিতও হয়েছিলো।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দ্য ওয়াল, এই সময় (কলকাতা)
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box